মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

বারাণসীর ঐতিহাসিক দালমন্ডি এলাকায় করিডোর সম্প্রসারণের নামে কয়েকশ বছরের পুরনো ঘরবাড়ি, দোকান ও মসজিদ উচ্ছেদের কবলে; দিশেহারা কয়েক হাজার বাসিন্দা

মন্দিরের পথ প্রশস্তের অজুহাতে উচ্ছেদ: বুলডোজারের নিচে পিষ্ট মুসলিম জনপদ



মন্দিরের পথ প্রশস্তের অজুহাতে উচ্ছেদ: বুলডোজারের নিচে পিষ্ট মুসলিম জনপদ

ভারতের উত্তরপ্রদেশের বারাণসীতে অবস্থিত ঐতিহাসিক মুসলিম প্রধান জনপদ ‘দালমন্ডি’ এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার মুখে। কাশী বিশ্বনাথ ধাম মন্দিরের পথ প্রশস্ত করার অজুহাতে সরকার পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানে শত শত বছরের স্মৃতি, জীবিকা এবং ধর্মীয় স্থাপনা বিপন্ন। উন্নয়নের নামে এই বুলডোজার নীতি স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দাদের অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দিয়েছে।

বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, কাশী বিশ্বনাথ ধামের পথ প্রশস্ত করার জন্য এই ২২৪ কোটি রুপির প্রকল্পটি অপরিহার্য। বারাণসী মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের মতে, দালমন্ডির রাস্তা ১৭.৪ মিটার চওড়া করা হলে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের যাতায়াত সহজতর হবে। কর্তৃপক্ষ জানায়, গত ৩১ জানুয়ারি প্রায় ৩০টিরও বেশি স্থাপনাকে ‘ঝরঝর’ বা ‘অনিরাপদ’ হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং তিন দিনের মধ্যে খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

সরকার সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে নয়, বরং শহরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ। তবে আন্দোলনকারীদের ধরপাকড় এবং দোকানদার আজমতের আত্মাহুতির চেষ্টার ঘটনাকে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হিসেবে দেখছে স্থানীয় প্রশাসন।

বারাণসীর হৃদপিণ্ড হিসেবে পরিচিত দালমন্ডি মূলত একটি মুসলিম অধ্যুষিত বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকা। গত ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে এখানে বড় আকারের উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। এই প্রকল্পের আওতায় ১৮০টি দোকান, ঘরবাড়ি এবং ৬টি প্রাচীন মসজিদ উচ্ছেদের তালিকায় রয়েছে।

সাবেক মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলর নাগমি সুলতানের মতো অনেক বাসিন্দা তাদের সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে গড়া ঘরবাড়ি হারানোর শোকে স্তব্ধ। আদিল খানের মতো যুবকরা জেল থেকে ফিরে দেখছেন তাদের ছাদ অর্ধেকটা বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এই উচ্ছেদে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারগুলো। ৭০ বছরের পুরনো ‘তাজ হোটেল’ থেকে শুরু করে ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁর স্মৃতিবিজড়িত গলিগুলো এখন ধ্বংসের প্রতীক্ষায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০১৯ সালের পুরনো রেটে নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে এবং ভাড়াটেদের জন্য কোনো পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রাখা হয়নি।

বারাণসী জেলা আদালতের আইনজীবী রাজেন্দ্র পাণ্ডের মতে, ‘অনিরাপদ’ ভবনের অজুহাতটি একটি আইনি ফাঁক মাত্র। অনেক ক্ষেত্রে আদালতের স্থগিতাদেশ থাকা সত্ত্বেও উচ্ছেদ চালানো হচ্ছে, যা আইনের শাসনের পরিপন্থী। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আরিফ মোহাম্মদ আক্ষেপ করে বলেন, দালমন্ডির ইতিহাস গঙ্গা-যমুনা সংস্কৃতির ধারক ছিল, যা এখন সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতির শিকার হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী, যেকোনো উচ্ছেদের আগে যথাযথ পুনর্বাসন এবং নাগরিকের সম্মতির প্রয়োজন। ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়া প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। উন্নয়নের সুফল যদি একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে বাস্তুচ্যুত করে অর্জিত হয়, তবে তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। মুসলিম জনপদের রাজনৈতিক ভোটাধিকার খর্ব করার যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।

বিষয় : ভারত

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬


মন্দিরের পথ প্রশস্তের অজুহাতে উচ্ছেদ: বুলডোজারের নিচে পিষ্ট মুসলিম জনপদ

প্রকাশের তারিখ : ১৫ মার্চ ২০২৬

featured Image

ভারতের উত্তরপ্রদেশের বারাণসীতে অবস্থিত ঐতিহাসিক মুসলিম প্রধান জনপদ ‘দালমন্ডি’ এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার মুখে। কাশী বিশ্বনাথ ধাম মন্দিরের পথ প্রশস্ত করার অজুহাতে সরকার পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানে শত শত বছরের স্মৃতি, জীবিকা এবং ধর্মীয় স্থাপনা বিপন্ন। উন্নয়নের নামে এই বুলডোজার নীতি স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দাদের অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দিয়েছে।

বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, কাশী বিশ্বনাথ ধামের পথ প্রশস্ত করার জন্য এই ২২৪ কোটি রুপির প্রকল্পটি অপরিহার্য। বারাণসী মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের মতে, দালমন্ডির রাস্তা ১৭.৪ মিটার চওড়া করা হলে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের যাতায়াত সহজতর হবে। কর্তৃপক্ষ জানায়, গত ৩১ জানুয়ারি প্রায় ৩০টিরও বেশি স্থাপনাকে ‘ঝরঝর’ বা ‘অনিরাপদ’ হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং তিন দিনের মধ্যে খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

সরকার সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে নয়, বরং শহরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ। তবে আন্দোলনকারীদের ধরপাকড় এবং দোকানদার আজমতের আত্মাহুতির চেষ্টার ঘটনাকে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হিসেবে দেখছে স্থানীয় প্রশাসন।

বারাণসীর হৃদপিণ্ড হিসেবে পরিচিত দালমন্ডি মূলত একটি মুসলিম অধ্যুষিত বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকা। গত ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে এখানে বড় আকারের উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। এই প্রকল্পের আওতায় ১৮০টি দোকান, ঘরবাড়ি এবং ৬টি প্রাচীন মসজিদ উচ্ছেদের তালিকায় রয়েছে।

সাবেক মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলর নাগমি সুলতানের মতো অনেক বাসিন্দা তাদের সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে গড়া ঘরবাড়ি হারানোর শোকে স্তব্ধ। আদিল খানের মতো যুবকরা জেল থেকে ফিরে দেখছেন তাদের ছাদ অর্ধেকটা বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এই উচ্ছেদে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারগুলো। ৭০ বছরের পুরনো ‘তাজ হোটেল’ থেকে শুরু করে ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁর স্মৃতিবিজড়িত গলিগুলো এখন ধ্বংসের প্রতীক্ষায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০১৯ সালের পুরনো রেটে নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে এবং ভাড়াটেদের জন্য কোনো পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রাখা হয়নি।

বারাণসী জেলা আদালতের আইনজীবী রাজেন্দ্র পাণ্ডের মতে, ‘অনিরাপদ’ ভবনের অজুহাতটি একটি আইনি ফাঁক মাত্র। অনেক ক্ষেত্রে আদালতের স্থগিতাদেশ থাকা সত্ত্বেও উচ্ছেদ চালানো হচ্ছে, যা আইনের শাসনের পরিপন্থী। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আরিফ মোহাম্মদ আক্ষেপ করে বলেন, দালমন্ডির ইতিহাস গঙ্গা-যমুনা সংস্কৃতির ধারক ছিল, যা এখন সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতির শিকার হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী, যেকোনো উচ্ছেদের আগে যথাযথ পুনর্বাসন এবং নাগরিকের সম্মতির প্রয়োজন। ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়া প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। উন্নয়নের সুফল যদি একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে বাস্তুচ্যুত করে অর্জিত হয়, তবে তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। মুসলিম জনপদের রাজনৈতিক ভোটাধিকার খর্ব করার যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত