মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

দারুল উলুম দেওবন্দের বার্ষিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে যাওয়ার পথে দিল্লি রেলস্টেশনে উগ্রবাদী হেনস্তার শিকার একদল মুসলিম শিক্ষার্থী

দারুল উলুম দেওবন্দগামী মুসলিম শিক্ষার্থীদের দিল্লিতে প্রাণনাশের হুমকি



দারুল উলুম দেওবন্দগামী মুসলিম শিক্ষার্থীদের দিল্লিতে প্রাণনাশের হুমকি

ভারতের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দের বার্ষিক পরীক্ষায় অংশ নিতে যাওয়ার পথে দিল্লিতে উগ্রবাদী হেনস্তার শিকার হয়েছেন একদল মুসলিম শিক্ষার্থী। হায়দ্রাবাদ থেকে উত্তরপ্রদেশগামী এই তালিবে ইলমদের রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে থামিয়ে এক গেরুয়াধারী ব্যক্তি সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি প্রদান করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা চরম ধৈর্যের পরিচয় দিলেও ওই ব্যক্তি আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার অব্যাহত রাখেন।

ঘটনার ভিডিও ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন হিন্দু পুরোহিত বা ধর্মীয় পোশাকধারী ব্যক্তি। তার দাবি ছিল, মুসলিমরা গো-হত্যার সাথে জড়িত। ভিডিওতে তাকে উচ্চস্বরে হিন্দি ভাষায় বলতে শোনা যায়, "অ্যাই, গরুর হত্যা করো না, গরুর হত্যা করো না। অন্যথায় তোদের হত্যা করব।" অভিযুক্ত পক্ষ কোনো প্রকার প্রমাণ বা প্রেক্ষাপট ছাড়াই একদল সাধারণ শিক্ষার্থীকে কেবল তাদের পোশাক ও ধর্মীয় পরিচয়ের (দাড়ি ও টুপি) ভিত্তিতে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করার চেষ্টা করে। এই ধরনের দাবির নেপথ্যে প্রায়শই নির্দিষ্ট কোনো আইনি ভিত্তি থাকে না, বরং এটি এক প্রকার সাম্প্রদায়িক উসকানি ও ভীতিকর পরিবেশ তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবেই প্রতীয়মান হয়।

২৬ মার্চ হায়দ্রাবাদ থেকে একদল শিক্ষার্থী ভারতের বিখ্যাত ইসলামিক বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশ নিতে উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। দিল্লিতে ট্রেন পরিবর্তনের সময় প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করার সময় গেরুয়া পরিহিত এক ব্যক্তি হঠাৎ তাদের দিকে তেড়ে আসেন।

শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ নীরব ও শান্ত থাকলেও ওই ব্যক্তি তাদের ঘিরে ধরে হুমকি দিতে থাকেন। ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী জানান, তারা কেবল তাদের গন্তব্য ট্রেনের অপেক্ষা করছিলেন এবং কারও সাথে কোনো কথা বা বিতণ্ডায় জড়াননি। তিনি বলেন, "তারা চায় আমরা রাগান্বিত হয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাই যাতে তারা আমাদের কোনো আইনি ঝামেলায় ফেলতে পারে বা দাঙ্গা সৃষ্টি করতে পারে।"

ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দে প্রতি বছর দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে যাতায়াত করেন। এই ঘটনার পর দূর-দূরান্ত থেকে আসা তালিবে ইলমদের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা অন্য পরীক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন কেউ উসকানিতে পা না দেয় এবং চরম ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে।

ভারতের সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালন ও সেই অনুযায়ী পোশাক পরিধানের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। এছাড়া আইপিসি-এর বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী কাউকে প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা দণ্ডনীয় অপরাধ। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রকাশ্য স্থানে মুসলিমদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে লক্ষ্যবস্তু করার প্রবণতা বেড়েছে।

রেলওয়ে স্টেশনের মতো সুরক্ষিত স্থানে একদল শিক্ষার্থীকে এভাবে হেনস্তা করা নিরাপত্তার চরম ঘাটতি নির্দেশ করে। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি। এই উসকানিমূলক আচরণের সুষ্ঠু তদন্ত করা এবং দোষী ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এমন বৈষম্যমূলক আচরণ কেবল একটি সম্প্রদায়ের ওপর আঘাত নয়, বরং এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে বড় ধরনের অন্তরায়।

বিষয় : ভারত

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬


দারুল উলুম দেওবন্দগামী মুসলিম শিক্ষার্থীদের দিল্লিতে প্রাণনাশের হুমকি

প্রকাশের তারিখ : ২৬ মার্চ ২০২৬

featured Image

ভারতের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দের বার্ষিক পরীক্ষায় অংশ নিতে যাওয়ার পথে দিল্লিতে উগ্রবাদী হেনস্তার শিকার হয়েছেন একদল মুসলিম শিক্ষার্থী। হায়দ্রাবাদ থেকে উত্তরপ্রদেশগামী এই তালিবে ইলমদের রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে থামিয়ে এক গেরুয়াধারী ব্যক্তি সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি প্রদান করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা চরম ধৈর্যের পরিচয় দিলেও ওই ব্যক্তি আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার অব্যাহত রাখেন।

ঘটনার ভিডিও ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন হিন্দু পুরোহিত বা ধর্মীয় পোশাকধারী ব্যক্তি। তার দাবি ছিল, মুসলিমরা গো-হত্যার সাথে জড়িত। ভিডিওতে তাকে উচ্চস্বরে হিন্দি ভাষায় বলতে শোনা যায়, "অ্যাই, গরুর হত্যা করো না, গরুর হত্যা করো না। অন্যথায় তোদের হত্যা করব।" অভিযুক্ত পক্ষ কোনো প্রকার প্রমাণ বা প্রেক্ষাপট ছাড়াই একদল সাধারণ শিক্ষার্থীকে কেবল তাদের পোশাক ও ধর্মীয় পরিচয়ের (দাড়ি ও টুপি) ভিত্তিতে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করার চেষ্টা করে। এই ধরনের দাবির নেপথ্যে প্রায়শই নির্দিষ্ট কোনো আইনি ভিত্তি থাকে না, বরং এটি এক প্রকার সাম্প্রদায়িক উসকানি ও ভীতিকর পরিবেশ তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবেই প্রতীয়মান হয়।

২৬ মার্চ হায়দ্রাবাদ থেকে একদল শিক্ষার্থী ভারতের বিখ্যাত ইসলামিক বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশ নিতে উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। দিল্লিতে ট্রেন পরিবর্তনের সময় প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করার সময় গেরুয়া পরিহিত এক ব্যক্তি হঠাৎ তাদের দিকে তেড়ে আসেন।

শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ নীরব ও শান্ত থাকলেও ওই ব্যক্তি তাদের ঘিরে ধরে হুমকি দিতে থাকেন। ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী জানান, তারা কেবল তাদের গন্তব্য ট্রেনের অপেক্ষা করছিলেন এবং কারও সাথে কোনো কথা বা বিতণ্ডায় জড়াননি। তিনি বলেন, "তারা চায় আমরা রাগান্বিত হয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাই যাতে তারা আমাদের কোনো আইনি ঝামেলায় ফেলতে পারে বা দাঙ্গা সৃষ্টি করতে পারে।"

ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দে প্রতি বছর দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে যাতায়াত করেন। এই ঘটনার পর দূর-দূরান্ত থেকে আসা তালিবে ইলমদের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা অন্য পরীক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন কেউ উসকানিতে পা না দেয় এবং চরম ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে।

ভারতের সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালন ও সেই অনুযায়ী পোশাক পরিধানের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। এছাড়া আইপিসি-এর বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী কাউকে প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা দণ্ডনীয় অপরাধ। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রকাশ্য স্থানে মুসলিমদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে লক্ষ্যবস্তু করার প্রবণতা বেড়েছে।

রেলওয়ে স্টেশনের মতো সুরক্ষিত স্থানে একদল শিক্ষার্থীকে এভাবে হেনস্তা করা নিরাপত্তার চরম ঘাটতি নির্দেশ করে। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি। এই উসকানিমূলক আচরণের সুষ্ঠু তদন্ত করা এবং দোষী ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এমন বৈষম্যমূলক আচরণ কেবল একটি সম্প্রদায়ের ওপর আঘাত নয়, বরং এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে বড় ধরনের অন্তরায়।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত