বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কওমী টাইমস

বাংলাদেশের ধর্মীয় অঙ্গনে সম্প্রতি কওমি মাদ্রাসার কিছু আলেম, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির প্রতি ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা নতুন আদর্শিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ঐতিহাসিক দেওবন্দি মানহাজ ও মওদূদীবাদের মতপার্থক্য সত্ত্বেও কেন এই জামায়াতমুখিতা, তা নিয়ে কওমি অঙ্গনে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক কৌশলের পরিবর্তন স্বাভাবিক হলেও আকীদা ও মানহাজের জায়গায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা মুসলিম উম্মাহর জন্য অপরিহার্য।

কওমি অঙ্গনে জামায়াতমুখিতা: রাজনৈতিক সমীকরণ নাকি আদর্শিক পরিবর্তন?


আশরাফ বিন আনসার
আশরাফ বিন আনসার
প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৬

কওমি অঙ্গনে জামায়াতমুখিতা: রাজনৈতিক সমীকরণ নাকি আদর্শিক পরিবর্তন?

বাংলাদেশের ধর্মীয় অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিষয় নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। কওমি মাদ্রাসার কিছু আলেম, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা অনেকের মনেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে প্রশ্ন উঠছে—যে ধারার উলামায়ে কেরাম দীর্ঘদিন ধরে মওদূদীবাদের বিভিন্ন আকীদাগত ও মানহাজগত বিচ্যুতির সমালোচনা করে আসছেন, সেই ধারার কিছু ব্যক্তির জামায়াতমুখী হওয়ার পেছনে কী কারণ কাজ করছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।

উপমহাদেশে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার আদর্শিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে আকাবিরে দেওবন্দের চিন্তা ও কর্মধারার ওপর। আকীদা, ফিকহ, তাসাউফ এবং ইলমি মানহাজের ক্ষেত্রে এ ধারার নিজস্ব একটি সুস্পষ্ট অবস্থান রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী একটি রাজনৈতিক ও দাওয়াতি আন্দোলন, যার বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি মাওলানা আবুল আ'লা মওদূদী রহ.-এর চিন্তাধারা।

এ কারণেই শুরু থেকেই দুই ধারার মধ্যে মতপার্থক্য বিদ্যমান ছিল। দেওবন্দের বহু প্রখ্যাত আলেম মওদূদী সাহেবের বিভিন্ন বক্তব্য ও ব্যাখ্যার সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর ইতিহাস বিশ্লেষণ, নবী-রাসূলদের মর্যাদা সম্পর্কিত কিছু আলোচনা, ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তা, তাকলীদ ও মাযহাবের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। এসব বিষয়ে বহু খণ্ডনগ্রন্থ, গবেষণাপত্র ও ফতোয়া রচিত হয়েছে।

মূলধারার কওমি আলেমদের অভিযোগ ছিল, মওদূদীবাদের কিছু ব্যাখ্যা উম্মাহর স্বীকৃত আকীদা ও আকাবিরে উলামার প্রতিষ্ঠিত মানহাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁদের মতে, ইসলামের রাজনৈতিক দিককে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে কখনো কখনো দ্বীনের আধ্যাত্মিক, ইলমি ও তাযকিয়াভিত্তিক দিকগুলো তুলনামূলকভাবে আড়ালে পড়ে যায়। যদিও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকরা এসব সমালোচনার সঙ্গে একমত নন এবং নিজেদের অবস্থানকে কুরআন-সুন্নাহসম্মত বলে দাবি করে থাকেন।

তবে বর্তমান বাস্তবতায় যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, তা হলো—যেসব আকীদাগত ও মানহাজগত আপত্তির কারণে অতীতে এত বিস্তৃত সমালোচনা হয়েছিল, সেগুলোর অবস্থান আজ কী? যদি সেই আপত্তিগুলো এখনো বহাল থাকে, তাহলে সেগুলো উপেক্ষা করে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার যৌক্তিকতা কী? আর যদি আপত্তিগুলোর সমাধান হয়ে থাকে, তাহলে সে বিষয়ে উম্মাহকে স্পষ্টভাবে অবহিত করা প্রয়োজন।

কারণ আকীদা ও আদর্শের প্রশ্ন কোনো সাময়িক রাজনৈতিক সমীকরণের বিষয় নয়। রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন হতে পারে, জোট পরিবর্তন হতে পারে, কৌশল পরিবর্তন হতে পারে; কিন্তু আকীদা ও মানহাজের প্রশ্নে মুসলিম সমাজ সবসময় স্বচ্ছতা প্রত্যাশা করে।

এখানে আরেকটি বিষয় স্মরণ রাখা জরুরি। কোনো ব্যক্তি বা কয়েকজন আলেমের দলীয় সম্পৃক্ততাকে পুরো কওমি অঙ্গনের অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করা যেমন সঠিক নয়, তেমনি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পছন্দকে আকাবিরে উলামার প্রতিষ্ঠিত ইলমি অবস্থানের বিকল্প হিসেবে দেখাও সমীচীন নয়।

আজ প্রয়োজন আবেগনির্ভর স্লোগান নয়; বরং দলিলনির্ভর আলোচনা। প্রয়োজন ব্যক্তিপূজা নয়; বরং নীতির মূল্যায়ন। প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে মতভেদকে শত্রুতা নয়, বরং ইলমি পর্যালোচনার মাধ্যমে বিচার করা হবে।

কওমি অঙ্গনের সামনে তাই আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে—আদর্শিক প্রশ্নগুলোকে স্পষ্টভাবে উম্মাহর সামনে তুলে ধরা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোচনার পাশাপাশি আকীদা ও মানহাজের মৌলিক বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে জাতি তার আদর্শিক ভিত্তিকে দুর্বল করে, সে জাতি দীর্ঘমেয়াদে নেতৃত্বের আসন ধরে রাখতে পারে না।

অতএব, কওমি অঙ্গনে জামায়াতমুখিতার ঘটনাকে ব্যক্তি বা দলকেন্দ্রিক আবেগের দৃষ্টিতে নয়; বরং আদর্শ, আকীদা, মানহাজ এবং উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থের আলোকে মূল্যায়ন করাই সময়ের দাবি।

বিষয় : আলেম শিক্ষক শিক্ষার্থী

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


কওমি অঙ্গনে জামায়াতমুখিতা: রাজনৈতিক সমীকরণ নাকি আদর্শিক পরিবর্তন?

প্রকাশের তারিখ : ১৮ আগস্ট ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের ধর্মীয় অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিষয় নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। কওমি মাদ্রাসার কিছু আলেম, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা অনেকের মনেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে প্রশ্ন উঠছে—যে ধারার উলামায়ে কেরাম দীর্ঘদিন ধরে মওদূদীবাদের বিভিন্ন আকীদাগত ও মানহাজগত বিচ্যুতির সমালোচনা করে আসছেন, সেই ধারার কিছু ব্যক্তির জামায়াতমুখী হওয়ার পেছনে কী কারণ কাজ করছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।

উপমহাদেশে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার আদর্শিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে আকাবিরে দেওবন্দের চিন্তা ও কর্মধারার ওপর। আকীদা, ফিকহ, তাসাউফ এবং ইলমি মানহাজের ক্ষেত্রে এ ধারার নিজস্ব একটি সুস্পষ্ট অবস্থান রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী একটি রাজনৈতিক ও দাওয়াতি আন্দোলন, যার বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি মাওলানা আবুল আ'লা মওদূদী রহ.-এর চিন্তাধারা।

এ কারণেই শুরু থেকেই দুই ধারার মধ্যে মতপার্থক্য বিদ্যমান ছিল। দেওবন্দের বহু প্রখ্যাত আলেম মওদূদী সাহেবের বিভিন্ন বক্তব্য ও ব্যাখ্যার সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর ইতিহাস বিশ্লেষণ, নবী-রাসূলদের মর্যাদা সম্পর্কিত কিছু আলোচনা, ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তা, তাকলীদ ও মাযহাবের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। এসব বিষয়ে বহু খণ্ডনগ্রন্থ, গবেষণাপত্র ও ফতোয়া রচিত হয়েছে।

মূলধারার কওমি আলেমদের অভিযোগ ছিল, মওদূদীবাদের কিছু ব্যাখ্যা উম্মাহর স্বীকৃত আকীদা ও আকাবিরে উলামার প্রতিষ্ঠিত মানহাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁদের মতে, ইসলামের রাজনৈতিক দিককে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে কখনো কখনো দ্বীনের আধ্যাত্মিক, ইলমি ও তাযকিয়াভিত্তিক দিকগুলো তুলনামূলকভাবে আড়ালে পড়ে যায়। যদিও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকরা এসব সমালোচনার সঙ্গে একমত নন এবং নিজেদের অবস্থানকে কুরআন-সুন্নাহসম্মত বলে দাবি করে থাকেন।

তবে বর্তমান বাস্তবতায় যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, তা হলো—যেসব আকীদাগত ও মানহাজগত আপত্তির কারণে অতীতে এত বিস্তৃত সমালোচনা হয়েছিল, সেগুলোর অবস্থান আজ কী? যদি সেই আপত্তিগুলো এখনো বহাল থাকে, তাহলে সেগুলো উপেক্ষা করে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার যৌক্তিকতা কী? আর যদি আপত্তিগুলোর সমাধান হয়ে থাকে, তাহলে সে বিষয়ে উম্মাহকে স্পষ্টভাবে অবহিত করা প্রয়োজন।

কারণ আকীদা ও আদর্শের প্রশ্ন কোনো সাময়িক রাজনৈতিক সমীকরণের বিষয় নয়। রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন হতে পারে, জোট পরিবর্তন হতে পারে, কৌশল পরিবর্তন হতে পারে; কিন্তু আকীদা ও মানহাজের প্রশ্নে মুসলিম সমাজ সবসময় স্বচ্ছতা প্রত্যাশা করে।

এখানে আরেকটি বিষয় স্মরণ রাখা জরুরি। কোনো ব্যক্তি বা কয়েকজন আলেমের দলীয় সম্পৃক্ততাকে পুরো কওমি অঙ্গনের অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করা যেমন সঠিক নয়, তেমনি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পছন্দকে আকাবিরে উলামার প্রতিষ্ঠিত ইলমি অবস্থানের বিকল্প হিসেবে দেখাও সমীচীন নয়।

আজ প্রয়োজন আবেগনির্ভর স্লোগান নয়; বরং দলিলনির্ভর আলোচনা। প্রয়োজন ব্যক্তিপূজা নয়; বরং নীতির মূল্যায়ন। প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে মতভেদকে শত্রুতা নয়, বরং ইলমি পর্যালোচনার মাধ্যমে বিচার করা হবে।

কওমি অঙ্গনের সামনে তাই আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে—আদর্শিক প্রশ্নগুলোকে স্পষ্টভাবে উম্মাহর সামনে তুলে ধরা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোচনার পাশাপাশি আকীদা ও মানহাজের মৌলিক বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে জাতি তার আদর্শিক ভিত্তিকে দুর্বল করে, সে জাতি দীর্ঘমেয়াদে নেতৃত্বের আসন ধরে রাখতে পারে না।

অতএব, কওমি অঙ্গনে জামায়াতমুখিতার ঘটনাকে ব্যক্তি বা দলকেন্দ্রিক আবেগের দৃষ্টিতে নয়; বরং আদর্শ, আকীদা, মানহাজ এবং উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থের আলোকে মূল্যায়ন করাই সময়ের দাবি।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ