ভারতের মধ্যপ্রদেশের বেতুল জেলার ধাবা গ্রামে আদিবাসী শিশুদের শিক্ষার পথ সুগম করতে নিজের সঞ্চয় ও ঋণ করা ২০ লাখ টাকায় একটি স্কুল নির্মাণ করছিলেন আব্দুল নাঈম। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা ও ধর্মীয় উসকানি বা ‘মাদ্রাসা’ তৈরির গুজব ছড়িয়ে মঙ্গলবার স্কুলটির একাংশ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এতে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে কয়েকশ আদিবাসী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ।
ধাবা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল নাঈম নার্সারি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ‘এস.কে. পাবলিক স্কুল’ নামে একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ করেছিলেন। গত সপ্তাহে হঠাৎ এলাকায় গুজব ছড়ানো হয় যে, নাঈম অবৈধভাবে একটি ‘মাদ্রাসা’ নির্মাণ করছেন। নাঈম এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “এই গ্রামে মাত্র তিনটি মুসলিম পরিবার বাস করে। স্কুলটি এখনো চালু হয়নি, কোনো শিক্ষার্থী নেই। তাহলে এটি মাদ্রাসা হয় কী করে? আমি চেয়েছিলাম গ্রামের আদিবাসী শিশুদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার কষ্ট কমাতে।”
আদিবাসী শিশুদের কষ্ট ও স্বপ্নভঙ্গ
ধাবা ও পার্শ্ববর্তী আদিবাসী বসতিগুলোর শিশুদের প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে বা ভ্যানে করে স্কুলে যেতে হয়। অনেক সময় সকালে অন্ধকার থাকতে তাদের বাড়ি থেকে বের হতে হয়। স্থানীয় আদিবাসী অভিভাবক কপিল কাভদে বলেন, “সকাল ৮টার স্কুলের জন্য শিশুদের ২ ঘণ্টা আগে বের হতে হয়। নাঈম ভাই আমাদের ছোটবেলার বন্ধু, তিনি আমাদের সন্তানদের জন্য এই স্কুলটি গড়ছিলেন। এখন সব ধ্বংস হয়ে গেল।” সপ্তম শ্রেণির এক আদিবাসী ছাত্রী জানায়, পরিবহন না পেলে তাকে নিয়মিত স্কুল কামাই করতে হয়। গ্রামেই স্কুল হলে তার পড়াশোনা অনেক সহজ হতো।
প্রশাসনের তড়িঘড়ি ভূমিকা
গত রবিবার পঞ্চায়েত থেকে অনুমতি না থাকার অজুহাতে নাঈমকে উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া হয়। গ্রামবাসীর প্রতিবাদের মুখে পরদিন সোমবার পঞ্চায়েত একটি ‘অনাপত্তি পত্র’ (NOC) প্রদান করে। এমনকি সরপঞ্চ জানান, কোনো মাদ্রাসার বিরুদ্ধে তার কাছে অভিযোগ আসেনি। কিন্তু মঙ্গলবার, নাঈম যখন জেলা কালেক্টরের সাথে দেখা করতে ব্যস্ত ছিলেন, তখনই প্রশাসনের বুলডোজার স্কুলটির একাংশ ভেঙে ফেলে। মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট অজিত মারাভি দাবি করেছেন, জমি দখলের অভিযোগে শুধুমাত্র ‘অবৈধ’ অংশটুকুই সরানো হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ লঙ্ঘন
সম্প্রতি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ‘বুলডোজার জাস্টিস’ বা বিচারহীন উচ্ছেদের বিরুদ্ধে কঠোর গাইডলাইন দিয়েছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ১৫ দিন আগে নোটিশ দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক। ধাবা গ্রামের এই ঘটনায় পঞ্চায়েতের অনাপত্তি থাকা সত্ত্বেও যেভাবে তড়িঘড়ি ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, তা সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার লঙ্ঘন বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
বর্তমানে ধাবা গ্রামে সেই আধা-ভাঙা স্কুলটি আদিবাসী শিশুদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের এক দীর্ঘশ্বাসের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
বিষয় : ভারত ইসলামফোবিয়া

মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬
ভারতের মধ্যপ্রদেশের বেতুল জেলার ধাবা গ্রামে আদিবাসী শিশুদের শিক্ষার পথ সুগম করতে নিজের সঞ্চয় ও ঋণ করা ২০ লাখ টাকায় একটি স্কুল নির্মাণ করছিলেন আব্দুল নাঈম। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা ও ধর্মীয় উসকানি বা ‘মাদ্রাসা’ তৈরির গুজব ছড়িয়ে মঙ্গলবার স্কুলটির একাংশ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এতে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে কয়েকশ আদিবাসী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ।
ধাবা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল নাঈম নার্সারি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ‘এস.কে. পাবলিক স্কুল’ নামে একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ করেছিলেন। গত সপ্তাহে হঠাৎ এলাকায় গুজব ছড়ানো হয় যে, নাঈম অবৈধভাবে একটি ‘মাদ্রাসা’ নির্মাণ করছেন। নাঈম এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “এই গ্রামে মাত্র তিনটি মুসলিম পরিবার বাস করে। স্কুলটি এখনো চালু হয়নি, কোনো শিক্ষার্থী নেই। তাহলে এটি মাদ্রাসা হয় কী করে? আমি চেয়েছিলাম গ্রামের আদিবাসী শিশুদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার কষ্ট কমাতে।”
আদিবাসী শিশুদের কষ্ট ও স্বপ্নভঙ্গ
ধাবা ও পার্শ্ববর্তী আদিবাসী বসতিগুলোর শিশুদের প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে বা ভ্যানে করে স্কুলে যেতে হয়। অনেক সময় সকালে অন্ধকার থাকতে তাদের বাড়ি থেকে বের হতে হয়। স্থানীয় আদিবাসী অভিভাবক কপিল কাভদে বলেন, “সকাল ৮টার স্কুলের জন্য শিশুদের ২ ঘণ্টা আগে বের হতে হয়। নাঈম ভাই আমাদের ছোটবেলার বন্ধু, তিনি আমাদের সন্তানদের জন্য এই স্কুলটি গড়ছিলেন। এখন সব ধ্বংস হয়ে গেল।” সপ্তম শ্রেণির এক আদিবাসী ছাত্রী জানায়, পরিবহন না পেলে তাকে নিয়মিত স্কুল কামাই করতে হয়। গ্রামেই স্কুল হলে তার পড়াশোনা অনেক সহজ হতো।
প্রশাসনের তড়িঘড়ি ভূমিকা
গত রবিবার পঞ্চায়েত থেকে অনুমতি না থাকার অজুহাতে নাঈমকে উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া হয়। গ্রামবাসীর প্রতিবাদের মুখে পরদিন সোমবার পঞ্চায়েত একটি ‘অনাপত্তি পত্র’ (NOC) প্রদান করে। এমনকি সরপঞ্চ জানান, কোনো মাদ্রাসার বিরুদ্ধে তার কাছে অভিযোগ আসেনি। কিন্তু মঙ্গলবার, নাঈম যখন জেলা কালেক্টরের সাথে দেখা করতে ব্যস্ত ছিলেন, তখনই প্রশাসনের বুলডোজার স্কুলটির একাংশ ভেঙে ফেলে। মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট অজিত মারাভি দাবি করেছেন, জমি দখলের অভিযোগে শুধুমাত্র ‘অবৈধ’ অংশটুকুই সরানো হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ লঙ্ঘন
সম্প্রতি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ‘বুলডোজার জাস্টিস’ বা বিচারহীন উচ্ছেদের বিরুদ্ধে কঠোর গাইডলাইন দিয়েছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ১৫ দিন আগে নোটিশ দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক। ধাবা গ্রামের এই ঘটনায় পঞ্চায়েতের অনাপত্তি থাকা সত্ত্বেও যেভাবে তড়িঘড়ি ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, তা সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার লঙ্ঘন বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
বর্তমানে ধাবা গ্রামে সেই আধা-ভাঙা স্কুলটি আদিবাসী শিশুদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের এক দীর্ঘশ্বাসের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আপনার মতামত লিখুন