জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য নির্মূল কমিটি (CERD) ভারতের আসাম রাজ্যে বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের বিরুদ্ধে কথিত বৈষম্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নাগরিকত্ব যাচাই, উচ্ছেদ অভিযান, ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বলপ্রয়োগ নিয়ে গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে ভারত সরকারকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে আহ্বান জানিয়েছে কমিটি।
জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য নির্মূল কমিটি (Committee on the Elimination of Racial Discrimination—CERD) জানিয়েছে, আসামের বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণের বিষয়ে তারা “গভীর উদ্বেগ” প্রকাশ করছে। ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি জেনেভায় জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধিকে পাঠানো এক চিঠিতে কমিটি এই উদ্বেগের কথা তুলে ধরে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের ১২ মে পাঠানো পূর্ববর্তী যোগাযোগের জবাবে ভারত সরকার পর্যাপ্ত তথ্য দেয়নি। ওই যোগাযোগে আসামের বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল।
কমিটি জানিয়েছে, ভারত সরকার নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০১৯ এবং নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিধিমালা, ২০২৪ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিলেও জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) সংশোধন প্রক্রিয়ায় বৈষম্যের অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
এনআরসি ও নাগরিকত্ব যাচাই নিয়ে উদ্বেগ
CERD জানায়, বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে আসামের চূড়ান্ত এনআরসি তালিকা থেকে বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রশাসনিক দুর্বলতা, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত নথি সংগ্রহে জটিলতা, কঠোর যাচাই মানদণ্ড এবং বহু বাসিন্দাকে “অ-মূল অধিবাসী” হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা—যা আইনগতভাবে সুস্পষ্ট সংজ্ঞাবিহীন একটি পরিভাষা।
কমিটি আরও উল্লেখ করে, এনআরসি হালনাগাদের সময় ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম স্থগিত থাকায় “সন্দেহভাজন ভোটার” হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিরা তাদের নাগরিকত্বের অবস্থান চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পাননি, যা কার্যত তাদের নাগরিকপঞ্জিতে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ বন্ধ করে দেয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই প্রক্রিয়াগুলো বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের ওপর অসম বোঝা চাপিয়েছে। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র নদীর ভাঙন ও বন্যায় বাস্তুচ্যুত ঐতিহাসিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এই প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জোরপূর্বক উচ্ছেদ অভিযানের অভিযোগ
কমিটি আসাম সরকারের পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পর্যাপ্ত বিকল্প বাসস্থান বা ক্ষতিপূরণ ছাড়াই বহু জেলায় বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম পরিবারগুলোকে পরিকল্পিতভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছে।
সরকার এসব অভিযানকে ভূমি দখলমুক্তকরণ বা পরিবেশ সংরক্ষণের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড লঙ্ঘন করে এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
CERD আরও জানায়, ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় আসামে বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্য ও সহিংসতায় উসকানির অভিযোগ সম্পর্কে ভারত সরকার পর্যাপ্ত তথ্য দেয়নি। একই সঙ্গে মধ্য-২০২৪ সালে নাগরিক ও সংগঠিত গোষ্ঠীর সহিংস হামলার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে, যা ওই সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকারকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
চিঠিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত ও প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের অভিযোগও তুলে ধরা হয়। কমিটি জানিয়েছে, এসব ঘটনায় নিহত ও আহতদের বিষয়ে তদন্ত, বিচার ও জবাবদিহি ব্যবস্থার পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
আন্তর্জাতিক বর্ণবৈষম্য নির্মূল সনদের ৯(১) ধারার আওতায় CERD ভারতকে আহ্বান জানিয়েছে, ২০তম ও ২১তম পর্যায়িক প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় এসব অভিযোগ মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিতে।

মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য নির্মূল কমিটি (CERD) ভারতের আসাম রাজ্যে বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের বিরুদ্ধে কথিত বৈষম্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নাগরিকত্ব যাচাই, উচ্ছেদ অভিযান, ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বলপ্রয়োগ নিয়ে গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে ভারত সরকারকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে আহ্বান জানিয়েছে কমিটি।
জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য নির্মূল কমিটি (Committee on the Elimination of Racial Discrimination—CERD) জানিয়েছে, আসামের বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণের বিষয়ে তারা “গভীর উদ্বেগ” প্রকাশ করছে। ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি জেনেভায় জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধিকে পাঠানো এক চিঠিতে কমিটি এই উদ্বেগের কথা তুলে ধরে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের ১২ মে পাঠানো পূর্ববর্তী যোগাযোগের জবাবে ভারত সরকার পর্যাপ্ত তথ্য দেয়নি। ওই যোগাযোগে আসামের বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল।
কমিটি জানিয়েছে, ভারত সরকার নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন, ২০১৯ এবং নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিধিমালা, ২০২৪ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিলেও জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) সংশোধন প্রক্রিয়ায় বৈষম্যের অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
এনআরসি ও নাগরিকত্ব যাচাই নিয়ে উদ্বেগ
CERD জানায়, বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে আসামের চূড়ান্ত এনআরসি তালিকা থেকে বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রশাসনিক দুর্বলতা, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত নথি সংগ্রহে জটিলতা, কঠোর যাচাই মানদণ্ড এবং বহু বাসিন্দাকে “অ-মূল অধিবাসী” হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা—যা আইনগতভাবে সুস্পষ্ট সংজ্ঞাবিহীন একটি পরিভাষা।
কমিটি আরও উল্লেখ করে, এনআরসি হালনাগাদের সময় ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম স্থগিত থাকায় “সন্দেহভাজন ভোটার” হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিরা তাদের নাগরিকত্বের অবস্থান চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পাননি, যা কার্যত তাদের নাগরিকপঞ্জিতে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ বন্ধ করে দেয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই প্রক্রিয়াগুলো বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের ওপর অসম বোঝা চাপিয়েছে। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র নদীর ভাঙন ও বন্যায় বাস্তুচ্যুত ঐতিহাসিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এই প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জোরপূর্বক উচ্ছেদ অভিযানের অভিযোগ
কমিটি আসাম সরকারের পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পর্যাপ্ত বিকল্প বাসস্থান বা ক্ষতিপূরণ ছাড়াই বহু জেলায় বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম পরিবারগুলোকে পরিকল্পিতভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছে।
সরকার এসব অভিযানকে ভূমি দখলমুক্তকরণ বা পরিবেশ সংরক্ষণের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড লঙ্ঘন করে এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
CERD আরও জানায়, ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় আসামে বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্য ও সহিংসতায় উসকানির অভিযোগ সম্পর্কে ভারত সরকার পর্যাপ্ত তথ্য দেয়নি। একই সঙ্গে মধ্য-২০২৪ সালে নাগরিক ও সংগঠিত গোষ্ঠীর সহিংস হামলার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে, যা ওই সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকারকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
চিঠিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত ও প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের অভিযোগও তুলে ধরা হয়। কমিটি জানিয়েছে, এসব ঘটনায় নিহত ও আহতদের বিষয়ে তদন্ত, বিচার ও জবাবদিহি ব্যবস্থার পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
আন্তর্জাতিক বর্ণবৈষম্য নির্মূল সনদের ৯(১) ধারার আওতায় CERD ভারতকে আহ্বান জানিয়েছে, ২০তম ও ২১তম পর্যায়িক প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় এসব অভিযোগ মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিতে।

আপনার মতামত লিখুন