বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
কওমী টাইমস

রাজনীতির উত্তাপ ও আত্মশুদ্ধির মাস: ব্যস্ততার এক কঠিন সমীকরণ

নির্বাচনী ডামাডোলে কি ম্লান হচ্ছে রমযানের প্রস্তুতি?



নির্বাচনী ডামাডোলে কি ম্লান হচ্ছে রমযানের প্রস্তুতি?

রমযান মুসলিম সমাজের জন্য কেবল একটি ধর্মীয় মাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, নৈতিক পুনর্গঠন ও সামাজিক সংযমের এক অনন্য সময়। ঠিক এমন এক সময়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আরেক বাস্তবতা নির্বাচন। রাজনৈতিক ব্যস্ততা, উত্তাপ ও আলোচনার চাপে প্রশ্ন উঠছে, আমরা কি অজান্তেই রমযানের মূল বার্তাকে পেছনে ঠেলে দিচ্ছি?

নির্বাচন রাষ্ট্র পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। নেতৃত্ব নির্বাচন, মত প্রকাশ ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সবই সামাজিক জীবনের বাস্তবতা। কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন এই বাস্তবতা আমাদের আত্মিক দায়িত্ব ও নৈতিক অগ্রাধিকারকে গ্রাস করে ফেলে। রমযান আসন্ন হলেও সমাজের বড় একটি অংশের আলোচনার কেন্দ্রে এখন পোস্টার, স্লোগান, সমাবেশ ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। প্রশ্ন হলো রমযানের প্রস্তুতি কোথায়?

রমযান আমাদের শেখায় তাকওয়া আল্লাহভীতি ও আত্মসংযম। অথচ নির্বাচনী পরিবেশে আমরা প্রায়ই দেখি এর বিপরীত চিত্র। কথাবার্তায় অসহিষ্ণুতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটু মন্তব্য, যাচাইহীন তথ্য ছড়ানো এবং দলীয় আবেগে বিভক্তি এসব যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। রোজা রেখে জিহ্বার হেফাজত না করা, অন্যের সম্মান ক্ষুণ্ন করা কিংবা বিদ্বেষ ছড়ানো এসব কি রমযানের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

রমযান শুধু ক্ষুধা-পিপাসা সহ্য করার নাম নয়। নবী মুহাম্মদ ﷺ স্পষ্টভাবে শিখিয়েছেন যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও অসৎ কাজ পরিহার করে না, তার রোজার প্রয়োজন আল্লাহর কাছে নেই। এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইবাদতের আসল উদ্দেশ্য হলো চরিত্র গঠন। অথচ নির্বাচনের উত্তাপে আমরা অনেক সময় সেই চরিত্রগত সংযম হারিয়ে ফেলি।

এ কথা সত্য, ইসলাম রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ন্যায়বিচার, আমানতদার নেতৃত্ব ও জনকল্যাণমূলক শাসন ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। কিন্তু একই সঙ্গে ইসলাম এটাও বলে—সবকিছুর ভিত্তি হলো নৈতিকতা ও তাকওয়া। যদি রমযানের মতো পবিত্র সময়ে আমাদের রাজনৈতিক আচরণ শালীনতা ও সত্যনিষ্ঠা হারায়, তাহলে সেই রাজনীতি কতটা কল্যাণ বয়ে আনতে পারে—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

নির্বাচনের সময় মিডিয়া ও জনআলোচনার চরিত্রও বদলে যায়। টেলিভিশন টকশো, অনলাইন পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রায় পুরোপুরি রাজনীতিনির্ভর হয়ে পড়ে। ফলে রমযানের আগমনী বার্তা, আত্মশুদ্ধির আলোচনা ও নৈতিক মূল্যবোধের কথাবার্তা অনেকটাই আড়ালে চলে যায়। অথচ এই সময়টাই হওয়া উচিত আত্মসমালোচনা ও মূল্যবোধে ফেরার সময়।

রমযান আমাদের শেখায় ধৈর্য, সহনশীলতা ও ক্ষমাশীলতা। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রমযান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মতপার্থক্য যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়। ভিন্নমতকে সম্মান করা, ভাষায় শালীনতা বজায় রাখা এবং সত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া এসবই রমযানের নৈতিক দাবি।

নির্বাচন আসবে, যাবে। ক্ষমতার পালাবদল হবে। কিন্তু রমযান বছরে একবারই আসে আমাদের আত্মাকে জাগিয়ে তোলার জন্য। এই মাস আমাদের শেখায় ক্ষমতা নয়, নৈতিকতাই মানুষের আসল মর্যাদা নির্ধারণ করে; স্লোগান নয়, আমলই মানুষের প্রকৃত পরিচয়।

অতএব প্রশ্নটি কেবল অভিযোগের নয়, আত্মজিজ্ঞাসার। রমযান আসন্ন, নির্বাচনের ব্যস্ততায় আমরা কি সত্যিই রমযানকে ভুলে যাচ্ছি? নাকি আমরা চাইলে রমযানের তাকওয়া, সংযম ও নৈতিকতার আলো দিয়েই আমাদের রাজনীতি ও সমাজচর্চাকে আরও মানবিক ও দায়িত্বশীল করে তুলতে পারি? উত্তরটি আমাদের আচরণেই প্রতিফলিত হবে।

বিষয় : রমযান নৈতিকতা

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬


নির্বাচনী ডামাডোলে কি ম্লান হচ্ছে রমযানের প্রস্তুতি?

প্রকাশের তারিখ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

রমযান মুসলিম সমাজের জন্য কেবল একটি ধর্মীয় মাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, নৈতিক পুনর্গঠন ও সামাজিক সংযমের এক অনন্য সময়। ঠিক এমন এক সময়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আরেক বাস্তবতা নির্বাচন। রাজনৈতিক ব্যস্ততা, উত্তাপ ও আলোচনার চাপে প্রশ্ন উঠছে, আমরা কি অজান্তেই রমযানের মূল বার্তাকে পেছনে ঠেলে দিচ্ছি?

নির্বাচন রাষ্ট্র পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। নেতৃত্ব নির্বাচন, মত প্রকাশ ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সবই সামাজিক জীবনের বাস্তবতা। কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন এই বাস্তবতা আমাদের আত্মিক দায়িত্ব ও নৈতিক অগ্রাধিকারকে গ্রাস করে ফেলে। রমযান আসন্ন হলেও সমাজের বড় একটি অংশের আলোচনার কেন্দ্রে এখন পোস্টার, স্লোগান, সমাবেশ ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। প্রশ্ন হলো রমযানের প্রস্তুতি কোথায়?

রমযান আমাদের শেখায় তাকওয়া আল্লাহভীতি ও আত্মসংযম। অথচ নির্বাচনী পরিবেশে আমরা প্রায়ই দেখি এর বিপরীত চিত্র। কথাবার্তায় অসহিষ্ণুতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটু মন্তব্য, যাচাইহীন তথ্য ছড়ানো এবং দলীয় আবেগে বিভক্তি এসব যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। রোজা রেখে জিহ্বার হেফাজত না করা, অন্যের সম্মান ক্ষুণ্ন করা কিংবা বিদ্বেষ ছড়ানো এসব কি রমযানের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

রমযান শুধু ক্ষুধা-পিপাসা সহ্য করার নাম নয়। নবী মুহাম্মদ ﷺ স্পষ্টভাবে শিখিয়েছেন যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও অসৎ কাজ পরিহার করে না, তার রোজার প্রয়োজন আল্লাহর কাছে নেই। এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইবাদতের আসল উদ্দেশ্য হলো চরিত্র গঠন। অথচ নির্বাচনের উত্তাপে আমরা অনেক সময় সেই চরিত্রগত সংযম হারিয়ে ফেলি।

এ কথা সত্য, ইসলাম রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ন্যায়বিচার, আমানতদার নেতৃত্ব ও জনকল্যাণমূলক শাসন ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। কিন্তু একই সঙ্গে ইসলাম এটাও বলে—সবকিছুর ভিত্তি হলো নৈতিকতা ও তাকওয়া। যদি রমযানের মতো পবিত্র সময়ে আমাদের রাজনৈতিক আচরণ শালীনতা ও সত্যনিষ্ঠা হারায়, তাহলে সেই রাজনীতি কতটা কল্যাণ বয়ে আনতে পারে—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

নির্বাচনের সময় মিডিয়া ও জনআলোচনার চরিত্রও বদলে যায়। টেলিভিশন টকশো, অনলাইন পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রায় পুরোপুরি রাজনীতিনির্ভর হয়ে পড়ে। ফলে রমযানের আগমনী বার্তা, আত্মশুদ্ধির আলোচনা ও নৈতিক মূল্যবোধের কথাবার্তা অনেকটাই আড়ালে চলে যায়। অথচ এই সময়টাই হওয়া উচিত আত্মসমালোচনা ও মূল্যবোধে ফেরার সময়।

রমযান আমাদের শেখায় ধৈর্য, সহনশীলতা ও ক্ষমাশীলতা। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রমযান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মতপার্থক্য যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়। ভিন্নমতকে সম্মান করা, ভাষায় শালীনতা বজায় রাখা এবং সত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া এসবই রমযানের নৈতিক দাবি।

নির্বাচন আসবে, যাবে। ক্ষমতার পালাবদল হবে। কিন্তু রমযান বছরে একবারই আসে আমাদের আত্মাকে জাগিয়ে তোলার জন্য। এই মাস আমাদের শেখায় ক্ষমতা নয়, নৈতিকতাই মানুষের আসল মর্যাদা নির্ধারণ করে; স্লোগান নয়, আমলই মানুষের প্রকৃত পরিচয়।

অতএব প্রশ্নটি কেবল অভিযোগের নয়, আত্মজিজ্ঞাসার। রমযান আসন্ন, নির্বাচনের ব্যস্ততায় আমরা কি সত্যিই রমযানকে ভুলে যাচ্ছি? নাকি আমরা চাইলে রমযানের তাকওয়া, সংযম ও নৈতিকতার আলো দিয়েই আমাদের রাজনীতি ও সমাজচর্চাকে আরও মানবিক ও দায়িত্বশীল করে তুলতে পারি? উত্তরটি আমাদের আচরণেই প্রতিফলিত হবে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত