প্রকাশের তারিখ : ১৪ মার্চ ২০২৬
মেঘালয়ে নির্বাচন ঘিরে ভয়াবহ সহিংসতা: দুই মুসলিম নিহত, মসজিদ ও দোকানে অগ্নিসংযোগ
ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পশ্চিম গারো পাহাড় জেলায় স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদ (GHADC) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর হামলায় দুই মুসলিম যুবক নিহত হয়েছেন, পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে একটি মসজিদ এবং অন্তত ৩০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। প্রাণভয়ে শত শত মুসলিম পরিবার ভিটেমাটি ছেড়ে প্রতিবেশী রাজ্য আসামে আশ্রয় নিয়েছে। আদালতের রায় থাকা সত্ত্বেও অ-উপজাতীয়দের নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দিতেই এই পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।মেঘালয়ের প্রভাবশালী উপজাতীয় সংগঠন এবং গারা ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (GNLA) ও ফেডারেশন অফ খাসি-জৈন্তিয়া অ্যান্ড গারো পিপল (FKJGP)-এর মতো গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘ দিন ধরে দাবি করে আসছে যে, মেঘালয় শুধুমাত্র আদিবাসীদের জন্য। তাদের দাবি, অ-উপজাতীয় মুসলিমরা এবং তাদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো অধিকার নেই।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, জনৈক গারো নেতা মুসলিমদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলছেন, "এটি তোমাদের জমি নয়; এখানে 'আল্লাহু আকবার' চলবে না।" সমালোচকদের দাবি, নির্বাচনের মাধ্যমে মুসলিমদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ঘটলে আদিবাসীদের জনসংখ্যাগত ভারসাম্য নষ্ট হবে। তাদের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে যে, ষষ্ঠ তফসিলের অধীনে গঠিত কাউন্সিলগুলো কেবল আদিবাসীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য, তাই অ-উপজাতীয়দের এখানে প্রার্থী হওয়া অবৈধ।সহিংসতার সূত্রপাত ঘটে গত ৯ মার্চ, যখন তুরা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়ে সাবেক বিধায়ক ইসমাতুর মোমিনীন জিএইচএডিসি নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিতে যান। সেখানে উপস্থিত উপজাতীয় প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাকে ঘেরাও করে শারীরিক লাঞ্ছনা করে এবং চিৎকার করে বলতে থাকে, "তুই এখানে কেন এসেছিস? তোকে নির্বাচনে দাঁড়াতে দেব না।"এই ঘটনার পর রাতেই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ১০ মার্চ ভোরে পশ্চিম গারো পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় অগ্নিসংযোগ শুরু হয়। হামলায় নিহত হন খাইরুল ইসলাম ও আশরাফুল ইসলাম নামের দুই যুবক। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে দেখা গেছে, একজনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে এবং অন্যজনকে পিস্তল দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। হামলাকারীরা স্থানীয় একটি মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং মসজিদের ইমামকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। চিবিনাং ও তুরা বাজার এলাকায় মুসলিমদের মালিকানাধীন ৩০টিরও বেশি দোকান ভস্মীভূত করা হয়।ভয়ে নারী ও শিশুদের নিয়ে শত শত পরিবার আসাম সীমান্তে পালিয়ে গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী জানান, "আক্রমণকারীরা বেছে বেছে মুসলিমদের সম্পত্তিতে আগুন দিয়েছে, কিন্তু পাশে থাকা মন্দিরগুলো অক্ষত ছিল। তারা জানত দিল্লিতে হিন্দুত্ববাদী সরকার থাকায় মন্দিরে হাত দিলে পরিণতি খারাপ হবে, কিন্তু মুসলিমদের আর্তনাদ শোনার কেউ নেই।" বর্তমানে এলাকায় সেনাবাহিনী টহল দিচ্ছে এবং ইন্টারনেট সেবা বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে।বাস্তবতা হলো, মেঘালয় হাইকোর্ট সম্প্রতি এক আদেশে স্পষ্ট করেছে যে, আইনি প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে অ-উপজাতীয়দের নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। ভারতের সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিল আদিবাসীদের সুরক্ষা দিলেও তা কোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার বা গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের অধিকার কেড়ে নেয় না। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, মেঘালয়ে মুসলিমরা জনসংখ্যার ৪.৪%, যাদের বড় অংশ ব্রিটিশ আমল থেকেই সেখানে বসবাসকারী।মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ঘটনাকে "সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক অধিকার হরণের প্রচেষ্টা" হিসেবে দেখছে। আসামের স্টাইলে "অনুপ্রবেশকারী" তকমা দিয়ে স্থানীয় নাগরিকদের ওপর হামলা চালানো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী। যারা প্রকাশ্যে ঘৃণামূলক বক্তব্য (Hate Speech) ছড়িয়েছে এবং হত্যা-অগ্নিসংযোগে জড়িত, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। এই সংকটকালে মেঘালয়ের মুসলিমদের নাগরিক মর্যাদা রক্ষা এবং জানমালের নিরাপত্তা বিধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ জরুরি।
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত