প্রকাশের তারিখ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬
দিল্লির উত্তম নগরে হিন্দুত্ববাদী উগ্রতা: ১৭০০ ত্রিশূল বিতরণ ও সংখ্যালঘু বিদ্বেষী হুঙ্কার
ভারতের রাজধানী দিল্লির উত্তম নগর এলাকায় সম্প্রতি এক বিতর্কিত কর্মসূচির মাধ্যমে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) এবং বজরং দল প্রায় ১৭০০ ত্রিশূল বিতরণ করেছে। ‘ত্রিশূল দীক্ষা’ নাম দিয়ে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে মুসলিম ও সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে উস্কানিমূলক ও বিদ্বেষপ্রবণ বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে। ভারী পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর উপস্থিতিতে আয়োজিত এই ঘটনা পুরো এলাকায় নতুন করে সাম্প্রদায়িক উত্তজনা ও ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) এবং বজরং দলের দাবি, এই ‘ত্রিশূল দীক্ষা’ কর্মসূচিটি মূলত ‘সেবা, সংস্কার এবং সুরক্ষা’র বার্তা দেওয়ার জন্য আয়োজিত হয়েছে। ভিএইচপি-র দিল্লি প্রাদেশিক সম্পাদক সুরেন্দ্র গুপ্ত এবং সভাপতি কপিল খান্নার মতে, হিন্দু সমাজকে ‘জাগ্রত’ করার লক্ষ্যে এবং তরুণদের আত্মরক্ষার দীক্ষা দিতেই এই আয়োজন। তাদের ভাষ্যমতে, ত্রিশূল বিতরণ কোনো আইন বা সংবিধানের লঙ্ঘন নয়, বরং এটি একটি ধর্মীয় প্রতীক। অনুষ্ঠানে উপস্থিত নিহত তরুণ খটিকের পরিবারও দাবি করেছে যে, বজরং দল তাদের পাশে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচারের দাবি তুলছে। সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রকাশ্য অস্ত্র বিতরণের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো কঠোর অবস্থান দেখা যায়নি এবং স্থানীয় পুলিশ এটিকে একটি সুশৃঙ্খল ‘ধর্মীয় অনুষ্ঠান’ হিসেবেই অভিহিত করার চেষ্টা করেছে।গত ১২ এপ্রিল, পশ্চিম দিল্লির হস্তসাল এলাকার আয়াপ্পা পার্কে এই উগ্র কর্মসূচিটি পালিত হয়। গত ৪ মার্চ হোলির দিনে উত্তম নগরে তরুণ খটিক নামক এক যুবকের খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। যদিও পুলিশ দ্রুতই অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে, তবে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো একে ‘জিহাদি হামলা’ হিসেবে অভিহিত করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ১৭০০ যুবকের হাতে ত্রিশূল তুলে দেওয়া হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক ১০-১২ বছরের শিশু ও কিশোর ছিল।মঞ্চ থেকে ভিএইচপি নেতারা মুসলিমদের ‘শেয়াল’ এবং হিন্দুদের ‘সিংহের বাচ্চা’ হিসেবে সম্বোধন করে সহিংসতার প্রচ্ছন্ন হুমকি দেন। হায়দ্রাবাদের জনৈক নেতার পুরনো বক্তব্য টেনে এনে সংখ্যালঘুদের ভীত-সন্ত্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়।উপস্থিত জনতাকে দিয়ে ভারতকে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ বানানোর শপথ পাঠ করানো হয়, যা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের সরাসরি পরিপন্থী। তরুণ খটিকের মৃত্যুর পর অভিযুক্ত মুসলিম পরিবারের ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে এবং বুলডোজার দিয়ে উচ্ছেদ চালানো হয়েছে। ভয়ে ও আতঙ্কে ঐ পরিবারসহ এলাকার অনেক সংখ্যালঘু মানুষ বর্তমানে এলাকাছাড়া। প্রকাশ্য এই ত্রিশূল বিতরণ কর্মসূচি স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের আলোকে এই ধরনের প্রকাশ্য অস্ত্র বিতরণ ও ঘৃণ্য বক্তব্য (Hate Speech) স্পষ্টভাবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। ভারতের অস্ত্র আইন ও দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং উস্কানিমূলক সমাবেশের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান থাকলেও, দিল্লির এই ঘটনায় পুলিশের নীরবতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন উঠেছে।ভারতের সংবিধান সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেয়। একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে অস্ত্র বিতরণ এবং ঘৃণা ছড়ানো সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪ ও ২১-এর লঙ্ঘন।‘দ্যা ওয়্যার’সহ বিভিন্ন স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, পুলিশের উপস্থিতিতেই এই উস্কানিমূলক কার্যক্রম চলেছে, যা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।উস্কানিদাতাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে মামলা দায়ের এবং এলাকার শান্তি বজায় রাখতে সাম্প্রদায়িক উস্কানি বন্ধ করা। বিচারহীনতার সংস্কৃতি উগ্রবাদীদের আরও সাহসী করে তুলছে, যা দিল্লির মতো সংবেদনশীল শহরের জন্য অশনি সংকেত।এই ক্রান্তিকালে মুসলিমদের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল রাষ্ট্রের নয়, বরং আন্তর্জাতিক সচেতন মহলেরও দায়িত্ব। উস্কানির বিপরীতে ধৈর্যের সাথে আইনি লড়াই এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সোচ্চার থাকাই এখন সময়ের দাবি। জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে দিল্লির সামাজিক বুনন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত