প্রকাশের তারিখ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬
নাগরিকত্ব নিয়ে আসামের মুখ্যমন্ত্রীর বিতর্কিত বিভাজন: মুসলিমরা ‘অনুপ্রবেশকারী’, হিন্দুরা ‘শরণার্থী’
ভারতের আসাম রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসীদের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে দুই ভাগে বিভক্ত করে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুরা নিছক ‘শরণার্থী’, অপরদিকে মুসলিমরা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারণায় দেয়া তার এই বক্তব্য উম্মাহর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও নাগরিক অধিকার নিয়ে নতুন প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে।আসামের মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্ব শর্মা তার বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ধর্মীয় বিভাজন টেনেছেন। তার দাবি অনুযায়ী, “বাংলাদেশি মুসলিম এবং বাংলাদেশি হিন্দুরা এক নয়; তারা দুটি পৃথক সম্প্রদায়।” তিনি ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের সমালোচনা করে বলেন, উভয় পক্ষকে একইভাবে দেখা একটি ভুল ধারণা।মুখ্যমন্ত্রী শর্মা যুক্তি দেন যে, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) অনুযায়ী বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে নির্যাতিত অমুসলিম সংখ্যালঘুরা ভারতে নাগরিকত্বের অধিকার রাখে। তার মতে, “যখন আমরা অনুপ্রবেশকারী বলি, তখন আমরা বাংলাদেশি মুসলিমদের বোঝাই, হিন্দুদের নয়। হিন্দুরা শরণার্থী, অনুপ্রবেশকারী নয়।” তিনি আরও দাবি করেন, আসামে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা রাজ্যের জনতাত্ত্বিক কাঠামো ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।২৬ এপ্রিল, প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী জনসভায় হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ২০ জন তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ মুসলিমকে পুশব্যাক করা হয়েছে এবং গত কয়েক মাসে এই সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে।আসাম ও ভারতের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকায় বছরের পর বছর ধরে বসবাসকারী মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর এই বক্তব্যের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। নাগরিকত্ব প্রমাণের নামে সাধারণ মুসলিমদের প্রতিনিয়ত হয়রানি, ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্ক এবং উচ্ছেদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে যে, নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অনেককে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী একে ‘চূড়ান্ত রাজনীতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যার মূল লক্ষ্য মুসলিম অভিবাসীদের চিহ্নিত করে বহিষ্কার করা।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং ভারতের সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বৈষম্য ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর পরিপন্থী। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন (UNHCR) এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে কেবল তার ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা বা বহিষ্কার করা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।ভারতের সংবিধানের ১৪ নং অনুচ্ছেদে আইনের চোখে সবার সমান অধিকারের কথা বলা হলেও, সিএএ (CAA) এবং এনআরসি (NRC) এর মাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে একটি বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মানবিক মর্যাদার নিরিখে শরণার্থী এবং অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় ইনসাফ ও স্বচ্ছ তদন্ত অপরিহার্য। রাজনৈতিক স্বার্থে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে আতঙ্কিত করা কেবল সামাজিক অস্থিরতাই বাড়াবে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট নিরসনে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মানবিক ও আইনি মানদণ্ড অনুসরণের মাধ্যমেই প্রকৃত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব।
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত