প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬
আজমিরের ঐতিহাসিক আড়াই দিন কা ঝোঁপড়া মসজিদে হনুমান চালিসা পাঠের অনুমতি দাবি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের
ভারতের রাজস্থানের আজমীরে অবস্থিত দ্বাদশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক ‘আড়াই দিন কা ঝোপড়া’ মসজিদের ভেতরে হনুমান চালিসা পাঠের অনুমতি চেয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে একটি কট্টরপন্থী হিন্দু সংগঠন। ‘মহারাণা প্রতাপ সেনা’ নামের এই দলটির দাবি, বর্তমান এই মসজিদটি অতীতে একটি হিন্দু মন্দির ও সংস্কৃত বিদ্যালয় ছিল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় এবং নাগরিক অধিকার কর্মীদের মধ্যে দেশব্যাপী ইসলামী ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার একটি নতুন আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে।ভারতের রাজস্থানের আজমীরে অবস্থিত ৮০০ বছরেরও বেশি পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপত্য ‘আড়াই দিন কা ঝোপড়া’ মসজিদ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও উত্তেজনা শুরু হয়েছে। ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দে সুলতান মুহাম্মদ ঘুরির তুর্কি সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবেক এই মসজিদটি নির্মাণ করেন, যা উত্তর ভারতের অন্যতম প্রাচীন মসজিদ হিসেবে স্বীকৃত। পরবর্তীতে দিল্লির সুলতান ইলতুৎমিশ এর সম্প্রসারণ ঘটান। মসজিদটির সুউচ্চ খিলান, পাথরের সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং বেলেপাথরে খোদাই করা কুরআনের আয়াত সংবলিত ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যশৈলী বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ (ASI) দ্বারা সংরক্ষিত এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ঘিরেই এবার শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের দাবি ও কৌশলচলতি সপ্তাহে কট্টরপন্থী হিন্দু সংগঠন ‘মহারাণা প্রতাপ সেনা’ কর্তৃপক্ষের কাছে একটি আবেদন জমা দিয়েছে। তাদের দাবি, মসজিদের ভেতরের বিভিন্ন খোদাই এবং স্থাপত্যের মোটিফ প্রমাণ করে যে এর শিকড় হিন্দু ঐতিহ্যের সাথে জড়িত। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের ডানপন্থী হিন্দু সংগঠনগুলো মধ্যযুগীয় মুসলিম শাসনের ইতিহাসকে সামনে এনে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা মসজিদ ও ইসলামী স্থাপত্যের ওপর একের পর এক মালিকানা দাবি করছে। এই ধরনের অভিযানের ক্ষেত্রে সাধারণত তিনটি কৌশল ব্যবহার করা হয়—আদালতে পিটিশন দায়ের, প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপের দাবি এবং জনসমাবেশ সৃষ্টি করা; যেখানে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) নেতাদের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ সমর্থন থাকে।মুসলিম সম্প্রদায় ও সুশীল সমাজের উদ্বেগএই ক্রমবর্ধমান প্রবণতাকে মুসলিম সংগঠন এবং মানবাধিকার কর্মীরা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে দেখছেন। তাদের মতে, এটি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোকে ধ্বংস করার এবং আইনগত ও প্রতীকীভাবে মুসলিম ঐতিহ্যকে গ্রাস করার একটি সুসংগঠিত প্রচেষ্টা। এর ফলে ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলিম জনসংখ্যার মধ্যে প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতা ও গভীর উৎকণ্ঠা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজমীরের স্থানীয় প্রশাসন অবশ্য এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তারা এই ধরণের ধর্মীয় আচার পালনের অনুমতি দিলে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি বা গণ-অসন্তোষ তৈরি হতে পারে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত মতামতের জন্য এএসআই (ASI) এর কাছে প্রতিবেদন চেয়েছে।আজমীরের এই ঘটনাটি একক কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এটি বারাণসীর জ্ঞানবাপী মসজিদ, মথুরার শাহি ইদগাহ মসজিদ এবং সম্ভালের শাহি মসজিদের মতো হাই-প্রোফাইল আইনি লড়াইয়েরই একটি অংশ, যেখানে প্রতি ক্ষেত্রেই হিন্দু পক্ষ দাবি করছে যে সেখানে একসময় মন্দির ছিল। সম্প্রতি এই ধরণের আন্দোলনের গতি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ গত সপ্তাহে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট ধার জেলার ৭০০ বছরের পুরোনো ‘কামাল মওলা মসজিদ’ কমপ্লেক্সকে দেবী সরস্বতীর একটি হিন্দু মন্দির হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। আদালতের এই রায়গুলোর পর মুসলিমদের উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে যে, আদালত এবং রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা এখন অনেকটাই এসব দাবির পক্ষে চলে যাচ্ছে। ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে এই বিষয়ে নানা দ্বিমত থাকলেও, প্রতিটি নতুন পিটিশন এবং আদালতের রায় আধুনিক ভারতে একটি বড় প্রশ্ন তুলছে—বর্তমান এই দেশে শেষ পর্যন্ত কার ইতিহাস টিকে থাকবে?এই ঘটনাটি বারাণসীর জ্ঞানবাপী মসজিদ, মথুরার শাহি ঈদগাহ এবং সম্ভলের শাহি মসজিদের চলমান আইনি লড়াইয়ের কথাই মনে করিয়ে দেয়। মাত্র এক সপ্তাহ আগেই মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট ধারের ৭০০ বছরের পুরোনো 'কামাল মওলা মসজিদ' কমপ্লেক্সটিকে হিন্দু দেবী সরস্বতীর মন্দির হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা এই ধরনের দাবিদারদের আরও উৎসাহিত করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং ভারতের সংবিধান বিশেষজ্ঞরা প্রায়শই ১৯৯১ সালের 'উপাসনালয় আইন' (Places of Worship Act)-এর কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যা অনুযায়ী ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের পর কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ের চরিত্র পরিবর্তন করা নিষিদ্ধ। সমালোচকদের মতে, একের পর এক আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং রাজনৈতিক মদদ ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর মূল ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ