প্রকাশের তারিখ : ২৮ মে ২০২৬
গাজার ধ্বংসস্তূপ ও তাবু শিবিরে ঈদের জামাতে শামিল হাজারো ফিলিস্তিনি
ইসরায়েলের অব্যাহত আক্রমণ এবং কঠোর অবরোধের দুই বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে তীব্র মানবিক সংকটের মুখোমুখি ফিলিস্তিনিরা। এই কঠিন পরিস্থিতির মাঝেই গাজা উপত্যকার হাজার হাজার ফিলিস্তিনি ধ্বংস হয়ে যাওয়া মসজিদের ধ্বংসস্তূপের ওপর, খোলা রাস্তায় এবং তাঁবু ক্যাম্পে পবিত্র ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করেছেন। চারপাশের সীমাহীন ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও তাদের ধর্মীয় আবেগ ও অবিচলতার চিত্র ফুটে উঠেছে এই ঈদ জামাতে।২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের তীব্র হামলা ও সর্বাত্মক অবরোধের ছায়ায় এবারও এক ভিন্ন ও বেদনাদায়ক পরিবেশে ঈদ উদযাপন করছেন গাজা উপত্যকার বাসিন্দারা। যুদ্ধ এবং ধ্বংসলীলার মাঝেও হাজার হাজার ফিলিস্তিনি সমবেত হয়েছিলেন ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য।খান ইউনুসের হূদা মসজিদের ধ্বংসস্তূপে জামাতগাজা উপত্যকার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনুসে এক মর্মস্পর্শী দৃশ্য দেখা যায়। ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক 'হূদা মসজিদ'-এর ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েই ঈদের নামাজ আদায় করেন স্থানীয় ফিলিস্তিনিরা। পাথরের স্তূপ ও রডের কাঠামোর মাঝে দাঁড়িয়ে শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সবাই একসঙ্গে সালাত আদায় করেন এবং হামলায় নিহত ও নিখোঁজ স্বজনদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় অশ্রুসজল চোখে বিশেষ মোনাজাত করেন।গাজার মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত নুসেইরাত শরণার্থী ক্যাম্পের চিত্র ছিল আরও করুণ। ইসরায়েলি বাহিনীর উপর্যুপরি হামলায় ওই এলাকার প্রায় সব মসজিদই এখন ব্যবহারের অনুপযোগী। ফলে হাজার হাজার মানুষ বাধ্য হয়ে খোলা রাস্তায় এবং ধসে পড়া ভবনের আশপাশে ঈদের জামাতের জন্য কাতারবদ্ধ হন।তাঁবু ক্যাম্পের ঈদহামলায় নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়ে গাজার যেসব বাসিন্দা বর্তমানে বিভিন্ন অস্থায়ী তাঁবু ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের ঈদের সকালটি শুরু হয়েছিল আকাশবাতাস কাঁপানো তাকবির ধ্বনির মধ্য দিয়ে। তাঁবুগুলোর মাঝে তৈরি করা ছোট ছোট অস্থায়ী নামাজের স্থান এবং উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে তারা নামাজ শেষ করেন। যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি এবং তীব্র খাদ্য ও চিকিৎসা সংকটের মধ্যেই তারা এই ধর্মীয় বিধান পালন করেন।গাজা শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ঐতিহাসিক সারায়া চত্বরেও হাজার হাজার ফিলিস্তিনি ঈদের নামাজের জন্য জড়ো হয়েছিলেন। চারপাশের ধ্বংসপ্রাপ্ত বহুতল ভবন এবং মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত আবাসিক এলাকাগুলোর ঠিক মাঝখানে এই জামাত অনুষ্ঠিত হয়, যা অবরুদ্ধ গাজাবাসীর মানসিক দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে প্রকাশ পায়।মসজিদ ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অবিরাম হামলায় গাজার অধিকাংশ মসজিদ, স্কুল, হাসপাতাল এবং বেসামরিক অবকাঠামো সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে। অধিকাংশ ধর্মীয় উপাসনালয় ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ায়, ফিলিস্তিনিরা এখন কেবল ঈদের নামাজই নয়, বরং জুম্মা এবং পাঁচ ওয়াক্তের নামাজও খোলা আকাশের নিচে বা ধ্বংসস্তূপের মাঝে পড়তে বাধ্য হচ্ছেন।উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়া সত্ত্বেও ইসরায়েল গাজা উপত্যকার বিভিন্ন অঞ্চলে তার সামরিক অভিযান ও আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে, যার ফলে প্রতিনিয়ত সাধারণ ফিলিস্তিনিদের জীবন হুমকির মুখে পড়ছে।সমস্ত প্রতিকূলতা, প্রিয়জন হারানোর বেদনা এবং তীব্র মানবিক সংকটের মাঝেও গাজাবাসীর এই ঈদের জামাত তাদের অবিচল ধর্মীয় বিশ্বাস ও টিকে থাকার অদম্য লড়াইয়ের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিত অনতিবিলম্বে এই স্থায়ী সংকটের স্থায়ী ও ন্যায়ভিত্তিক সমাধান নিশ্চিত করা।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ