প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুন ২০২৬
ফ্রিডম ফ্লোটিলায় ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতনের অভিযোগ
গাজা উপত্যকার দীর্ঘমেয়াদি অবৈধ অবরোধ ভাঙা এবং চলমান গণহত্যা ও মানবিক সংকটের প্রতিবাদে আন্তর্জাতিক জলসীমায় শান্তিকামী ফ্লোটিলার ওপর বর্বর হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার (Global Sumud Flotilla) ২০২৬ সালের বসন্তকালীন অভিযানে অংশ নেওয়া ফরাসি মানবাধিকার কর্মী মেরিয়েম হাজাল ইসরায়েলি সৈন্যদের হাতে আটক থাকাকালীন ভয়ংকর মারধর, চরম শারীরিক নির্যাতন এবং যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার লোমহর্ষক বিবরণ দিয়েছেন। প্যারিসে আনাদোলু এজেন্সির কাছে সেই অমানবিক ও বীভৎস অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন ৩৮ বছর বয়সী এই নারী অ্যাক্টিভিস্ট।২০০৭ সাল থেকে গাজা উপত্যকায় চলে আসা ইসরায়েলের অবৈধ অবরোধ ভাঙা, চলমান গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি এবং অবরুদ্ধ মানুষের জন্য একটি নিরাপদ মানবিক করিডোর প্রতিষ্ঠার তাগিদ থেকে ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ওয়েভস অব ফ্রিডম ফ্রান্স’-এর সদস্য মেরিয়েম হাজাল গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু গত ১৮ মে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক জলসীমায় তাদের বহনকারী নৌযানটিতে অতর্কিত হামলা চালায় ইসরায়েলি কমান্ডোরা।আন্তর্জাতিক জলসীমায় অপহরণ ও প্রথম আঘাতঘটনার বিবরণ দিয়ে হাজাল বলেন, "গত ১৮ মে সোমবার বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে ইসরায়েলি সৈন্যরা কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই আমাদের নৌযানটি অবরুদ্ধ করে ফেলে। আমাদের পরনে লাইফ জ্যাকেট ছিল এবং কোনো ধরনের সংঘাত এড়াতে আমরা দুই হাত ওপরে তুলে রেখেছিলাম। তা সত্ত্বেও সৈন্যরা এসেই পুরুষ অ্যাক্টিভিস্টদের হাত শক্ত করে বেঁধে ফেলে এবং পুরো নৌযানে তল্লাশি চালায়। এরপর আমাদের সবাইকে জোরপূর্বক একটি ইসরায়েলি সামরিক জাহাজে তুলে নেওয়া হয়।"তিনি আরও জানান, সামরিক জাহাজে ওঠার সাথে সাথেই শুরু হয় নৃশংসতা। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে হাত শক্ত করে বেঁধে হাঁটু গেঁড়ে বসতে বাধ্য করা হয়। এরপর ঠান্ডা থেকে বাঁচার জন্য পরা জ্যাকেট, সোয়েটার, ঐতিহ্যবাহী কেফিয়াহ, স্কার্ফ এবং স্নিকার্স পর্যন্ত জোরপূর্বক খুলে নেওয়া হয়। সম্পূর্ণ ভেজা ও স্যাঁতসেঁতে ঠাণ্ডা মেঝেতে শুধুমাত্র একটি টি-শার্ট ও প্যান্ট পরা অবস্থায় উপুড় করে শুইয়ে রাখা হয় তাদের। মাথা সোজা করলেই বুট ও হাত দিয়ে চেপে ধরা হতো।জাহাজের ‘কালো ঘর’ ও লোমহর্ষক যৌন নির্যাতনসামরিক জাহাজটিতে চারটি কনটেইনার দিয়ে একটি অস্থায়ী কারাগার বা ‘নির্যাতন কেন্দ্র’ তৈরি করা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি কনটেইনারকে অ্যাক্টিভিস্টরা নাম দিয়েছেন ‘ব্ল্যাক রুম’ বা ‘কালো ঘর’। হাজাল বলেন:"এই কালো ঘরের ভেতর আমাদের এক এক করে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে আমাদের ওপর যে অকল্পনীয় সহিংসতা, মারধর, যৌন নিপীড়ন এবং শারীরিক-মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা ধারণার বাইরে। আমরা অনেকেই এখনো সেই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারছি না।"কন্টেইনারের বাইরে থেকে অন্য সহযোদ্ধাদের আর্তচিৎকার শুনে ভয়ে শিউরে উঠেছিলেন হাজাল। তিনি বলেন, "আমি ভেবেছিলাম আমাকে গণধর্ষণ করা হবে। আমার ওপর ভয়াবহ যৌন নিপীড়ন চালানো হয়েছে, যা ছিল সম্পূর্ণ অমানবিক।" ভেতরে প্রবেশ করে তিনি দেখতে পান, তার এক সহযোদ্ধাকে অন্তর্বাস পরা অবস্থায় প্যান্ট খুলে উপুড় করে মেঝেতে ফেলে রাখা হয়েছে।এরপর ইসরায়েলি সৈন্যরা হাজালকে চুল ধরে টেনে ভেতরে নিয়ে যায় এবং তার বুকে হাত দিয়ে চরমভাবে যৌন হেনস্থা করে। একজন সৈন্য তাকে 'আমার সাথে এসো' বলে অন্য কক্ষে নিয়ে যেতে চাইলে তিনি অস্বীকৃতি জানান। সঙ্গে সঙ্গে তার মাথায় ও মুখে একের পর এক তীব্র চড় মারা হতে থাকে। ডান পাশে থাকা আরেক সৈন্য তার পাঁজরে সজোরে হাঁটুর আঘাত (Knee Strike) করে এবং জোর করে মুখ দেখানোর জন্য চুল টেনে ধরে। কনটেইনারের দরজার কাছে মেঝেতে রক্তের দাগ দেখার পর তিনি চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্ধকার অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তিএই অবর্ণনীয় নির্যাতনের তীব্রতা বোঝাতে গিয়ে ফরাসি এই নারী অ্যাক্টিভিস্ট বলেন, "এই বন্দী দশা আমাকে ইউরোপের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। যখন মানুষকে মালবাহী ওয়াগনে আটকে রেখে না খাইয়ে, তৃষ্ণার্ত রেখে অমানুষিক নির্যাতন করা হতো।"তিনি জানান, অনেক পুরুষ অ্যাক্টিভিস্টের পাঁজর ভেঙে ফেলা হয়েছে। বিশেষ করে যেসব সমাজকর্মীদের গায়ের রঙ শ্বেতাঙ্গ নয় (অশ্বেতাঙ্গ), তাদের ওপর ইসরায়েলি সৈন্যদের হিংস্রতা ছিল বহুগুণ বেশি।তুরস্কের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ফ্রান্স সরকারের উদাসীনতাইসরায়েলে বন্দিদশা থেকে মুক্তির পর তাদের ফিরিয়ে নিতে আসা তুরস্কের বিমানের কথা স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন হাজাল। তিনি বলেন, "আমি তুরস্ককে যতবারই ধন্যবাদ জানাই না কেন, তা কম হবে। রানওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা তুরস্কের ৩টি বিমান যখন দেখলাম, মনে হলো—ব্যাস, আমরা এবার বেঁচে গেলাম।" তুরস্কের বিমানবন্দরে নামার পর চিকিৎসক দলসহ বড় একটি ব্যবস্থাপনা তাদের স্বাগত ও সেবা দিলেও, নিজ দেশ ফ্রান্সে পৌঁছানোর পর তাদের কপালে জোটে চরম উদাসীনতা। ফ্রান্স সরকারের কোনো প্রতিনিধি তাদের খোঁজ নেয়নি, কেবল পুলিশ এসে পাসপোর্ট পরীক্ষা করে চলে যায়। সরকার তাদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।পরিশেষে মেরিয়েম হাজাল বলেন, "আমরা তো ফিরে এসেছি, কিন্তু ফিলিস্তিনি বন্দিরা প্রতিদিন ইসরায়েলের কারাগারে এর চেয়েও হাজার গুণ বেশি ভয়াবহ ও পৈশাচিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববাসীর উচিত আমাদের চেয়ে ফিলিস্তিনিদের সেই বুকফাটা আর্তনাদ ও যন্ত্রণার দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া।"মেরিয়েম হাজালের দেওয়া এই লোমহর্ষক বর্ণনা কেবল একজন ফরাসি নাগরিকের ওপর নির্যাতন নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তাকর্মীদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক বিপজ্জনক বার্তা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করা, যাতে আন্তর্জাতিক আইনের শাসন ও মানবাধিকারের কার্যকারিতা বজায় থাকে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ