প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬
লাভ জিহাদ ও গণধর্ষণের মিথ্যা মামলায় মুসলিম যুবকদের ফাঁসানোর ছক
ভারতের উত্তর প্রদেশের মিরাটে দুই মুসলিম যুবককে ‘লাভ জিহাদ’ ও গণধর্ষণের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ষড়যন্ত্রের অভিযোগে এক বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) সমর্থকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। অভিযুক্ত নকুল গুর্জর নামের ওই হিন্দুত্ববাদী নেতা এক তরুণীকে টাকা ও চাকরির টোপ দিয়ে এই ফাঁদ পেতেছিলেন। তবে পুলিশের নিখুঁত ও দীর্ঘ ৫ ঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদে অবশেষে এই পুরো সাজানো নাটক ও জালিয়াতির ঘটনাটি ফাঁস হয়ে যায়।ভারতের উত্তর প্রদেশে তথাকথিত ‘লাভ জিহাদ’ ও ধর্মীয় মেরুকরণকে পুঁজি করে নিরীহ মানুষকে ফাঁসানোর এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে মিরাটে। দুই মুসলিম যুবক—জিশান ও শাহভেজকে গণধর্ষণ এবং লাভ জিহাদের মতো গুরুতর অপরাধে জড়াতে গিয়ে নিজেই আইনি জালে জড়িয়ে পড়েছেন কট্টরপন্থী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সমর্থক নকুল গুর্জর।ঘটনার সূত্রপাত ও ফাঁদপুলিশি তদন্তে জানা যায়, গত ৩০ মে মিরাটের জাগৃতি বিহার এক্সটেনশন এলাকায় এই ঘটনাটি ঘটে। বুলন্দশহরের বাসিন্দা ভাবনা নামের এক তরুণীকে অর্থ ও চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে জিশান ও শাহভেজের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ তুলতে রাজি করান নকুল গুর্জর। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জিশান ও শাহভেজের সাথে গাড়িতে ভ্রমণ করছিলেন ভাবনা। ভ্রমণের সময় ভাবনা ক্রমাগত তার লাইভ লোকেশন নকুল গুর্জরের লোকদের কাছে পাঠাতে থাকেন। সেই লোকেশন ট্র্যাক করে গুর্জরের অনুসারীরা গাড়িটি থামায় এবং তাদের ওপর চড়াও হয়ে ‘লাভ জিহাদ’-এর সন্দেহ প্রকাশ করে হট্টগোল সৃষ্টি করে।পরবর্তীতে এই তিনজনকে মিরাট পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পুলিশ প্রথম দিকে ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখলেও টানা পাঁচ ঘণ্টার নিবিড় ও পুঙ্খানুপুঙ্খ জিজ্ঞাসাবাদের মুখে তরুণী ভাবনা ভেঙে পড়েন এবং সমস্ত সত্য স্বীকার করেন।১০ লাখ টাকা আদায়ের চেষ্টাভাবনা পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেন, নকুল গুর্জর তাকে প্রলোভন দেখিয়েছিলেন যে, জিশান ও শাহভেজকে গণধর্ষণের মামলায় ফাঁসাতে পারলে তাকে একটি স্থায়ী চাকরি ও বড় অঙ্কের টাকা দেওয়া হবে। একই সাথে এই মামলার ভয় দেখিয়ে ওই দুই মুসলিম যুবকের পরিবার থেকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের পরিকল্পনাও ছিল গুর্জরের।পুলিশ জানায়, জিশান মূলত একটি গৃহকর্মী সরবরাহকারী এজেন্সি বা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। নকুল গুর্জরের কথামতোই পরিকল্পনাটিকে বাস্তব রূপ দিতে কাজের খোঁজে জিশানের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন ভাবনা। সরল বিশ্বাসে জিশান তাকে জাগৃতি বিহার এক্সটেনশনে আসতে বলেন এবং সে সময় তার সাথে শাহভেজও উপস্থিত ছিলেন।পুলিশের তদন্ত ও চিকিৎসকের প্রতিবেদনমিরাট পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সুচিতা সিং সংবাদমাধ্যমকে জানান, "অভিযান বা উদ্ধারের সময় তরুণীকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। আমরা কালবিলম্ব না করে তাকে হাসপাতালে পাঠাই এবং মেডিকেল টেস্ট করাই। চিকিৎসকের রিপোর্টে ধর্ষণ বা কোনো ধরনের যৌন নির্যাতনের কোনো প্রমাণ মেলেনি। এছাড়া তরুণী নিজেকে প্রথমে ১৬ বছরের নাবালিকা দাবি করলেও, তার স্কুল সার্টিফিকেট ও নথিপত্র যাচাই করে দেখা গেছে তার প্রকৃত বয়স ১৯ বছর।"অভিযুক্তের অতীত অপরাধভুক্তভোগী শাহভেজ ও জিশানের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে মিরাট পুলিশ নকুল গুর্জরের বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও ষড়যন্ত্রের মামলা দায়ের করেছে। বর্তমানে সে পলাতক রয়েছে এবং পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে। পুলিশ আরও জানিয়েছে, অভিযুক্ত নকুল গুর্জরের অপরাধের রেকর্ড এটাই প্রথম নয়। এর আগেও প্রায় এক বছর আগে তার বিরুদ্ধে একটি গণধর্ষণের মামলা হয়েছিল, যে মামলায় সে বর্তমানে জামিনে রয়েছে।আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তাৎক্ষণিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের কারণে দুই নিরীহ যুবক এক ভয়াবহ সামাজিক ও আইনি বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছেন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।আইনি কাঠামো অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো, চাঁদাবাজি এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা গুরুতর অপরাধ। ভারতের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে, সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই অনেক সময় ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে 'লাভ জিহাদ' ও ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর অভিযোগকে হাতিয়ার করা হচ্ছে। এই ঘটনায় পুলিশের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের ফলে দুজন নিরপরাধ ব্যক্তি বড় ধরনের আইনি হয়রানি থেকে রক্ষা পেয়েছেন। তবে মূল অভিযুক্ত পলাতক থাকায় এবং তার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে স্থানীয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়টি এখন বড় চ্যালেঞ্জ।তদন্তে জানা গেছে, অভিযুক্ত নকুল গুর্জরের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের রেকর্ড এটিই প্রথম নয়। এর আগে প্রায় এক বছর আগে তার বিরুদ্ধে একটি গণধর্ষণের মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যে মামলায় তিনি বর্তমানে আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন। জামিনে থাকা অবস্থায় পুনরায় একই ধরনের সাজানো অপরাধের পরিকল্পনা করায় তার অপরাধমূলক প্রবণতা ও স্থানীয় আইনি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ