প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬
নামাজ পড়া ভুলিয়ে দেব: দিল্লিতে মুসলমানদের প্রকাশ্য হুমকি কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী নেতার
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে অত্যন্ত আপত্তিকর ও উস্কানিমূলক সাম্প্রদায়িক হুমকি দিয়েছেন উত্তরাখণ্ডের ‘কালী সেনা’র রাজ্য সভাপতি ভূপেশ জোশী। অতি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে তাকে মুসলমানদের "নমাজ পড়া ভুলিয়ে দেওয়ার" এবং প্রতি মঙ্গলবার দিল্লির মসজিদগুলোর ভেতরে ঢুকে ‘হনুমান চালিশা’ পাঠ করার প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি দিতে দেখা গেছে। এই ঘটনায় অঞ্চলটিতে তীব্র সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।ভারতের গাজিয়াবাদে ধারণকৃত এবং গত ৪ জুন প্রকাশিত একটি ভিডিওতে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন কালী সেনার উত্তরাখণ্ড রাজ্য সভাপতি ভূপেশ জোশীকে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অত্যন্ত নোংরা গালিগালাজ এবং উস্কানিমূলক বক্তব্য দিতে দেখা যায়। মূলত সূর্য চৌহান নামের এক হিন্দু কিশোরের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে এই উস্কানির সূত্রপাত। অভিযোগ রয়েছে, আসাদ নামের এক যুবক সূর্যকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেছিল। পরবর্তীতে আসাদ পুলিশি এনকাউন্টারে (বন্দুকযুদ্ধে) নিহত হয়।হুমকি ও আপত্তিকর বক্তব্যভাইরাল হওয়া ভিডিওতে ভূপেশ জোশী কট্টর ধর্মীয় স্লোগান দিয়ে বলেন, "জয় শ্রী রাম, বন্ধুরা, জয় শ্রী রাম। আমি দিল্লির মোল্লাদের বলতে চাই, তোমরা নমাজ পড়া ভুলে যাবে।" তিনি অত্যন্ত আপত্তিকর ও অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করে আরও বলেন, "তোমরা আমাদের হিন্দু ভাইকে ঈদের দিন জবাই করেছ। এখন হিন্দুরা আর কোনো ছাড় দেওয়ার মেজাজে নেই।"মসজিদে হনুমান চালিশা পাঠের ঘোষণাঅনেক হিন্দুর কাছে পবিত্র দিন হিসেবে বিবেচিত প্রতি মঙ্গলবার দিল্লির প্রতিটি মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে হনুমান চালিশা পাঠ করা হবে বলে জোশী কড়া হুঁশিয়ারি দেন। যদিও স্থানীয় প্রতিবেশীদের সূত্রে জানা গেছে, নিহত সূর্য মূলত আসাদের বোনকে উত্যক্ত করত এবং তাকে এর আগে সতর্কও করা হয়েছিল। তবে ঘটনার মূল সত্যতা যাচাই না করেই এই হত্যাকাণ্ডকে পুঁজি করে পুরো মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে এমন প্রকাশ্য ঘৃণা ও উস্কানি ছড়ানোর ঘটনা দেশটিতে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।ভারতের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশটির প্রত্যেক নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন ও প্রচার করার মৌলিক অধিকার রয়েছে। কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ে জোরপূর্বক অন্য ধর্মের আচার অনুষ্ঠান চাপিয়ে দেওয়ার হুমকি সরাসরি ভারতীয় দণ্ডবিধি (IPC) এবং নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী।মানবাধিকার কর্মীদের মতে, যেকোনো অপরাধের বিচার আইনি প্রক্রিয়ায় হওয়া উচিত। কিন্তু অপরাধকে কেন্দ্র করে একটি পুরো জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং ধর্মীয় উপাসনালয় অবরুদ্ধ করার হুমকি আইনশৃঙ্খলার চরম অবমাননা। প্রশাসন এ ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে তা বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রূপ নিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।ভারতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্থানীয় বা ব্যক্তিগত অপরাধকে কেন্দ্র করে কট্টরপন্থী সংগঠনগুলোর মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের চেষ্টা নতুন কিছু নয়। এর আগেও বিভিন্ন রাজ্যে উস্কানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টের অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং রাজ্যগুলোকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।একটি গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রে যেকোনো নাগরিকের ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখা জরুরি। সুরিয়া চৌহানের হত্যাকাণ্ড যেমন নিন্দনীয়, তেমনই তার জেরে পুরো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে হুমকি দেওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থী। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দিল্লির আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসনের নিরপেক্ষ ও কঠোর ভূমিকা কাম্য।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ