প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬
গুজরাটে মুসলিম যুবককে ‘খামেনির ভাগ্নে’ বলে কটূক্তি, লাভ জিহাদ অজুহাতে ঘর ছাড়ার হুমকি
ভারতের গুজরাট রাজ্যের আহমেদাবাদে উগ্র হিন্দুত্ববাদী বজরং দলের কর্মীদের দ্বারা এক মুসলিম অভিবাসী শ্রমিক চরম হেনস্তা ও উচ্ছেদ হুমকির শিকার হয়েছেন। উত্তর প্রদেশের ইটাওয়া থেকে আসা ওই যুবককে ‘আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ভাগ্নে’ বলে উপহাস করা হয় এবং তথাকথিত 'লাভ জিহাদ' ও 'ফ্রিজার' তত্ত্বের অবাস্তব অজুহাত দেখিয়ে অবিলম্বে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।ভারতের গুজরাটে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক নিপীড়নের আরও একটি ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। রাজ্যের রাজধানী আহমেদাবাদের প্রধানত হিন্দু অধ্যুষিত নারোদা এলাকায় এক সাধারণ মুসলিম অভিবাসী শ্রমিককে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে ঘর খালি করার নির্দেশ দিয়েছে উগ্র ডানপন্থী বজরং দলের ক্যাডাররা।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বজরং দলের কুখ্যাত কর্মী গণেশ ভাঞ্জারা এবং তার সহযোগীরা ওই মুসলিম যুবককে ঘিরে ধরে জেরা ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে। যুবকটি যখন জানান যে তিনি উত্তর প্রদেশের ইটাওয়া থেকে আসা একজন মুসলিম শ্রমিক, তখন ভাঞ্জারা তৎক্ষণাৎ তার পরিচয়পত্র (আইডি প্রুফ) দাবি করে।পরিচয়পত্র দেখার পর উপহাসের সুরে ভাঞ্জারা তার সহযোগীদের সামনে চিৎকার করে বলে— “এখানে আলী খামেনির (ইরানের সর্বোচ্চ নেতা) ভাগ্নে পাওয়া গেছে। এর কাছে আমাদের অনুরোধ, এখান থেকে ঘর খালি করে দাও এবং তুমি যেখান থেকে এসেছ সেখানে ফিরে যাও।”উগ্রপন্থী ভাঞ্জারা এখানেই ক্ষান্ত হয়নি, সে এলাকায় মুসলিম পুরুষদের বসবাসের কারণে হিন্দু নারীদের জীবন বিপন্ন হওয়ার অবাস্তব ও ইসলামোফোবিক দাবি তোলে। সে উস্কানিমূলকভাবে বলে— “আমাদের বোন ও মেয়েরা ঝুঁকিতে রয়েছে। কাল যদি আমাদের কোনো হিন্দু মেয়ে এদের ‘লাভ জিহাদ’-এর ফাঁদে ফেঁসে যায়, তবে আমাদের হিন্দু পরিবারগুলোর কী হবে? শেষ পর্যন্ত আমাদের মেয়েদের লাশ ফ্রিজারের (ফ্রিজ) ভেতর পাওয়া যাবে।”উল্লেখ্য, ‘লাভ জিহাদ’ হলো হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা প্রচারিত একটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, যার মাধ্যমে দাবি করা হয় যে মুসলিম যুবকরা পরিকল্পিতভাবে হিন্দু নারীদের ধর্মান্তরিত করার জন্য প্রেমের ফাঁদে ফেলে। এছাড়া ভাঞ্জারা ২০২২ সালের দিল্লির বহুল আলোচিত ‘আফতাব পুনাওয়ালা ও শ্রদ্ধা ওয়াকার’ হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে সাধারণ মুসলিমদের ঢালাওভাবে খুনি হিসেবে চিত্রায়িত করার অপচেষ্টা চালায়।বজরং দলের এই নেতা আরও অভিযোগ করে যে, ওই এলাকায় হিন্দু ভাড়াটিয়াদের তুলনায় মুসলিমদের কম টাকায় ঘর ভাড়া দেওয়া হচ্ছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। যুবকটিকে এলাকা ছাড়ার চূড়ান্ত হুমকি দিয়ে সে বলে— “নিজের এলাকায় যাও, সেখানেই সুখে থাকো। আর এখানে থাকলে শুধু আলী খামেনির গুণগান গাইতে হবে।” এই উস্কানিমূলক বক্তব্যের সময় তার পাশে থাকা অন্য হিন্দুত্ববাদী কর্মীরা উল্লাস প্রকাশ করে।মানবাধিকার কর্মীদের মতে, গুজরাটে ১৯৮৫, ১৯৯২ এবং বিশেষ করে ২০০২ সালের ভয়াবহ মুসলিম নিধনের দাঙ্গার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে এক ধরনের অলিখিত ‘ঘেটোইজেশন’ বা সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করা হয়েছে। ২০০২ সালে নরেন্দ্র মোদি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন যে দাঙ্গা হয়েছিল, তার ক্ষত এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি রাজ্যের মুসলিমরা। বর্তমানের এই ধরনের প্রকাশ্য উচ্ছেদ ও সামাজিক বয়কটের হুমকি মুসলিমদের আরও বেশি প্রান্তিক ও নিরাপত্তাহীন করে তুলছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ