প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুলাই ২০২৬
সিরিয়ার ঐতিহাসিক ওমরি মসজিদ এবার ‘ইসেস্কো’র বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায়, শুরু হচ্ছে সংস্কার কাজ
ইসলামি স্থাপত্যের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক নিদর্শন সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় দারা শহরের আল-ওমরি মসজিদকে নিজেদের বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে ‘ইসেস্কো’ (ইসলামি বিশ্ব শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা)। স্বৈরাচারী বাশার আল-আসাদ সরকারের নৃশংস হামলায় ধ্বংসপ্রাপ্ত এই প্রাচীন মসজিদটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এর ঐতিহাসিক ও সভ্যতার মর্যাদাকে পুনর্প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই মাহেন্দ্রক্ষণে সিরিয়ার প্রত্নতাত্ত্বিক কর্তৃপক্ষ মসজিদটির মূল অবকাঠামো রক্ষায় একটি পূর্ণাঙ্গ ও আন্তর্জাতিক মানের সংস্কার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।সিরিয়ার প্রত্নতাত্ত্বিক ও জাদুঘর অধিদপ্তর জানিয়েছে, ইসলামি বিশ্ব শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ICESCO) কর্তৃক দারা শহরের ঐতিহাসিক ‘ওমরি মসজিদ’কে ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা 'সানা' (SANA) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ফলে শাম (সিরিয়া) অঞ্চলের প্রারম্ভিক ইসলামি স্থাপত্যের অন্যতম প্রাচীন এই নিদর্শনের আইনি ও কারিগরি সুরক্ষা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর আরও যোগ করেছে, ইসেস্কোর এই সিদ্ধান্ত নথিপত্র সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার এবং প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এটি সিরিয়ার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষা ও পুনর্বাসনের জাতীয় প্রচেষ্টাকে বিশ্ব দরবারে জোরালো সমর্থন জোগাবে।দারা অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ নাসরুল্লাহ জানান, এই আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত মসজিদটির ১৩ শতাব্দী (১৩০০ বছর) প্রাচীন ঐতিহাসিক ও সভ্যতার ভিত্তিকে সুদৃঢ় করল। তিনি উল্লেখ করেন, সপ্তম শতাব্দীর প্রথমার্ধে মহান খলিফা হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর খেলাফতকালে এই মসজিদটির প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। তৎকালীন রোমান ও বাইজেন্টাইন প্রত্নতাত্ত্বিক সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের ওপর এটি নির্মিত হয়, যা এই অঞ্চলের প্রাচীন সভ্যতার পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের এক জীবন্ত সাক্ষী।মোহাম্মদ নাসরুল্লাহ আরও জানান, স্থানীয় জনমানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায় এবং প্রত্নতাত্ত্বিক কর্তৃপক্ষের অধীনে কালো ব্যাসাল্ট পাথরে নির্মিত এই মসজিদের একটি ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে যুদ্ধের ভয়াবহতায় মসজিদের মূল কাঠামো এবং এর ঐতিহাসিক চারকোনা মিনারের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশল মানদণ্ড মেনে সংস্কার করা হবে, যেন এর আদি ও আসল রূপ অক্ষুণ্ণ থাকে।বিপ্লবের সূতিকাগার ও আসাদ বাহিনীর বর্বরতাঐতিহাসিক ওমরি মসজিদটি কেবল ধর্মীয় প্রাচীন নিদর্শনই নয়, এটি সিরিয়ার মজলুম জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের এক অনন্য রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রতীক। ২০১১ সালে তৎকালীন স্বৈরাচারী আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনের ‘সূতিকাগার’ বা কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই ঐতিহাসিক মসজিদ।মজলুমের এই কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতে তৎকালীন বাশার আল-আসাদের বর্বর বাহিনী এই প্রাচীন মসজিদটিকে সরাসরি নিশানা বানায়। ২০১২ সালে মসজিদ এলাকা থেকে আসাদ বাহিনী পিছু হটার পরপরই তারা সেখানে ব্যাপক রকেট ও কামানের গোলাবর্ষণ করে। সেই নৃশংস হামলায় মসজিদটির ঐতিহ্যবাহী চতুষ্কোণ মিনারটি ভেঙে পড়ে এবং কালো ব্যাসাল্ট পাথরের বিশাল দেয়াল ও ছাদ ধূলিসাৎ হয়ে যায়। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নিপীড়নের পর, ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর সিরিয়ার মুক্তিকামী প্রতিরোধ যোদ্ধারা রাজধানী দামেস্কে প্রবেশ করে দীর্ঘ ২৪ বছরের বাশার আল-আসাদ এবং তার পিতা হাফেজ আসাদের মোট ৫৩ বছরের নৃশংস ও স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটায়।স্বৈরাচার বিদায়ের পর এবার বিশ্ব দরবারে স্বমহিমায় মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে সিরিয়ার এই মুসলিম ঐতিহ্য।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ