প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুলাই ২০২৬
আজ আমাদের অর্থের বৈভব বেড়েছে, কিন্তু হৃদয়টা বড় হয়নি: শৈশবের লজিং জীবনের স্মৃতিতে শায়খ আহমাদুল্লাহ
মাদরাসা জীবনের শৈশবের স্মৃতিচারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন বিশিষ্ট ইসলামি স্কলার ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে পড়াশোনাকালীন এক লজিং বাড়ির হতদরিদ্র পরিবারের ত্যাগের গল্প তুলে ধরে তিনি বর্তমান সমাজের আত্মকেন্দ্রিকতা ও সংকীর্ণ মানসিকতার সমালোচনা করেছেন। আজ মঙ্গলবার (৭ জুলাই) নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে তিনি এই স্মৃতিচারণ করেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে সবাইকে আত্মার ধনাঢ্যতা অর্জনের আহ্বান জানান।বর্তমান সময়ে চারপাশের বৈষয়িকতা, আত্মকেন্দ্রিকতা আর স্বার্থপরতার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া মানবতা ও পরার্থপরতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্মরণ করেছেন আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ। নিজের মাদরাসা জীবনের লজিং বাড়ির এক আবেগঘন ও মধুর স্মৃতি পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন তিনি।শায়খ আহমাদুল্লাহ জানান, তাঁর বয়স যখন মাত্র এগারো-বারো বছর, তখন তিনি নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানার দোয়ালিয়া গ্রামের একটি মাদরাসায় কিতাব বিভাগের প্রথম দিকের ক্লাসে ভর্তি হন। সে সময়ে গ্রামাঞ্চলে মাদরাসা ছাত্রদের বিভিন্ন বাড়িতে লজিং রাখার ব্যাপক চল ছিল। মাদরাসার বোর্ডিংয়ে খাওয়ার সামর্থ্য তাঁর বাবার থাকা সত্ত্বেও তুলনামূলক ভালো খাবারের আশায় তিনিও একটি বাড়িতে লজিং থাকা শুরু করেন।সেকালের লজিং প্রধানদের আতিথেয়তার প্রশংসা করে তিনি বলেন, "সেকালে যারা ছাত্রদেরকে লজিং রাখতেন, তারা যে খুব অবস্থাপন্ন ছিলেন, তা কিন্তু নয়। বরং বাবা-মার আদর ফেলে দূর থেকে পড়তে আসা একটা নাবালেগ ছেলের খাবারের দায়িত্ব নেয়াকে তারা নিজেদের कर्तव्य মনে করতেন। কাজটাকে তারা ভালোও বাসতেন।"স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহ একটি হতদরিদ্র পরিবারের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, যার কথা মনে হলে এখনো তাঁর মন খারাপ হয়। বাঁশের বেড়া আর একচালা টিনের নড়বড়ে ঘরে থাকা সেই পরিবারটির চরম অর্থকষ্টের বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, দিনের বেলা বেড়ার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে তাঁর মুখের ওপর পড়ত। ঘরে আসবাব বলতে ছিল কেবল একটি কাঠের চৌকি আর কাপড়ের রশি।সেই দরিদ্র পরিবারটির বড় হৃদয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "এই পরিবারটির কাছে যখন আমার খাবারের পালা আসত, পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে পান্তাভাতের থালা সাজিয়ে দিত। আর সাথে থাকত বাড়ির পোষা মুরগির ডিম ভাজি। হলুদ রঙের ডিম ভাজিটি সাদা পান্তার পটভূমিকায় প্লেট জুড়ে ফুলের মতো ফুটে থাকত। তখন না বুঝলেও এখন বুঝি, এই ডিম গরিব সেই পরিবারটির আয়ের অন্যতম উৎস ছিল।"আজকের সমাজের নৈতিক ও মানসিক অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরে এই ইসলামি ব্যক্তিত্ব ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আজ আমরা অর্থনৈতিকভাবে বহুগুণ ভালো অবস্থানে থাকলেও, অচেনা শিক্ষার্থী তো দূরের কথা, নিজের আত্মীয়-স্বজন বাড়িতে এলেই বিরক্ত বোধ করি এবং তারা বিদায় নিলে স্বস্তি পাই।হৃদয়ের এই সংকীর্ণতার কারণ ব্যাখ্যা করে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, "সময়ের পালাবদলে আজ আমাদের অর্থের বৈভব বেড়েছে, কিন্তু হৃদয়টা সেভাবে বড় হয়নি। ফলে এই সংকীর্ণ হৃদয়ে পরার্থপরতা ও ত্যাগের মতো মহৎ গুণের আর জায়গা হয় না। আর একারণে বিত্তবান হওয়া সত্ত্বেও আত্মিকভাবে আমরা সুখী হয়ে উঠতে পারছি না।"শেষাংশে তিনি ধন-সম্পদের মোহের চেয়ে আত্মার তৃপ্তিকে বড় করে দেখার তাগিদ দেন। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বাণী স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, "নবীজি (সা.) ঠিকই বলেছেন, ধন-সম্পদ বেশি থাকাই প্রকৃত ধনাঢ্যতা নয়; বরং প্রকৃত ধনাঢ্যতা হলো আত্মার ধনাঢ্যতা।" প্রকৃত সুখী মানুষ হওয়ার জন্য তিনি সবাইকে অল্পে তুষ্ট থাকার, আত্মাকে বড় করার এবং ভোগের চেয়ে ত্যাগের সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করার উদাত্ত আহ্বান জানান।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ