প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুলাই ২০২৬
কওমি মাদরাসার স্বকীয়তায় হস্তক্ষেপের আশঙ্কা: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জরুরি সভা বর্জন করল হাইআতুল উলয়া
কওমি মাদরাসা স্থাপনের সরকারি নীতিমালা প্রণয়ন এবং হাফেজিয়া মাদরাসার জন্য পৃথক কেন্দ্রীয় বোর্ড গঠনের সরকারি উদ্যোগকে ২০১৮ সালের আইনের সাথে সাংঘর্ষিক আখ্যা দিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে শীর্ষ কওমি বোর্ড ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি'আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’। একই সাথে ৯ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক আহূত একটি বিশেষ জরুরি সভায় অংশ নিতে অপারগতা প্রকাশ করে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি। কওমি ধারার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে সরকারের এই জাতীয় উদ্যোগ থেকে বিরত থাকার দাবি জানানো হয়েছে।কওমি মাদরাসার নিজস্ব স্বকীয়তা, নেসাবে তা'লীম (পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচি) এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় সরকারি হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কওমি মাদরাসা স্থাপনের নীতিমালা প্রণয়ন ও হাফেজিয়া মাদরাসার জন্য পৃথক কেন্দ্রীয় বোর্ড গঠনের সরকারি উদ্যোগকে ২০১৮ সালের আইনের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক বলে প্রত্যাখ্যান করেছে আল-হাইআতুল উলয়া।শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের উপসচিব জনাব মোঃ রাহাত মান্নান স্বাক্ষরিত এক নোটিশের মাধ্যমে জানা যায়, জেলা প্রশাসক সম্মেলন-২০২৬ এর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ০৯ জুলাই বিকাল ৩টায় কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব জনাব মোঃ দাউদ মিয়ার সভাপতিত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা আহ্বান করা হয়েছে। সভায় কওমি মাদরাসা স্থাপনের নীতিমালা প্রণয়ন, দেশের সকল হাফেজিয়া মাদরাসার জন্য একটি কেন্দ্রীয় বোর্ড গঠন এবং স্বল্প শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে কর্মমুখী শিক্ষার কার্যক্রম বাস্তবায়নের এজেন্ডা রাখা হয়েছে। উক্ত সভায় আল-হাইআতুল উলয়ার শীর্ষ নেতৃত্ব ও এর অধীনস্থ ৬ বোর্ডের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের অনুরোধ করা হয়।এরই পরিপ্রেক্ষিতে, আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি'আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ আজ ০৮ জুলাই কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব বরাবর একটি লিখিত পত্র (স্মারক নং: ৪৮.১.২৩) প্রেরণ করে উক্ত সভায় তাদের অপারগতার কথা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে। পত্রে বলা হয়, ০৭ জুলাই বিকেলে অত্যন্ত স্বল্প সময়ের নোটিশে এই সভা ডাকা হয়েছে, যা ঢাকার বাইরে অবস্থানরত হাইআতুল উলয়ার সদস্যগণের পক্ষে উপস্থিত হওয়া অসম্ভব। তাছাড়া, এ ধরনের নীতিগত সরকারি সভায় যোগদানের পূর্বে কওমি বোর্ডগুলোর কার্যনির্বাহী কমিটির নিজস্ব সভায় বিস্তারিত আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি।সরকারি উদ্যোগ নিয়ে হাইআতুল উলয়ার সুনির্দিষ্ট ও কঠোর অবস্থান১. কওমি মাদরাসা স্থাপনের নীতিমালা প্রণয়ন প্রসঙ্গে:
হাইআতুল উলয়া তাদের পত্রে স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেয় যে, "আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি'আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ আইন, ২০১৮" এর ধারা ২ (চ) অনুযায়ী কওমি মাদরাসার শিক্ষা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম এবং ভৌত অবকাঠামো নির্মাণসহ সার্বিক পরিচালনায় সব ধরনের সরকারি বা বহিরাগত প্রভাবমুক্ত থেকে স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আল-হাইআতুল উলয়ার অধীন ৬টি বোর্ডের প্রতিটির নিজস্ব সুসংহত নীতিমালা রয়েছে। ইতোমধ্যে 'মহিলা মাদরাসা বিষয়ক নীতিমালা' ও 'সমন্বিত বিধি' চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং ছাত্রদের মাদরাসা বিষয়ক সমন্বিত বিধিমালা প্রণয়নের কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। এমতাবস্থায় সরকার কর্তৃক নতুন কোনো নীতিমালা প্রণয়ন করার চেষ্টা চলমান স্বকীয়তার ওপর স্পষ্ট হস্তক্ষেপ, যা কোনোভাবেই আইনসংগত নয়।২. হাফেজিয়া মাদরাসার জন্য পৃথক বোর্ড গঠন প্রসঙ্গে:
দেশের প্রায় সকল হাফেজিয়া মাদরাসা ইতোমধ্যে ২০১৮ সালের আইনের ৪ ধারা মোতাবেক আল-হাইআতুল উলয়ার অধীনস্থ ৬টি বোর্ডের যেকোনো একটির সাথে অধিভুক্ত রয়েছে। ফলে হাফেজিয়া মাদরাসার জন্য নতুন করে পৃথক কোনো কেন্দ্রীয় বোর্ড গঠনের চিন্তা সম্পূর্ণ অবান্তর, অগ্রহণযোগ্য এবং বিদ্যমান আইনের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান মুহিউস সুন্নাহ আল্লামা মাহমুদুল হাসানের নির্দেশক্রমে এবং কো-চেয়ারম্যান আল্লামা শেখ সাজিদুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আজকের জরুরি বৈঠকে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কওমি মাদরাসার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং ওলামায়ে কেরামের দীর্ঘদিনের ত্যাগ-তিতিক্ষার ফসল কওমি শিক্ষাধারাকে সুরক্ষিত রাখতে এই জাতীয় সকল বিতর্কিত উদ্যোগ থেকে বিরত থাকার জন্য সরকারের প্রতি বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।সংস্থাটির অফিস ব্যবস্থাপক মু. অছিউর রহমান স্বাক্ষরিত এই পত্রের অনুলিপি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এবং মাননীয় ধর্মমন্ত্রীর মতামত ও কওমি ধারার দৃঢ় অবস্থান অবহিত করার জন্য তাঁদের সংশ্লিষ্ট মুখ্য সচিব ও একান্ত সচিবদের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ