প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুলাই ২০২৬
১৫টি নথি জমা দিয়েও ভারতীয় নাগরিকত্ব হারালেন আসামের মুসলিম দিনমজুর, গুয়াহাটি হাইকোর্টে ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে সমস্ত বৈধ নথিপত্র থাকার পরেও আরও এক মুসলিম ব্যক্তিকে 'বিদেশী' বা অবৈধ অভিবাসী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ২ জুলাই আসামের গুয়াহাটি হাইকোর্ট দিনমজুর আমিনুল হকের দায়ের করা একটি আপিল আবেদন খারিজ করে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের পূর্ববর্তী রায় বহাল রাখেন। আমিনুল হক নিজের সপক্ষে ১৯৫১ সালের এনআরসি (NRC) রেকর্ড, জমির দলিল এবং ভোটার তালিকাসহ ১৫টি অকাট্য সরকারি তথ্যপ্রমাণ পেশ করলেও আদালত তা অপর্যাপ্ত বলে রায় দেয়।আসামের সংখ্যালঘু মুসলিমদের রাষ্ট্রহীন করার রাষ্ট্রীয় ও বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়া যেন থামছেই না। এবার সমস্ত বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও গুয়াহাটি হাইকোর্টের রায়ে নিজের মাতৃভূমিতেই 'বিদেশী' হয়ে গেলেন আমিনুল হক নামের এক হতদরিদ্র মুসলিম দিনমজুর। বিচারপতি কল্যাণ রাই সুরানা এবং বিচারপতি শামীমা জাহানের সমন্বয়ে গঠিত একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ আমিনুল হকের রিট পিটিশনটি খারিজ করে দেন।বানভাসি মানুষের বানানের ভুলকে নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার হাতিয়ার করার অভিযোগ মানবাধিকার সংগঠনগুলোরআদালত তার রায়ে উল্লেখ করে, ১৯৪৬ সালের ফরেনার্স অ্যাক্টের ৯ ধারা অনুযায়ী, কেউ বিদেশী কিনা তা প্রমাণ করার সম্পূর্ণ দায়ভার অভিযুক্ত ব্যক্তির নিজের। আদালত মনে করে, আমিনুল হক ১৫টি নথি প্রদর্শন করলেও তিনি নিজেকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে আইনিভাবে ব্যর্থ হয়েছেন।১৯৫১ সালের এনআরসি ও নদীভাঙনের ট্র্যাজেডিভুক্তভোগী আমিনুল হক ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেছিলেন। তিনি আদালতে জানান যে, তিনি জন্মসূত্রে একজন ভারতীয় নাগরিক। প্রমাণ হিসেবে তিনি ১৯৫১ সালের জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (NRC), বিভিন্ন বছরের ভোটার তালিকা, ১৯৭৩ সালের একটি জমির দলিল, স্কুল সার্টিফিকেট, প্যান (PAN) কার্ড এবং ভোটার আইডি কার্ড জমা দেন।আমিনুল হক আদালতে জানান, আসামের গোয়ালপাড়া জেলায় ১৯৫১ সালের মূল এনআরসিতে তার বাবা, দাদা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। ব্রহ্মপুত্র নদের ভয়াবহ নদীভাঙনের কারণে তাদের পরিবারকে বারবার ভিটেমাটি হারিয়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে স্থানান্তরিত হতে হয়েছিল। কিন্তু স্থান পরিবর্তন করলেও প্রতিটি এলাকার ভোটার তালিকায় তাদের নাম ধারাবাহিকভাবে চলে আসছিল।বানানের সামান্য ভুলই যখন 'অপরাধ'ট্রাইব্যুনাল ও হাইকোর্ট আমিনুল হকের নাগরিকত্ব খারিজ করার পেছনে প্রধান অজুহাত হিসেবে দেখিয়েছে নথিপত্রগুলোতে নামের বানানের সামান্য অমিল এবং বয়সের তারতম্য। আমিনুলের আইনজীবী যুক্তি দিয়েছিলেন যে, গ্রামীণ আসামে অনগ্রসরতার কারণে সরকারি নথিতে ক্লারিক্যাল বা টাইপিংয়ের ভুলের কারণে নামের বানানে সামান্য এদিক-ওদিক হওয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একাধিক নজির রয়েছে যে, কেবল বানানের ভুলের জন্য কারও নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া যায় না। কিন্তু হাইকোর্ট সেই যুক্তি আমলে নেয়নি।আদালত উল্টো ট্রাইব্যুনালের এই দাবি মেনে নেয় যে, নদীভাঙনের কারণে পরিবারটি তিনটি ভিন্ন গ্রামে বসবাস করায় তাদের বংশলতিকা বা পারিবারিক ধারাবাহিকতা নাকি স্পষ্ট নয়!প্রশ্নবিদ্ধ ট্রাইব্যুনাল ব্যবস্থা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনআসামের এই ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল ব্যবস্থাটি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং আইন বিশেষজ্ঞদের দ্বারা তীব্রভাবে সমালোচিত হয়ে আসছে। ২০২৫ সালে 'ন্যাশনাল ল স্কুল অফ ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটি' এবং লন্ডনের 'কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি'-র একটি যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আসামের এই ট্রাইব্যুনালগুলো কোনো রকম আইনি সুরক্ষাকবচ ছাড়াই ঢালাওভাবে মুসলিমদের মৌখিক ও দালিলিক প্রমাণাদি খারিজ করে দিচ্ছে। প্রতিবেদনটিতে এই ব্যবস্থাকে "একটি আইনগতভাবে টেকসইহীন শাসনব্যবস্থা" হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, যা সাংবিধানিক গণতন্ত্র এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মৌলিক নীতিগুলোকে লঙ্ঘন করছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে এই ট্রাইব্যুনালগুলোকে হাতিয়ার করা হচ্ছে বলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ