প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুলাই ২০২৬
যুদ্ধের আগুনে মুসলিম স্থাপত্যের সুরক্ষা: যেভাবে বাঁশের খাঁচায় লুকিয়ে ফেলা হয়েছিল তাজমহল
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন বিশ্বজুড়ে বোমারু বিমানের তাণ্ডব চলছিল, তখন ভারতের আগ্রায় অবস্থিত মুসলিম স্থাপত্যের অনন্য কীর্তি ও বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন 'তাজমহল'-এর নিরাপত্তা নিয়ে বড় উদ্বেগ দেখা দেয়। রাতের আঁধারে জার্মান ও জাপানি বোমারু বিমান যেন এই শ্বেতশুভ্র স্থাপনাকে চিহ্নিত করতে না পারে, সেজন্য ব্রিটিশ-ভারত সরকার পুরো তাজমহলকে বাঁশের তৈরি বিশাল এক ছদ্মবেশী খাঁচায় ঢেকে দিয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধেও একইভাবে এই ঐতিহাসিক মুসলিম স্মৃতিস্তম্ভকে রক্ষা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।পৃথিবীর ইতিহাস যুগে যুগে অসংখ্য ছোট-বড় যুদ্ধের সাক্ষী হয়েছে। তবে বিংশ শতাব্দীর দুই বিশ্বযুদ্ধ কেবল নির্দিষ্ট কিছু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা পুরো বিশ্বকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। আধুনিক সামরিক প্রযুক্তির বিকাশের ফলে তৎকালীন যুদ্ধগুলোর ধ্বংসক্ষমতা এত বেশি ছিল যে, নিমিষেই একেকটি সমৃদ্ধ শহর ধূলিসাৎ হয়ে যেত। এই ভয়াবহতার মাঝেও আক্রান্ত দেশগুলোর সমৃদ্ধ স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই ছিল যুদ্ধের অন্যতম এক উপেক্ষিত অধ্যায়।যুদ্ধকালীন সময়ে শত্রুপক্ষের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য থাকে প্রতিপক্ষের জাতীয় প্রতীক বা ঐতিহাসিক আইকনগুলোকে ধ্বংস করে মানসিকভাবে তাদের পঙ্গু করে দেওয়া। ভারতের উত্তরপ্রদেশের আগ্রায় অবস্থিত যমুনা নদীর তীরের তাজমহলটি তার অতিপ্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা এবং রাজকীয় মহিমার কারণে বহু কিলোমিটার দূর থেকেও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল। ফলে, এটি শত্রুপক্ষের বোমারু বিমানের জন্য একটি সহজ ও নিশ্চিত লক্ষ্যবস্তু (Obvious target) হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই কারণে তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারতের এই অমূল্য মুসলিম স্থাপত্যকে রক্ষা করা কেবল স্থানীয় মুসলিম বা ভারতীয়দের জন্যই নয়, বরং বিশ্ব ঐতিহ্যের সুরক্ষার্থেও এক বিশাল উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বযুদ্ধ যতই ভয়াবহ হোক না কেন, ভারতের বুকে মুসলিম শিল্পের এই রত্নকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।১৯৪২ সালের বাঁশের ছদ্মবেশ১৯৪২ সালে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তীব্রতা এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন ব্রিটিশ শাসকেরা তাজমহলকে জার্মান ও জাপানি বিমান হামলা থেকে রক্ষা করার জন্য একটি অভিনব পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তারা তাজমহলের মূল গম্বুজ এবং চারপাশের মিনারগুলোকে ঢেকে দেওয়ার জন্য বাঁশের বিশাল এক মাচান বা ইশকেলের (Bamboo Scaffolding) মাধ্যমে একটি ছদ্মাবরণ তৈরি করে।তৎকালীন সময়ে যুদ্ধবিমানের পাইলটদের কাছে আজকের যুগের মতো আধুনিক জিপিএস (GPS) বা নিখুঁত স্যাটেলাইট ইমেজের সুবিধা ছিল না। তারা মূলত খালি চোখে ভূপৃষ্ঠের ল্যান্ডমার্ক দেখে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করত। রাতের আকাশে চাঁদের আলোয় যেখানে তাজমহলের সাদা মার্বেল পাথর বাতিঘরের মতো জ্বলজ্বল করার কথা, সেখানে এই বাঁশের কাঠামোর কারণে আকাশ থেকে পাইলটদের কাছে এটিকে কেবল এক বিশাল বাঁশের স্তূপ বা জঙ্গল মনে হতো। সৌভাগ্যবশত, তৎকালীন আগ্রা অঞ্চলে কোনো বড় ধরনের বিমান হামলা হয়নি। তবে এই ছদ্মবেশ কতটা কার্যকর হতো, তা হয়তো পুরোপুরি জানার সুযোগ হয়নি।কড়া সামরিক গোপনীয়তার কারণে তৎকালীন সরকার বাঁশের খাঁচায় ঢাকা তাজমহলের চূড়ান্ত রূপের কোনো ছবি সাংবাদিকদের তুলতে বা প্রকাশ করতে দেয়নি। তবে ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, এই প্রকল্পটির মাধ্যমে তাজমহলের পুরো অবয়বকেই বদলে দেওয়া হয়েছিল।১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধতাজমহলকে এভাবে লুকিয়ে রাখার ঘটনা কেবল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেই সীমাবদ্ধ ছিল না। স্বাধীনতার পর, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘটিত ১৯৬৫ এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময়ও এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে একইভাবে সুরক্ষিত করার প্রয়োজন দেখা দেয়।বিশেষ করে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় তাজমহলকে একটি বিশাল গাঢ় সবুজ রঙের কাপড় বা নেট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল তাজমহলের চারপাশের সবুজ গাছপালা এবং বাগানের সাথে এর রঙকে মিলিয়ে দেওয়া, যাতে আকাশ থেকে এটিকে আলাদা কোনো স্থাপনা হিসেবে চেনা না যায়। তৎকালীন সময়ে এই কৌশলের ফলে তাজমহল আকাশ থেকে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।তাজমহল কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও মোগল ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। উগ্র রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে বর্তমান ভারতে মুসলিম ইতিহাসকে কালিমালিপ্ত বা মুছে ফেলার নানামুখী চেষ্টা চললেও, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়— এই তাজমহলকে বাঁচাতে একসময় রাষ্ট্র সর্বোচ্চ কৌশল অবলম্বন করেছিল।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ