প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুলাই ২০২৬
মাদ্রাসার কোমলমতি শিশুদের নিয়ে টিকটকে আপত্তিকর কনটেন্ট: নেপথ্যে বিকৃত মানসিকতার এক চক্র
পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও দ্বীনি শিক্ষার আড়ালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে কোমলমতি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের নিয়ে এক শ্রেণির বিকৃত মানসিকতার শিক্ষকের চরম আপত্তিকর কর্মকাণ্ডের প্রমাণ মিলেছে। সম্প্রতি ঝালকাঠির রাজাপুর ও লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার কতিপয় শিক্ষকের টিকটক অ্যাকাউন্টে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছাত্র-ছাত্রীদের ভিডিওতে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ, ইঙ্গিতপূর্ণ এবং নৈতিকতাবিরোধী ক্যাপশন দিয়ে প্রচার করার বিষয়টি উন্মোচিত হয়েছে। দ্য ডিসেন্ট-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দ্বীনি শিক্ষার লেবাস গায়ে জড়িয়ে এই চক্রটি শিশুদের আইনি ও ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ন করে সামাজিক মাধ্যমে সস্তা ভিউ ও বিকৃত আনন্দ লাভের হীন উদ্দেশ্যে এই কাজ করছে, যা বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহ ও সচেতন সমাজকে স্তম্ভিত করেছে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে কওমি ও হাফিজিয়া মাদ্রাসার অবুঝ শিশুদের ভিডিও ব্যবহার করে এক শ্রেণির তথাকথিত শিক্ষকের বিকৃত ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্ট তৈরির এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। এসব কনটেন্টে কোমলমতি শিশুদের ধর্মীয় আবেগ ও সরলতাকে পুঁজি করে অত্যন্ত নোংরা ভাষায় ক্যাপশন ও কমেন্ট আদান-প্রদান করা হচ্ছে, যা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ইসলামী মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘☆NAIM NUR☆’ নামের একটি টিকটক আইডির মালিক এইচ এম নাইম হাসান, যিনি ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলা সদরের ‘মারকাজুল কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসা’র একজন শিক্ষক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে তার মাদ্রাসার শিশু ছেলেদের পড়াশোনা, খেলাধুলা ও কান্নার ভিডিও ধারণ করে আসছিলেন। অন্তত ২২টি ভিডিওতে তিনি শিশুদের নিয়ে চরম ইঙ্গিতপূর্ণ ক্যাপশন ব্যবহার করেছেন। দুই ছাত্রের ছবি পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, ‘দুই পাশে দুই সুন্দরী’। এমনকি ১০ বছরের কম বয়সী বোরকা-নিকাব পরা ছাত্রীদের কোরআন তিলাওয়াতের ভিডিওতে তিনি লিখেছেন, ‘কোনটা পছন্দ হয়’, ‘চারটা বিয়া করা সুন্নত, এখানে তিনটা আছে’ কিংবা ‘কিউট আছে কিন্তু’। এসব ভিডিওর নিচে শত শত মানুষ কুরুচিপূর্ণ ও যৌন উসকানিমূলক মন্তব্য করেছে, যার জবাবে এই শিক্ষককে আরও উৎসাহিত হতে দেখা গেছে।এই বিষয়ে মারকাজুল কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসার পরিচালক হাফেজ আল মামুন খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “আমি তো এসব জানতাম না। এসব মারাত্মক অপরাধমূলক কাজ। শিশুদের ভিডিও এভাবে কেন প্রকাশ করা হবে? আমরা এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জরুরি পরিচালনা কমিটির বৈঠক ডেকেছি।” অভিযুক্ত শিক্ষক নাইম হাসান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, সমালোচনার মুখে তিনি ইতিমধ্যে ১২৭টি ভিডিও ডিলেট করেছেন। তবে শিশুদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও অভিভাবকদের অনুমতি ছাড়া এসব ভিডিও কেন আপলোড করা হলো, তার কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।এদিকে, অনুসন্ধানে আরও এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে ‘ঘ্যারত্যাড়া শাহজাদা’ নামের আরেকটি অ্যাকাউন্ট থেকে। সেখানে দেখা যায়, ৩-৪ বছরের এক অবুঝ শিশু তিলাওয়াত করার সময় কান্নারত অবস্থায় এক শিক্ষক লাঠি দিয়ে তার মুখে ও ঠোঁটে সুড়সুড়ি ও খোঁচা দিচ্ছেন। ভিডিওটির ক্যাপশনে লেখা ছিল, “পিচ্ছি পোলাপানকে কান্না করাতে ভালোই লাগে”। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই আইডিটি লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার ‘হায়দরগঞ্জ দারুল কোরআন ইসলামিক একাডেমি’র সাথে সংশ্লিষ্ট। প্রতিষ্ঠানের সভাপতি জনাব মোঃ মঞ্জুর আহমেদ বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও জড়িত ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশে অস্বীকৃতি জানান।এ ছাড়া টিকটকে “হবিগঞ্জের কিউট হুজুর”, “কওমির হুজুর”, “সেক্সি হুজুর” ও “খুলনা জেলার ছেলে আমি” নামের আরও ডজনখানেক আইডির সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখানে মাদ্রাসার ছাত্রদের জড়িয়ে সমকামিতা ও নানাবিধ যৌন বিকৃতির ইঙ্গিতবাহী গান ও ক্যাপশন জুড়ে দেওয়া হচ্ছে।ইসলামী চিন্তাবিদ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, শিশুদের সুরক্ষায় ইসলামে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। পবিত্র দ্বীন শিক্ষার পবিত্র আঙিনায় বসে যারা এই ধরনের পর্নোগ্রাফিক বা বিকৃত মানসিকতার চর্চা করছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি। সাইবার আইন ও শিশু সুরক্ষা আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে শিক্ষকদের ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক সমাজ।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ