প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুলাই ২০২৬
ঝিনাইদহে ইমাম পরিবর্তন নিয়ে বিএনপি-জামায়াত বিরোধ: মসজিদের ভেতরে ও বারান্দায় পৃথক জুমার জামাত
ঝিনাইদহের মহেশপুরে একটি কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমাম পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় সমর্থকদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। এর জেরে একই সময়ে মসজিদের ভেতরে ও বারান্দায় দুটি পৃথক জুমার জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পরবর্তীতে পুলিশ প্রশাসনের দীর্ঘ মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষ একটি শান্তিপূর্ণ সমঝোতায় পৌঁছায়।ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের সাড়াতলা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মসজিদের বর্তমান ইমামের দায়িত্ব পালন এবং তাকে পরিবর্তন করা বা রাখার বিষয়টি নিয়ে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্যদের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে মতবিরোধ চলছিল। উল্লেখ্য, স্থানীয় এই মসজিদ কমিটিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী—উভয় দলেরই সমর্থক ও কর্মী রয়েছেন।বিরোধের সূত্রপাত হয় যখন জামায়াত সমর্থকরা বর্তমান ইমামের নিয়মিত সময়ানুবর্তিতা ও নামাজ পরিচালনায় বিলম্বের অভিযোগ এনে তাকে পরিবর্তনের দাবি তোলেন। অন্যদিকে, বিএনপি সমর্থকরা বর্তমান ইমামকে তার পদে বহাল রাখার পক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেন। এই আদর্শিক ও সাংগঠনিক মতপার্থক্যের জের ধরে গত শনিবার থেকে মসজিদে একই সময়ে দুটি পৃথক জামাতে নামাজ আদায় শুরু হয়। গত শুক্রবার জুমার নামাজের দিনও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এক পক্ষ মসজিদের মূল ভবনের ভেতরে বর্তমান ইমামের পেছনে কাতারবন্দী হন, অন্যদিকে অপর পক্ষ মসজিদের বারান্দায় নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে ইমাম নিযুক্ত করে পৃথক জামাতের আয়োজন করেন। একই সময়ে একই মসজিদে দুটি জুমার জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ায় সাধারণ মুসল্লিদের মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং এলাকা জুড়ে আইনশৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কা দেখা দেয়।উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা বা সহিংসতা এড়াতে দ্রুত পদক্ষেপ নেয় মহেশপুর থানা পুলিশ। মহেশপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মেহেদী হাসান বৃহস্পতিবার রাতে উভয় পক্ষের দায়িত্বশীল প্রতিনিধি এবং বিতর্কিত বর্তমান ইমামকে থানায় ডেকে একটি জরুরি বৈঠকে বসেন। প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী চলা এই ম্যারাথন আলোচনার পর উভয় পক্ষ একটি যৌথ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সক্ষম হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এলাকায় শান্তি ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে নতুন পূর্ণাঙ্গ মসজিদ কমিটি গঠন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান ইমামই তার দায়িত্ব পালন করে যাবেন।জামায়াতে ইসলামীর সাড়াতলা ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, বর্তমান ইমামের নিয়মিত সময়মতো মসজিদে না আসা এবং নামাজ পরিচালনায় বিলম্ব করার কারণেই মূলত মুসল্লিদের একটি বড় অংশ তাকে পরিবর্তনের দাবি তুলেছিল। তবে পুলিশের সময়োপযোগী উদ্যোগে আলোচনার মাধ্যমে এই বিরোধের একটি সুন্দর সমাধান এসেছে।অন্যদিকে ফতেপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ফারুক হোসেন বিষয়টির ভিন্ন একটি দিক তুলে ধরে বলেন, আল্লাহর ঘর মসজিদে খুতবা প্রদানের সময় কেবল কোরআন ও হাদিসের বিশুদ্ধ আলোচনা হওয়া উচিত, সেখানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা বিতর্কিত বক্তব্য আসা কাম্য নয়। এই নীতিগত বিষয়টি নিয়েই মূলত ভুল বোঝাবুঝি ও মতবিরোধের সৃষ্টি হয়েছিল। তবে এখন উভয় পক্ষের মধ্যে লিখিত ও মৌখিক সমঝোতা সম্পন্ন হয়েছে।গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের ঠিক আগে মহেশপুর থানার ওসি মেহেদী হাসান নিজে সাড়াতলা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে উপস্থিত হন এবং সাধারণ মুসল্লিদের সাথে সরাসরি কথা বলেন। তিনি উপস্থিত সকলকে ইসলামের মূল বাণী—শান্তি, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ধৈর্য বজায় রাখার আহ্বান জানান এবং কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।গণমাধ্যমকে ওসি মেহেদী হাসান বলেন, "আল্লাহর ঘর মসজিদকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের সংঘাত বা রাজনৈতিক সহিংসতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা উভয় পক্ষের সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য সমাধান করতে পেরেছি। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অক্ষুণ্ণ রাখতে পুলিশি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।"
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ