প্রকাশের তারিখ : ২০ জুলাই ২০২৬
মাত্র ৮ হাজার রুপির জন্য মুসলিম র্যাপিডো চালককে পিটিয়ে হত্যা, দিল্লিতে শোকে স্তব্ধ পরিবার
ভারতের রাজধানী দিল্লির উত্তম নগরে মাত্র ৮ হাজার রুপি ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় মোহাম্মদ উযাইফ (২৩) নামের এক মুসলিম বাইক-রাইডার (র্যাপিডো চালক) তরুণকে ৮ ঘণ্টা ধরে নির্মমভাবে নির্যাতন চালিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে কট্টরপন্থী দুর্বৃত্তরা। গত ২৬ জুন সংঘটিত এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের পর নিহতের পরিবারে চলছে তীব্র মাতম। নিহতের পরিবার এবং স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর ক্রমাগত বাড়তে থাকা সামাজিক সহিংসতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিরই আরও একটি নির্মম বহিঃপ্রকাশ এই হত্যাকাণ্ড।"ওরা যদি আমার সন্তানকে গুলি করে মেরে ফেলতো, কিংবা কোনো দুর্ঘটনায় সে মারা যেতো, তাও ভালো হতো। অন্তত আমার বাচ্চাটা এতটা ছটফট করে, তীব্র যন্ত্রণায় কাতরে কাতরে মরতো না! আমি আমার সন্তানকে বাঁচাতে পারলাম না..."—বুক ফাটা আর্তনাদ করে কথাগুলো বলছিলেন দিল্লির উত্তম নগরের বাসিন্দা রাবিয়া। তার ২৩ বছর বয়সী তরুণ সন্তান মোহাম্মদ উযাইফকে দিল্লির তিন হিন্দু উগ্রবাদী ও ঋণদাতা সন্দীপ, ললিত এবং মোহিত মিলে পিটিয়ে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।পেশায় র্যাপিডো (বাইক শেয়ারিং অ্যাপ) চালক মোহাম্মদ উযাইফ ছিলেন তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার পিতা অনেক আগেই ইন্তেকাল করায় মা রাবিয়া অত্যন্ত কষ্ট করে তাকে একা হাতে বড় করেছিলেন। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, স্ত্রীর সন্তান প্রসবের চিকিৎসার খরচ মেটানোর জন্য স্থানীয় সন্দীপের কাছ থেকে ৫০ হাজার রুপি ঋণ নিয়েছিলেন উযাইফ। যার মধ্যে ৪২ হাজার রুপি তিনি ইতিমধ্যে পরিশোধও করে দেন। বাকি ছিল মাত্র ৮ হাজার রুপি।নিহত উযাইফের ভাই জাইদ গণমাধ্যমকে জানান, "মাত্র ৮ হাজার রুপি বাকি থাকায় ঘটনার প্রায় ১৫ দিন আগে ওই পাষণ্ডরা আমাদের বাড়িতে চড়াও হয়েছিল। উযাইফ তখন ঘরে ছিল না। যাওয়ার সময় তারা হুমকি দিয়ে যায়, যেখানেই উযাইফকে পাওয়া যাবে, তার হাড়গোড় গুঁড়ো করে দেওয়া হবে।"গত ২৬ জুন উযাইফকে তার বাড়ি থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে নাজাফগড়ের একটি নির্জন স্থানে তুলে নিয়ে যায় সন্দীপ, ললিত এবং মোহিত। সেখানে টানা প্রায় ৮ ঘণ্টা ধরে তার ওপর চলে অমানবিক ও পৈশাচিক নির্যাতন। লাঠি দিয়ে পেটানোর পাশাপাশি ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়, যার ফলে তার অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ফেটে যায়।নির্যাতন শেষে অবচেতন ও মুমূর্ষু অবস্থায় ঘাতকরা উযাইফকে তার বাড়ির সামনে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত উযাইফকে তার পরিবার দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।উযাইফের মা রাবিয়া বিলাপ করতে করতে বলেন, "আমি জীবনে কোনোদিন আমার সন্তানকে একটা চড় পর্যন্ত মারিনি। আর ওই নরপশুরা আমার বাচ্চাটাকে এতটা মারলো! সারা রাত যন্ত্রণায় সে নিশ্চয়ই ‘আম্মু, আম্মু’ বলে চিৎকার করেছে, আমাকে ডেকেছে। হায়, আমি আমার সন্তানকে বাঁচাতে পারলাম না!"উযাইফের এই নির্মম মৃত্যুর ঠিক পরপরই তার স্ত্রী একটি সুস্থ পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, নিজের প্রথম সন্তানকে একটিবারের জন্যও চোখে দেখে যেতে পারলেন না উযাইফ। স্বামীর এমন নৃশংস মৃত্যুতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তার সদ্য মা হওয়া স্ত্রী। পুরো পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তা ও তীব্র শোকের সাগরে ভাসছে।দিল্লির ছাওলা থানায় এই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। থানার স্টেশন হাউস অফিসার (এসএইচও) গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ২৮ জুন প্রবীণ নামের একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে মূল অভিযুক্ত সন্দীপসহ বাকিরা এখনও পলাতক রয়েছে। ভারতের মানবাধিকার কর্মী এবং মুসলিম অধিকার রক্ষা সংগঠনগুলো এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত সমস্ত আসামিদের গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ