প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুলাই ২০২৬
ভারতে ৩ মুসলিম কিশোরকে নির্মম নির্যাতন: ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধেই আগে মামলা পুলিশের
ভারতের মহারাষ্ট্রের লাতুর জেলায় তিন মুসলিম স্কুলছাত্রকে খুঁটির সাথে বেঁধে পৈশাচিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। গত ১০ জুলাই রেনাপুর তালুকের খারোলা গ্রামে কথিত চুরির অভিযোগে মারাঠা সম্প্রদায়ের কতিপয় ব্যক্তি ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী তিন কিশোরকে নির্মমভাবে প্রহার করে। ভয়াবহ এই নির্যাতনের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তবে বিচার নিশ্চিত করার বদলে ভারতের বিতর্কিত পুলিশ প্রশাসন প্রথমে নিগৃহীত মুসলিম শিশুদের বিরুদ্ধেই চুরির মামলা দায়ের করে, যা সংখ্যালঘু সুরক্ষায় ভারতের প্রশাসনিক পক্ষপাতদুষ্টতাকে পুনরায় উন্মোচিত করেছে।ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী মনোভাব এবং মুসলিমবিরোধী সহিংসতার আরেকটি নগ্ন চিত্র ফুটে উঠেছে মহারাষ্ট্রের লাতুর জেলায়। গত ১০ জুলাই দুপুরে খারোলা গ্রামে তিন মুসলিম কিশোরের ওপর চালোনো হয় পৈশাচিক নির্যাতন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ওই তিন ছাত্রের বিরুদ্ধে জমি থেকে বৈদ্যুতিক তার চুরির ভুয়া অভিযোগ তুলে তাদেরকে একটি খুঁটির সাথে বেঁধে ফেলে। এরপর বেল্ট, পাইপ এবং বৈদ্যুতিক তার দিয়ে তাদের নির্মমভাবে পেটাতে থাকে।ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং এক ভুক্তভোগীর পিতা জানান, খবর পেয়ে অভিভাবকরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং শিশুদের প্রাণরক্ষায় আকুতি জানান। কিন্তু আক্রমণকারীরা অভিভাবকদের কথা না শুনে উল্টো গালিগালাজ করতে থাকে। উপায় না দেখে আতংকিত অভিভাবকরা প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে রেনাপুর পুলিশ স্টেশনে গিয়ে সাহায্য চান। পুলিশ এসে শিশুদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। ভুক্তভোগীদের শরীরে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।পুলিশের বৈষম্যমূলক ও বিতর্কিত ভূমিকাঘটনাটি নিজ চোখে দেখার পরও পুলিশ প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। শিশুদের ওপর নির্যাতনের ভিডিও যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, ঠিক তখনই রাত ১০টার দিকে মূল অভিযুক্ত শচীন রাউতরাও থানায় গিয়ে শিশুগুলোর বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ আনে। পুলিশ কোনো প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই মূল অভিযুক্তের কথায় সাড়া দিয়ে আহত ও চিকিৎসাধীন তিন সংখ্যালঘু শিশুর বিরুদ্ধে এফআইআর (FIR) নথিভুক্ত করে।জনগণের তীব্র প্রতিক্রিয়া ও চাপের মুখে পড়ে ঘটনার বহু ঘণ্টা পর ভুক্তভোগী শিশুদের পিতার অভিযোগ গ্রহণ করে পুলিশ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা নিতে বাধ্য হয়। ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ (DSP) রাজেন্দ্র মায়ানে এই বিলম্বকে "তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া" বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।আসামিদের মুক্তি ও আইনি প্রহসনপুলিশ শচীন রাউতরাও ও নিতিন শিন্ডে নামের দুই মূল অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা করলেও তারা পলাতক রয়েছে বলে দাবি করছে। অপরদিকে গ্রেফতারকৃত অন্য ৬ অভিযুক্ত—সন্তোষ রাউতরাও, বাবলি কালে, দত্ত যাদব, বালু সূর্যবংশী, গণেশ ভোপি এবং দশরথ ভোপিকে আদালতে তোলা হলে মাত্র দুই দিনের মাথায় তারা জামিনে মুক্তি পায়। বিচারব্যবস্থার এই নমনীয়তা নিয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীদের পরিবার।সাম্প্রদায়িক কোণ ঢাকা দেওয়ার চেষ্টাপ্রায় ১,৫০০ পরিবারের খারোলা গ্রামে ৩০০টিরও বেশি মুসলিম পরিবার বাস করে, যাদের অধিকাংশই ভূমিহীন এবং মারাঠা জমিদারদের জমিতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে। স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে এটি কোনো সাম্প্রদায়িক ঘটনা নয়। কিন্তু নির্যাতিত শিশুদের অভিভাবকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, আক্রমণের সময় অভিযুক্তরা তাদের জাতি ও ধর্ম তুলে কটু মন্তব্য করেছে। এমনকি মামলা চালানোর সময় নিজেদের ‘মুসলিম পরিচয়’ উল্লেখ না করার জন্যও পুলিশ তাদের চাপ দেয় বলে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে।মহারাষ্ট্র অ্যাক্টিভিস্ট ফোরামের আহ্বায়ক জুনাইদ আত্তার পুলিশের ভূমিকাকে তীব্র সমালোচনা করে বলেন, "এই ছেলেরা যদি অভিযুক্তদের নিজের সম্প্রদায়ের হতো, তবে কি তারা এভাবে হাত তোলার সাহস পেত?" বর্তমানে স্থানীয় মানবাধিকার কর্মী ও মুসলিম সংগঠনগুলো নিগৃহীত পরিবারগুলোকে আইনি সহায়তা প্রদান করছে। আন্তর্জাতিক মহল ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো ভারতের এই ক্রমবর্ধমান সংখ্যালঘু নিপীড়ন এবং প্রশাসনিক স্বজনপ্রীতির তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ