প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুলাই ২০২৬
বারাণসীর ১,০০০ বছরের প্রাচীন গঞ্জ শহীদান মসজিদকে রেলওয়ের নোটিশ, আপত্তির মুখে প্রত্যাহার
ভারতের উত্তর প্রদেশের বারাণসীতে কাশি রেলওয়ে স্টেশনের কাছে অবস্থিত প্রায় এক হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহাসিক গঞ্জ শহীদান মসজিদের বিরুদ্ধে জমি দখলের নোটিশ জারি করেছিল ভারতীয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। তবে মসজিদ পরিচালনা কমিটি সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের নিবন্ধন ও ব্রিটিশ আমলের (১৮৮৩-৮৪) রাজস্ব দলিল পেশ করে শক্ত আইনি অবস্থান গ্রহণ করায় রেলওয়ে তাদের বিতর্কিত নোটিশ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক আবহে উত্তর প্রদেশে একের পর এক মুসলিম স্থাপনা লক্ষ্য করার মধ্যে এই বিজয় স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে সাময়িক স্বস্তি এনে দিয়েছে।উত্তর প্রদেশের ঐতিহ্যবাহী বারাণসী শহরে অবস্থিত কাশী রেলওয়ে স্টেশনের পার্শ্ববর্তী গঞ্জ শহীদান মসজিদের জমি নিয়ে সম্প্রতি নতুন করে ষড়যন্ত্র ও প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা দেয়। ভারতীয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, প্রাচীন এই মসজিদের একটি অংশ রেলের মালিকানাধীন জমিতে পড়েছে। তবে মসজিদ কমিটির স্পষ্ট আইনি জবাব ও ঐতিহাসিক নথির মুখে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে প্রশাসন।মসজিদ কমিটি সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ জুন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে গঞ্জ শহীদান মসজিদ কমিটিকে একটি নোটিশ দেওয়া হয়। ওই নোটিশে ভূমির মালিকানা সংক্রান্ত বৈধ কাগজপত্র পেশ করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক দলিল দেখাতে না পারলে জমি পুনরুদ্ধারে কথিত ‘অবৈধ স্থাপনা’ উচ্ছেদের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।রেলওয়ের দাবি খণ্ডন ও ঐতিহাসিক প্রমাণরেলওয়ে কর্তৃপক্ষের এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বাস্তবতাবহির্ভূত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে মসজিদ কমিটি। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য—গঞ্জ শহীদান মসজিদ কোনো সাম্প্রতিক নির্মাণ নয়, বরং এটি প্রায় ১,০০০ বছরের পুরোনো একটি ঐতিহ্যবাহী উপাসনালয়। ভারতে রেলওয়ে ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বহু শতক আগেই এই পবিত্র মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল।মসজিদ পরিচালনা কমিটির প্রতিনিধিরা জানান, আনুমানিক ১০৩৪ খ্রিস্টাব্দে গঞ্জ শহীদান মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি উত্তর প্রদেশ সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের অধীনে নিবন্ধিত একটি আইনসম্মত ওয়াকফ সম্পত্তি। শুধু তা-ই নয়, ১৮৮৩–৮৪ সালের সরকারি ভূমি রাজস্ব রেকর্ডেও এই ঐতিহাসিক মসজিদের নাম ও অবস্থান স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। ফলে ১৮৮৩ সালের রেকর্ডে থাকা হাজার বছরের পুরোনো স্থাপনা কীভাবে রেলওয়ের জমি দখল করতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারা।উগ্র হিন্দুত্ববাদী আবহ ও স্থানীয় মুসলিমদের শঙ্কাসাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর প্রদেশ সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় তথাকথিত 'অবৈধ দখল' সরানোর নামে বিভিন্ন স্থানে ঐতিহাসিক মসজিদ, মাদ্রাসা ও মুসলিমদের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করার ঘটনা ঘটেছে। এই প্রেক্ষাপটে রেলওয়ের নোটিশটি প্রকাশিত হওয়ায় বারাণসীর মুসলিম অধিবাসীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, ঐতিহ্যবাহী মুসলিম স্থাপনাগুলোকে অস্থিতিশীল করা এবং আইনি জটিলতায় ফেলার অপচেষ্টার অংশ হিসেবেই এই নোটিশ জারি করা হয়েছিল। তারা প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ আচরণ এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন সুরক্ষার আহ্বান জানান।আইনি লড়াই ও নোটিশ প্রত্যাহারপরিস্থিতি মোকাবিলায় মসজিদ পরিচালনাকারী সংস্থা 'আঞ্জুমান ইন্তেজামিয়া মসজিদ' দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তারা বারাণসীর জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে সাক্ষাৎ করে যাবতীয় আইনি নথিপত্র ও ১৮৮৩ সালের রাজস্ব রেকর্ড উপস্থাপন করে। একই সাথে দাবি না মানলে এলাহাবাদ হাইকোর্টে রিট আবেদন করার প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়।আইনি বাধ্যবাধকতা ও উপস্থাপিত ঐতিহাসিক দলিলের তোপে ২৩ জুনের দিকে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নোটিশটি প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে আপাতত মসজিদটি রক্ষা পেয়েছে এবং ভারতীয় রেলওয়ে সেখান থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ