প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬
মাদকের অন্ধকার থেকে মসজিদের আলোয়: ইস্তাম্বুলে আত্মশুদ্ধি ও সেবার নতুন নজির
তুরস্কের ইস্তাম্বুলে মাদকাসক্তি পুনর্বাসন সংস্থা 'বেদের' (BAYDER)-এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের মাদকের অন্ধকার ছেড়ে আলোর পথে ফিরে এসেছেন একদল তরুণ। ইস্তাম্বুলের মসজিদগুলো স্বেচ্ছাশ্রমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা এবং সেখানে ইবাদতে মনোনিবেশ করার মাধ্যমে তারা কেবল নিজেদেরই শুধরে নিচ্ছেন না, বরং সমাজে এক অনন্য মানবিক ও ইসলামি সেবার দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। দীর্ঘদিনের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে তারা এখন ঈমান, পরিবার এবং সুস্থ জীবনের ছন্দে ফিরে এসেছেন।বছরের পর বছর ধরে যারা মাদকের ভয়াল থাবায় জীবনকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিলেন, তারা আজ আল্লাহর ঘরে সেবায় আত্মনিয়োগ করেছেন। তুর্কি সামাজিক পুনর্বাসন সংস্থা 'লাইফ উইথ এডিকশন অ্যাসোসিয়েশন' (BAYDER)-এ চিকিৎসা নিতে আসা তরুণরা আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও সামাজিক সেবামূলক কাজের মাধ্যমে সমাজের মূলধারায় ফিরছেন।আনাদোলু এজেন্সির সাথে আলাপকালে এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় থাকা দুই তরুণ—মুসলিম ইয়াসার ও ইয়াসিন দোয়ান—তাদের অন্ধকার অতীত এবং ইসলামি জীবনাচারের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর আবেগঘন গল্প শুনিয়েছেন।অন্ধকার থেকে মসজিদের আঙিনায়তুরস্কের শানলিউর্ফা অঞ্চলের সন্তান ৩২ বছর বয়সী মুসলিম ইয়াসার। দুই সন্তানের জনক ইয়াসার টানা ১৫ বছরেরও বেশি সময় বিভিন্ন ধরনের মাদকাসক্তিতে ডুবে ছিলেন। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা ২০০৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সামরিক বাহিনীতে কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে কাজ করলেও মাদকের ছোবল থেকে রক্ষা পাননি। মাদক তার পারিবারিক জীবনকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। একাধিক হাসপাতালে ওষুধভিত্তিক চিকিৎসা নিলেও কোনো সুফল মেলেনি। অবশেষে মাসখানেক আগে তিনি 'বেদের'-এর ওষুধবিহীন আধ্যাত্মিক ও মানসিক পুনর্বাসন কর্মসূচিতে যোগ দেন।ইয়াসার বলেন, "এই দরজায় পা রাখার পর প্রথম যে জিনিসটি আমি খুঁজে পেয়েছি, তা হলো আধ্যাত্মিকতা। আমরা সালাত আদায় শুরু করি, পবিত্র কুরআন শেখা শুরু করি। এখন আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছি এবং নিয়মিত কুরআন তিলওয়াত করছি।"তিনি আরও জানান, তারা কেবল নিজেদের চিকিৎসা নিচ্ছেন না, বরং ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক 'মাকতুল মোস্তফা পাশা' মসজিদে স্বেচ্ছাশ্রমে কার্পেট ধোয়া, ভেতরের অংশ পরিষ্কারসহ রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছেন।একসময়ের বেদনাদায়ক স্মৃতি রোমান্থন করে ইয়াসার বলেন, "অতীতে আমি মসজিদে যেতাম কেবল টয়লেট ব্যবহার করে মাদক গ্রহণ করার জন্য। আলহামদুলিল্লাহ! সম্প্রতি এক জুমার দিনে বাস থেকে নেমেই আমি সোজা সেই মসজিদে যাই, যেখানে বছরের পর বছর মাদক সেবন করেছি। সেখানে ওজু করে জীবনে প্রথমবারের মতো সেই মসজিদের ভেতর জুমার নামাজ আদায় করি। এটি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।"খারাপ সঙ্গ বর্জন ও আত্মশুদ্ধিআদানা অঞ্চল থেকে আসা ২৬ বছর বয়সী তরুণ ইয়াসিন দোয়ান জানান, খারাপ বন্ধুদের সংশ্রবে এসে বিগত ৫ বছর ধরে তিনি মাদকাসক্ত ছিলেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, মাদকের প্রভাবে উন্মাদ হয়ে ঘরে ফিরলে তার বাবা তাকে ছুড়ি নিয়ে তাড়া করতে বাধ্য হন। এটিই ছিল তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ঘটনা।'বেদের'-এ আসার পর দোয়ান উপলব্ধি করেন যে মাদকাসক্তি কেবল ইচ্ছাশক্তির অভাব নয়, এটি একটি ব্যাধি—যার আত্মিক ও মানসিক নিরাময় প্রয়োজন। পুনর্বাসন কেন্দ্রে তিনি ও তার সহকর্মীরা মসজিদে নামাজ আদায়ের পাশাপাশি স্বেচ্ছায় কার্পেট ধোয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা করা এবং মাঝে মাঝে মুয়াজ্জিন হিসেবে আজান দেওয়ার দায়িত্বও পালন করছেন।দোয়ান বলেন, "মসজিদে সেবা করা আমার মনে গভীর প্রশান্তি আনে। মাদক ছেড়ে দেওয়ার পর এখন আমি স্পষ্ট কথা বলতে পারি, চিন্তা করতে পারি এবং পরিবার আমাকে আবার ভালোবেসে আপন করে নিয়েছে। আমি নিজেকে কথা দিয়েছি, জীবনের আর একটি দিনও নষ্ট করব না।"তরুণদের প্রতি আহ্বানপুনর্বাসিত এই তরুণেরা বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে মুসলিম তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা সিগারেট, মদ ও জুয়ার মতো প্রাথমিক নেশাগুলো এড়িয়ে চলেন। দোয়ান সতর্ক করে বলেন, "মানুষ যখন সবকিছু হারিয়ে ফেলে, তখন বুঝতে পারে। কিন্তু হারানোর আগেই যদি মানুষ আল্লাহর পথে ফিরে আসে এবং সাহায্য নেয়, তবে জীবন রক্ষা পায়।"
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ