প্রকাশের তারিখ : ১৩ আগস্ট ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে মসজিদের মাইক সরানোর ব্যাখা চাইলেন কলকাতা হাইকোর্ট
ভারতে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন মসজিদে পুলিশ কর্তৃক জোরপূর্বক লাউডস্পিকার বা মাইক খুলতে দেওয়ার মৌখিক নির্দেশের বিরুদ্ধে দায়ের করা এক জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কলকাতা হাইকোর্ট। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি অতরূপ বন্দোপাধ্যায়ের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে জানতে চান, সত্যিই রাজ্য প্রশাসন এমন কোনো নির্দেশ দিয়েছে কি না। জনস্বার্থ আবেদনটিতে অভিযোগ করা হয়, পুলিশ কোনো লিখিত আদেশ বা আইনি অনুমোদন ছাড়াই বেআইনিভাবে মসজিদ কর্তৃপক্ষকে মাইক সরানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করছে।ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে কোনো লিখিত সরকারি আদেশ বা আইনি ভিত্তি ছাড়াই বিভিন্ন জেলার প্রায় ৪,০০০ মসজিদে লাউডস্পিকার বা মাইক ব্যবহারে বাধা দেওয়া এবং তা খোলার জন্য পুলিশি চাপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা (PIL) দায়ের করেছেন আইনজীবী দানিশ ফারুকী।মামলাকারীর পক্ষে বিশিষ্ট জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংসদ সদস্য কল্যাণ ব্যানার্জি আদালতে সওয়াল করে জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত বিজ্ঞপ্তি বা নির্দেশনামা প্রকাশ না করেই শুধুমাত্র মৌখিক আদেশের মাধ্যমে মসজিদ কমিটিকে মাইক সরিয়ে ফেলতে বাধ্য করা হচ্ছে। বর্তমানে এটি এক ধরণের রেওয়াজে পরিণত হয়েছে যে, লিখিত কোনো নির্দেশ না দিয়ে পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার করা হচ্ছে।আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন (Noise Pollution Rules, 2000) অনুযায়ী কত ডেসিবল শব্দ তৈরি হচ্ছে তা পরিমাপ না করেই পুলিশ প্রশাসন সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই নির্দেশ মানতে বাধ্য করছে।আবেদনকারী আইনজীবী দানিশ ফারুকী জোর দিয়ে বলেন, ইসলাম ধর্মে আজান একটি অত্যন্ত মৌলিক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা ভারতের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকার হিসেবে সংরক্ষিত ও সুরক্ষিত। প্রশাসনিক এমন ঢালাও ও মৌখিক নিষেধাজ্ঞা সরাসরি নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর আঘাত হানে।উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলার মসজিদ কমিটিগুলো অভিযোগ তোলে যে, পুলিশ কর্মকর্তারা তাদেরকে থানায় ডেকে এনে অথবা সরাসরি মসজিদে গিয়ে কোনো লিখিত কাগজ ছাড়াই মাইক খোলার মৌখিক নির্দেশ দিচ্ছেন। এমনকি কিছু এলাকায় মসজিদ ও মন্দির উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের ডেকে এনে একতরফাভাবে এই নির্দেশ শুনিয়ে দেওয়া হয়।অন্যদিকে, শুনানিকালে রাজ্য সরকারের পক্ষে অ্যাডভোকেট জেনারেল (AG) বি. মিত্র এই জনস্বার্থ আবেদনের বিরোধিতা করে তা খারিজ করার দাবি জানান। রাজ্য সরকারের আইনজীবী দাবি করেন, আবেদনটিতে নির্দিষ্ট কোনো মসজিদের নাম উল্লেখ করা হয়নি যেখানে বাস্তবে মাইক খুলে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “কোনো ইমাম বা মসজিদ কর্তৃপক্ষ নিজে এসে অভিযোগ করেননি, আবেদনকারী শুনাকথার ওপর ভিত্তি করে মামলা করেছেন।”আদালত রাজ্য সরকারের আইনজীবীর এই যুক্তি শুনলেও অভিযোগের মূল সত্যতা সম্পর্কে জানতে চান। বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী সরাসরি প্রশ্ন করেন, “আপনাদের বক্তব্য কি এটিই যে এই পুরো অভিযোগটি ভিত্তিহীন ও মিথ্যা?”রাজ্য সরকারের আইনজীবী এই বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নির্দেশনা পাওয়ার জন্য আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত সময় প্রার্থনা করেন।এদিকে, আবেদনকারী আইনজীবী কল্যাণ ব্যানার্জি রাজ্য পুলিশ যেন বর্তমানে নতুন করে কোনো মসজিদের মাইক না খোলে—তার জন্য অবিলম্বে অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ বা রুল জারির আবেদন জানান। বিশেষ করে হুগলি জেলার জন্য একটি অন্তর্বর্তী আদেশের দাবি করা হলেও হাইকোর্ট নির্দিষ্ট তথ্যের অভাব উল্লেখ করে এখনই কোনো স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকৃতি জানান। রাজ্য সরকার আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে তাদের চূড়ান্ত বক্তব্য জমা দেওয়ার পর আদালত এই বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ