প্রকাশের তারিখ : ১৭ আগস্ট ২০২৬
মুসলমানদের জঙ্গি আখ্যা দেওয়া গোষ্ঠীগুলোই মূল সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী: মাওলানা আরশাদ মাদানী
ভারতের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে মহান অবদান আখ্যা দিয়ে দেশটির ধর্মনিরপেক্ষতার মূল ভিত্তি বিনষ্টকারীদের কড়া সমালোচনা করেছেন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি মাওলানা আরশাদ মাদানী। উত্তর প্রদেশের ঐতিহাসিক দারুল উলুম দেওবন্দে আয়োজিত এক বিশেষ স্বাধীনতা দিবস সমাবেশে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, যারা মুসলমানদের 'জঙ্গি' বা 'সন্ত্রাসী' হিসেবে চিহ্নিত করে সমাজ জুড়ে ঘৃণা ছড়ায়, মূলত তারাই দেশের আসল সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী।ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী মানসিকতার বিকাশ ও মুসলমানদের প্রতিনিয়ত নিশানা করার বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছেন উপমহাদেশের অন্যতম শীর্ষ ইসলামি চিন্তাবিদ ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি মাওলানা আরশাদ মাদানী। উত্তর প্রদেশের দেওবন্দে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ঐতিহাসিক ও অবিচ্ছেদ্য অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।সোমবার জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মাওলানা মাদানী অনুষ্ঠানে জোর দিয়ে বলেন, "যদি কেউ স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ ও মূল্য বুঝতে চায়, তবে তাদের আমাদের কাছে আসা উচিত। কারণ এই স্বাধীনতার জন্য রক্তের নজরানা আমরাই দিয়েছি। দারুল উলুম দেওবন্দ, আলেমসমাজ, মাদ্রাসা এবং সাধারণ মুসলমানদের ত্যাগের কথা বাদ দিয়ে ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস লেখা কিংবা অনুধাবন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।"ঐতিহাসিক তথ্য তুলে ধরে জমিয়ত প্রধান বলেন, ১৮৫৭ সালের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের পর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মূল কেন্দ্র হিসেবে ১৮৬৬ সালে দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্যই ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামী তৈরি করা। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমানে পরিকল্পিতভাবে ইতিহাস বিকৃত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। যে মাদ্রাসা থেকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার প্রথম উদাত্ত আহ্বান উঠেছিল, আজ সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকেই অপপ্রচার চালিয়ে 'সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্র' বানানোর চক্রান্ত চলছে।তিনি ১৯১৩ থেকে ১৯২০ সালের ঐতিহাসিক 'রেশমি রুমাল আন্দোলন' এবং মাল্টা দ্বীপে আলেমদের কারাবরণের স্মৃতি স্মরণ করে বলেন, এগুলো এমন এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় যা কোনো সাম্প্রদায়িক শক্তি ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে পারবে না। শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী, শায়খুল ইসলাম মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী এবং তাঁদের সঙ্গীরা হাজার হাজার মাইল দূরে মাল্টার কারাগারে নিগৃহীত হয়েছিলেন একমাত্র দেশকে ব্রিটিশদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য।সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোর দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, "যখন আমাদের মুরুব্বিরা মাল্টার কারাগারে বন্দি ছিলেন, যখন আলেমরা ব্রিটিশদের জেলে জীবন দিচ্ছিলেন, তখন যারা আজ দেশপ্রেমের সনদ বিতরণ করে বেড়ায়, তাদের আদর্শিক পূর্বপুরুষরা কোথায় ছিলেন? তাই মুসলমানদের বা মাদ্রাসার দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে ইতিহাস ও অতীতের আয়নায় নিজেদের মুখ দেখা উচিত।"দেশভাগের আগের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে মাওলানা মাদানী জানান, স্বাধীনতার আগেই দেওবন্দের আলেমরা আফগানিস্তানের কাবুলে হিন্দু রাজা মহেন্দ্র প্রতাপকে ভারতের অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনীত করে এক অনন্য অসাম্প্রদায়িক ভারতের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। অথচ আজ উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো সংবিধান থেকে 'ধর্মনিরপেক্ষ' শব্দটিই মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।সরাসরি রাজনৈতিক পর্যালোচনায় তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে কেবল বর্তমান শাসকদলই নয়, অতীতে ক্ষমতায় থাকা দলগুলোও সমভাবে দায়ী। বিগত সরকারগুলোর আমলেও মুসলমানদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামাজিকভাবে কোনঠাসা করা হয়েছে এবং দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছে। তবে আগের এবং বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। আগে আক্রমণ হতো মূলত 'মুসলমানদের' ওপর; আর আজ সরাসরি আঘাত হানা হচ্ছে 'ইসলামের' ওপর।তবে ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার সব চেষ্টা অতীত থেকেই ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন দীর্ঘকাল ধরে কমিউনিজম চাপিয়ে দিয়ে ইসলামকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল; মসজিদ ও মাদ্রাসায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আজান পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছিল। কিন্তু পরিণতিতে পৃথিবী দেখেছে শক্তিশালী সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং সেখান থেকেই একাধিক মুসলিম রাষ্ট্রের জন্ম।সবশেষে এক দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে মাওলানা মাদানী বলেন, "অন্যায়, অবিচার এবং জুলুমের সব সীমা অতিক্রম করা হলেও ইসলাম টিকে রয়েছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত থাকবে। মুসলিম জাতিও তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করেই বেঁচে থাকবে।"
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ