ইমারতে ইসলামিয়ার সরকারের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পাঁচ বছর পূর্তির প্রাক্কালে আফগানিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোল্লা মোহাম্মদ হাসান আখুন্দকে নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে এক বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ সাক্ষাৎকার। ১৭ আগস্ট ২০২৬ বিবিসি পশতুতে প্রকাশিত এই বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রথমবারের মতো তাকে ক্যামেরার সামনে বসে নিজের দৈনন্দিন জীবন, প্রশাসনিক দায়িত্ব, যোগাযোগের ধরন, তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা এবং ব্যক্তিগত জীবনযাপন সম্পর্কে কথা বলতে দেখা গেছে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিবিসির কাবুলভিত্তিক সাংবাদিক সাইয়েদ আবদুল্লাহ নিজামি। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সাক্ষাৎকারের দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে কাবুলের ঐতিহাসিক আর্গ প্রাসাদের ভেতরে—যে স্থাপনা আফগানিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত।মোল্লা মোহাম্মদ হাসান আখুন্দ তালেবান আন্দোলনের পুরোনো ও প্রভাবশালী নেতাদের একজন। তিনি তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা নেতা মোল্লা মোহাম্মদ ওমরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন এবং ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবানের প্রথম শাসনামলে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরে উপ-প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। ২০২১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার এবং তালেবানদের পুনরায় ক্ষমতা গ্রহণের পর তাকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী করা হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি সরকারের শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব অব্যাহত রাখেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার অবস্থানও বিতর্কমুক্ত নয়; তিনি জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের একজন।এতদিন জনসমক্ষে তার উপস্থিতি ছিল সীমিত। তালেবান সরকারের অন্যান্য শীর্ষ নেতার তুলনায় তিনি গণমাধ্যমের সামনে খুব কমই এসেছেন। ফলে তার সঙ্গে বিবিসির এই সাক্ষাৎকার শুধু একটি ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার নয়; বরং তালেবান সরকারের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও নেতৃত্বের ধরন বোঝার ক্ষেত্রে এটিকে একটি বিরল জানালা হিসেবে দেখা যেতে পারে।বিবিসির প্রতিবেদক সাইয়েদ আবদুল্লাহ নিজামির বর্ণনা অনুযায়ী, তালেবান শাসনের পাঁচ বছরে তিনি প্রথম সাংবাদিক হিসেবে ক্যামেরা নিয়ে আর্গ প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পেয়েছেন। আর্গ আফগানিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দীর্ঘদিনের প্রতীক। বিভিন্ন রাজনৈতিক শাসনামলে এর দেয়াল রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, ক্ষমতার পালাবদল এবং সংকটের সাক্ষী হয়েছে। তালেবানদের প্রত্যাবর্তনের পরও প্রাসাদের ঐতিহাসিক কাঠামো অনেকাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে; তবে সেখানে কর্মরত ও অবস্থানরত ব্যক্তিদের পোশাক, আচরণ ও প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে নতুন বাস্তবতার ছাপ স্পষ্ট।সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি ছিল প্রধানমন্ত্রী হাসান আখুন্দের দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততা। নিজের দিনের বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি জানান, তার দিনের শুরু হয় প্রশাসনিক কাজ দিয়ে। মানুষের বিভিন্ন আবেদন, অভিযোগ, অনুরোধ ও প্রস্তাবনা পর্যালোচনা এবং সেগুলোর সমাধান করাই তার কাজের প্রথম ধাপ। এসব কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি অন্য কোনো কাজে মনোযোগ দেন না। কোনো দিন এসব কাজ শেষ করতে এক ঘণ্টা লাগে, কোনো দিন দুই বা তিন ঘণ্টা। এরপর বিভিন্ন মন্ত্রী, উপজাতীয় নেতা, উলামা এবং আদালতের কর্মকর্তারা পর্যায়ক্রমে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং নিজ নিজ এলাকার সমস্যা ও প্রশাসনিক বিষয় তুলে ধরেন। এভাবে দিনের বড় একটি অংশ কেটে যায় বৈঠক ও সমস্যা সমাধানের কাজে। এরপর আসে নামাজের সময়।তার বক্তব্যে প্রশাসনের একটি বিশেষ ধরনের চিত্র ফুটে ওঠে—যেখানে প্রধানমন্ত্রীর কাছে রাষ্ট্র পরিচালনার অর্থ হলো মূলত মানুষের সমস্যা শোনা এবং সমাধানের চেষ্টা করা। তিনি নিজের দায়িত্বকে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রদর্শনের চেয়ে সমস্যা সমাধানের সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত করে দেখিয়েছেন।প্রাদেশিক সফর ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চল পরিদর্শনের বিষয়েও তার বক্তব্য ছিল ভিন্নধর্মী। তিনি জানান, তিনি খুব বেশি সফর করেন না। তার সহযোগীরা বিভিন্ন প্রদেশে যাওয়ার পরামর্শ দিলেও তিনি তাদেরই যেতে বলেন। তার যুক্তি, একজন মুসলমানের কোনো মানুষের সমস্যা সমাধান করতে পারাই আনন্দের বিষয়—সমস্যাটি যত ছোটই হোক না কেন। নিজের জন্য বিনোদন, ভ্রমণ কিংবা বিশ্রামের চেয়ে মানুষের সমস্যার সমাধানকে তিনি বেশি মূল্য দেন।এই বক্তব্য তার নেতৃত্বের একটি নির্দিষ্ট মানসিকতার ইঙ্গিত দেয়। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নিজের উপস্থিতি সর্বত্র প্রদর্শনের পরিবর্তে তিনি প্রশাসনিক দপ্তরে বসে কাজ করাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তিনি বলেন, সকাল থেকে বের হওয়ার পর সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি আর্গেই অবস্থান করেন এবং সেখানেই কাজ করেন। তার কাছে নেতৃত্বের প্রধান পরিচয় যেন মাঠে ঘোরাফেরা নয়, বরং দায়িত্বের জায়গায় স্থির থেকে কাজ করে যাওয়া।সাক্ষাৎকারে তার প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরনও বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রপ্রধান যখন স্মার্টফোন, ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং তাৎক্ষণিক তথ্যপ্রবাহের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তখন হাসান আখুন্দের ব্যক্তিগত যোগাযোগের পদ্ধতি অনেকটাই সাদামাটা। তিনি জানান, স্মার্টফোন বা বড় ধরনের মোবাইল তিনি খুব বেশি ব্যবহার করেন না। খবর শোনার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী মোবাইল ব্যবহার করেন এবং একটি ছোট সাধারণ ফোনও রাখেন।তবে প্রযুক্তির ব্যবহার কম হলেও জরুরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে তিনি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নন। রাতে তিনি একটি ছোট ফোন সঙ্গে রাখেন এবং তার দপ্তরের প্রধানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বলে রেখেছেন, রাতের যে কোনো সময়ে প্রয়োজন দেখা দিলে যেন তাকে ফোন করা হয়। অর্থাৎ ব্যক্তিগত প্রযুক্তি ব্যবহারে অনাগ্রহ থাকলেও প্রশাসনিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে তিনি সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকার একটি ব্যবস্থা রেখেছেন।দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি কীভাবে খবর রাখেন—এ প্রশ্নও সাক্ষাৎকারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হাসান আখুন্দ জানান, সরকারের একটি বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা রয়েছে, যার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রদেশের সামরিক ও বেসামরিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা জরুরি সমস্যা দেখা দিলে তা দ্রুত তার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ব্যক্তিগতভাবে প্রযুক্তিনির্ভর না হলেও সরকারের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে।আর্গ প্রাসাদের ভেতরের পরিবেশও সাক্ষাৎকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বিবিসির প্রতিবেদনে যে দৃশ্য উঠে এসেছে, তাতে আফগান রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রকে প্রচলিত অর্থে কোনো অতিরিক্ত জাঁকজমকপূর্ণ রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে দেখা যায়নি। হাসান আখুন্দ যে কক্ষে বসেন, সেখানে সাধারণ পরিবেশ, হলুদ রঙের গালিচা ও বসার ব্যবস্থা এবং দেয়ালে একটি ঘড়ি দেখা যায়। ঘড়িটি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় নির্দেশ করে। মন্ত্রী ও অন্যান্য কর্মকর্তারা একই পরিবেশে বসে তার সঙ্গে আলোচনা করেন।প্রতিবেদকের চোখে আর্গের এই পরিবেশ এবং সেখানে অবস্থানরত ব্যক্তিদের জীবনযাপন আফগানিস্তানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে। আগের শাসনামলের রাষ্ট্রীয় আড়ম্বরের পরিবর্তে এখানে ধর্মীয় ও ঐতিহ্যনির্ভর একটি অপেক্ষাকৃত অনাড়ম্বর প্রশাসনিক সংস্কৃতির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তবে এই সরলতা কতটা কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে রূপান্তরিত হচ্ছে, সেটি আলাদা প্রশ্ন।সাক্ষাৎকারের সময় আর্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রী, অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদেরও দেখা যায়। বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা স্থানীয় নেতারাও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, আর্গ শুধু আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় দপ্তর নয়; তালেবান সরকারের প্রশাসনিক যোগাযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।হাসান আখুন্দের ব্যক্তিগত জীবনযাপন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তার সরল পোশাক, সীমিত প্রযুক্তি ব্যবহার, ব্যক্তিগত ভ্রমণে অনাগ্রহ এবং দীর্ঘ সময় অফিসে অবস্থান করার বিষয়গুলোকে অনেকে তার ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখছেন। আফগান সামাজিক মাধ্যমে কেউ কেউ তার জীবনযাপনকে সরলতা ও বিনয়ের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। কেউ কেউ তাকে পুরোনো আফগান গ্রামীণ নেতৃত্বের ধারার একজন প্রতিনিধি হিসেবে দেখেছেন—যেখানে নেতার ব্যক্তিগত জীবন অপেক্ষাকৃত অনাড়ম্বর এবং প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।তবে সাক্ষাৎকারকে ঘিরে সব প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক নয়। সমালোচকদের একটি অংশ মনে করেন, একজন রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যক্তিগত সরলতা অবশ্যই প্রশংসনীয় হতে পারে, কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা নির্ধারণের জন্য এটি যথেষ্ট নয়। একটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, নারী ও শিশুদের অধিকার, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনীতি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার মতো বিষয়গুলো অত্যন্ত জটিল। এসব বিষয়ে একজন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবনযাপন বা কর্মঘণ্টা দিয়ে তার সরকারের কার্যকারিতা বিচার করা যায় না।এই জায়গাটিই সাক্ষাৎকারটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণাত্মক দিক। হাসান আখুন্দের বক্তব্য মূলত তার ব্যক্তিগত কর্মপদ্ধতি ও প্রশাসনিক দর্শনের একটি চিত্র দেয়; কিন্তু এটি তালেবান সরকারের সামগ্রিক নীতির পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা নয়। ফলে তার সরলতা কিংবা কর্মনিষ্ঠাকে যেমন একেবারে অস্বীকার করা যায় না, তেমনি কেবল এসব বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে তালেবান সরকারের শাসনব্যবস্থার সামগ্রিক মূল্যায়ন করাও যথার্থ হবে না।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাক্ষাৎকারে ব্যক্তিগত জীবন ও প্রশাসনিক রুটিনের ওপর বেশি গুরুত্ব থাকলেও আফগানিস্তানের সবচেয়ে বিতর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু রাষ্ট্রীয় প্রশ্ন সরাসরি আলোচনায় আসেনি। বিশেষ করে নারী শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক সংকট, বৈদেশিক সম্পর্ক এবং তালেবান সরকারের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোর মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে সাক্ষাৎকারটি তালেবান সরকারের নীতিগত অবস্থানের চেয়ে বরং তার প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবন ও কাজের ধরন সম্পর্কে বেশি তথ্য দেয়।তারপরও এই সাক্ষাৎকারের গুরুত্ব কমে যায় না। কারণ তালেবান নেতৃত্বের শীর্ষ সারির একজন নেতাকে এত কাছ থেকে দেখার সুযোগ দীর্ঘদিন ধরে খুব সীমিত ছিল। বিশেষ করে আর্গ প্রাসাদের ভেতরে বসে তার নিজের মুখে দৈনন্দিন কর্মপদ্ধতির বর্ণনা আফগানিস্তানের বর্তমান ক্ষমতাকাঠামো সম্পর্কে একটি প্রত্যক্ষ ধারণা তৈরি করে।হাসান আখুন্দের বক্তব্যে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়—তিনি নিজেকে প্রচলিত অর্থে ক্ষমতাবান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেননি। বরং একজন দায়িত্বশীল প্রশাসক, ধর্মীয় মূল্যবোধে পরিচালিত ব্যক্তি এবং মানুষের সমস্যা সমাধানে নিয়োজিত নেতা হিসেবে নিজের পরিচয় তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্যে ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশের পরিবর্তে দায়িত্ব পালন, ভ্রমণের পরিবর্তে দাপ্তরিক কাজ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যক্তিজীবনের পরিবর্তে সীমিত যোগাযোগের একটি ছবি ফুটে ওঠে।তবে একজন নেতার ব্যক্তিগত সরলতা এবং একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক দক্ষতা—দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি। একটি রাষ্ট্রের কার্যকারিতা নির্ভর করে শুধু তার শীর্ষ নেতার কর্মনিষ্ঠার ওপর নয়; বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহি, দক্ষ প্রশাসন, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিত করার ওপরও। তাই হাসান আখুন্দের এই সাক্ষাৎকারকে তালেবান সরকারের একটি অভ্যন্তরীণ চিত্র হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু পুরো শাসনব্যবস্থার চূড়ান্ত মূল্যায়ন হিসেবে নয়।সব মিলিয়ে বিবিসি পশতুর এই বিশেষ সাক্ষাৎকার আফগানিস্তানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার একটি বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যপট সামনে এনেছে। আর্গ প্রাসাদের একটি সাধারণ কক্ষে বসে থাকা একজন বয়োজ্যেষ্ঠ তালেবান নেতা, তার সীমিত প্রযুক্তি ব্যবহার, রাত-বিরাতে প্রশাসনিক যোগাযোগের প্রস্তুতি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং মানুষের সমস্যা সমাধানকে নিজের আনন্দ হিসেবে তুলে ধরার বক্তব্য—সব মিলিয়ে তার ব্যক্তিত্বের একটি স্বতন্ত্র ছবি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এই সাক্ষাৎকার প্রশ্নও রেখে গেছে: ব্যক্তিগত সরলতা ও নিষ্ঠার এই নেতৃত্বশৈলী কি আধুনিক আফগান রাষ্ট্রের বহুমাত্রিক ও জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যথেষ্ট কার্যকর প্রমাণিত হবে?এই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। তবে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট—তালেবান সরকারের সবচেয়ে নীরব ও আড়ালে থাকা শীর্ষ নেতাদের একজনকে নিয়ে এই সাক্ষাৎকার আফগানিস্তানের ক্ষমতার কেন্দ্রের ভেতরের এমন কিছু দৃশ্য জনসমক্ষে এনেছে, যা এতদিন বহির্বিশ্বের কাছে অনেকটাই অদৃশ্য ছিল। সেই অর্থে এটি শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর জীবনযাপনের গল্প নয়; বরং তালেবান শাসনের অন্তর্গত রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক মানসিকতা এবং নেতৃত্বের ধরন বোঝার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।