প্রকাশের তারিখ : ২৪ আগস্ট ২০২৬
পানামা খাল ঘিরে চরম উত্তেজনা: নতুন ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন
ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার পর, তার প্রভাব পড়ে হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত পানামা খালে। প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের সংযোগকারী ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই কৃত্রিম জলপথটি এখন নতুন বৈশ্বিক উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করেছে যে এই জলপথে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি। বিপরীতে বেইজিং একে ওয়াশিংটনের খাল দখলের অযৌক্তিক বাহানা বলে প্রত্যাখ্যান করেছে, আর পানামা জোর দিয়ে জানিয়েছে-এই জলপথ স্থায়ীভাবে নিরপেক্ষ থাকবে।বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ধমনী ও বর্তমান সংকট
আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্তকারী পানামার সরু ভূখণ্ড চিরে তৈরি ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ পানামা খাল বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের অন্যতম মূল কেন্দ্র। এটি জাহাজগুলোকে দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত বিপজ্জনক কেইপ হর্ন ঘুরে হাজার হাজার মাইলের দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সমুদ্রযাত্রা থেকে মুক্তি দেয়। মিশরের সুয়েজ খালের মতো এখানেও ট্রানজিট ফি দিয়ে জাহাজগুলো যাতায়াত করে। খালটি একটি জটিল 'লক' ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যা স্বাদু পানির গাতুন হ্রদ ব্যবহার করে জাহাজকে উঁচুতে তোলে ও বিপরীত উপকূলে নামায়। ফলে পানামা খালের ওপর খরার প্রভাব সরাসরি পড়ে; পানির স্তর কমলে জাহাজগুলোকে কম মাল বহন করতে হয়।সম্প্রতি বাল্টিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম কাউন্সিল (বিমকো)-এর তথ্যমতে, বিশ্ব বাণিজ্যে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার কারণে মার্কিন জ্বালানি তেল ও কনটেইনার বাহী জাহাজগুলো পানামা খালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর হয়ে পড়েছে। জলপথটিতে দৈনিক জাহাজ চলাচল বেড়ে সর্বোচ্চ সক্ষমতার কাছাকাছি (গড়ে ৩৮টি) পৌঁছায়। ট্রানজিট পারাপার দ্রুত করতে কিছু শিপিং কোম্পানি নিলামে কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত মালামাল ফি প্রদান করছে।জ্বালানি বনাম সাপ্লাই চেইনের লড়াই
উত্তর টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক অরল্যান্ডো জে পেরেজের মতে, "হরমুজ প্রণালি হলো বিশ্বের মোট জ্বালানির এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনের মাধ্যম। পক্ষান্তরে, পানামা খাল বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের ৫ শতাংশ বহন করলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে একটি হলো জ্বালানির কেন্দ্র, অন্যটি বিশ্বের প্রধান অর্থনীতির সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন)। দুটি ভূরাজনৈতিক কেন্দ্রই অত্যন্ত সংবেদনশীল।"এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গাতুন হ্রদের স্বাদু পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পানামা ক্যানাল অথরিটি প্রতিদিন দৈনিক পারাপারের সংখ্যা ৩৬ থেকে কমিয়ে ৩২-এ আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ২০২৩ সালের তীব্র খরার পর বৈশ্বিক বাণিজ্যিক জটকে আরও ঘনীভূত করেছে।চীনা উপস্থিতি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ
হংকংভিত্তিক সিকে হাচিসন (CK Hutchison) কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে খালের প্রবেশমুখে অবস্থিত বালবোয়া ও ক্রিস্টোবাল বন্দর পরিচালনা করছে। যদিও চীন বা উক্ত কোম্পানি সরাসরি খালের মূল পরিচালনায় যুক্ত নয়, তবু কৌশলগত জলপথের কাছে চীনের অবস্থান নিয়ে ওয়াশিংটন বারবার নিরাপত্তা ঝুঁকি তুলে ধরছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, চীন পানামায় অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র খালের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিতও দিয়েছে। এ বছর পানামার সুপ্রিম কোর্ট হাচিসনের একটি রেয়াতি চুক্তি অসাংবিধানিক ঘোষণা করলে উত্তেজনা চরম রূপ নেয়।তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ওয়াশিংটনের এই উদ্বেগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রণোদিত। হংকং চীনের অধীনে আসার আগেই ১৯৯৭ সাল থেকে সিকে হাচিসন কেবল কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করে আসছে।বেইজিং ও পানামার প্রতিক্রিয়া
মার্কিন দাবির জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান ও জাতিসংঘে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ফু চং বলেন, "ঐতিহাসিকভাবে সামরিক শক্তি দিয়ে পানামার সার্বভৌমত্ব পদদলিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এখন তারা নিজেদের স্বার্থে চীনকে বলির পাঁঠা বানিয়ে স্থায়ীভাবে নিরপেক্ষ একটি আন্তর্জাতিক জলপথকে নিজেদের দখলে নিতে চাইছে।"পানামার প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো দৃঢ়ভাবে পানামার সার্বভৌমত্ব পুন ব্যক্ত করে বলেছেন, "পানামা খালের স্থায়ী নিরপেক্ষতাই বৈশ্বিক বড় শক্তিগুলোর হুমকি থেকে নিজেকে রক্ষার সেরা প্রতিরক্ষা।"আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মাঝে পানামা, ইয়েমেনের বাব আল-মান্দেব কিংবা উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর মতো ছোট দেশগুলো বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক বৈষম্যের নির্মম শিকার হচ্ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ