প্রকাশের তারিখ : ২৪ আগস্ট ২০২৬
ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ায় জ্বালানি সংকট: মধ্য এশিয়ায় চরম পেট্রোল আতঙ্ক
ইউক্রেনের সাম্প্রতিক ড্রোন হামলায় রাশিয়ার প্রধান প্রধান তেল শোধনাগার এবং জ্বালানি ডিপো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মধ্য এশিয়া জুড়ে তীব্র পেট্রোল আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ক্রেমলিনের ভুল যুদ্ধনীতি ও অর্থনৈতিক অচলাবস্থার জেরে রাশিয়ার সাধারণ নাগরিকরা যেমন কিলোমিটারের পর কিলোমিটার লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি শিকার বা "ফয়েল ট্যুরিজমে" বাধ্য হচ্ছেন, তেমনি কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তানের মতো মধ্য এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোও চরম বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে।রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যখন শান্তি আলোচনা প্রত্যাখ্যান করে সব ফ্রন্টে অগ্রগতির দাবি করছেন, তখন দেশের ভেতরে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। Crimean উপদ্বীপ থেকে শুরু করে বাল্টিক সাগর এবং পশ্চিম সাইবেরিয়া পর্যন্ত রাশিয়ার একের পর এক তেল শোধনাগার ইউক্রেনীয় ড্রোনের আঘাতে ভস্মীভূত হচ্ছে। এর ফলে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারে দেখা দিয়েছে তীব্র পেট্রোল ঘাটতি। তেল সংকটে ক্ষুব্ধ সাধারণ রুশরা বাধ্য হয়ে মধ্য এশিয়ার তেলসমৃদ্ধ দেশ কাজাখস্তানের সীমান্ত অভিমুখে ছুটছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে একে "ফয়েল ট্যুরিজম" বা "গ্যাস হান্টিং" হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে, যেখানে রুশ নাগরিকরা কয়েকশো কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে জ্বালানি কিনতে সীমান্ত অতিক্রম করছেন।কাজাখস্তান সরকার মে মাসের শেষের দিকে পেট্রোল রপ্তানি নিষিদ্ধ করলেও ৭,৬৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বিস্তৃত সীমান্তে ব্যাপক চোরাচালান চলছে। ক্যানিস্টার, স্থানীয়ভাবে রূপান্তরিত জ্বালানি ট্যাংক এমনকি দানবীয় ফুয়েল ট্রাকে করে সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে জ্বালানি পাচারের চেষ্টা চলছে। কাজাখস্তানের রাজধানী আলমাতির এক ব্যবসায়ী আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, সীমান্ত জুড়ে অবাধ চোরাচালান অব্যাহত রয়েছে, যার ফলে কাজাখস্তানেও এ বছর পেট্রোলের দাম প্রায় ১৫.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।রাশিয়ার এই সামরিক অচলাবস্থার সবচেয়ে ভয়াবহ বলি হয়েছে মধ্য এশিয়ার দুর্বল ও পাহাড়ি অর্থনীতির দেশগুলো-বিশেষ করে কিরগিজস্তান এবং তাজিকিস্তান। দেশ দুটি তাদের মোট পেট্রোলের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু সাইবেরিয়ার ওমস্ক-এ অবস্থিত রাশিয়ার বৃহত্তম তেল শোধনাগারটি জুলাইয়ে ইউক্রেনীয় হামলায় বিকল হয়ে যাওয়ার পর সরবরাহ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কিরগিজ সরকার পেট্রোলের দাম নিয়ন্ত্রণ ও ভর্তুকি চালু করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউক্রেনের অব্যাহত হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত এই অবকাঠামো সচল করতে মাস বা বছর লেগে যেতে পারে।তাজিকিস্তানের অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক, যেখানে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ড্রাইভারদের গাড়িপ্রতি সর্বোচ্চ ২০ লিটার পেট্রোলের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই সংকট কাটাতে তাজিকিস্তান ইতিমধ্যেই ইরানের কাছ থেকে ২৫ লাখ টন তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য কেনার চুক্তি করেছে এবং চীনের সিএনপিসি (CNPC)-এর সাহায্যে নিজস্ব ভূখণ্ডে নতুন তেলের সন্ধান ত্বরান্বিত করছে। অন্যদিকে উজবেকিস্তান শীতকালীন সংকট মোকাবিলায় জরুরি কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, ইউক্রেন সংকটের কারণে সৃষ্ট রাশিয়ার অবকাঠামোগত ব্যর্থতা ও বিশ্বব্যাপী মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার ফলে মধ্য এশিয়ার এই মুসলিম প্রধান দেশগুলোর অর্থনীতি চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। তবে এই জ্বালানি সংকটের সুযোগ নিয়ে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার অঞ্চলে দ্রুত আধিপত্য বিস্তার করছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ