প্রকাশের তারিখ : ২৫ আগস্ট ২০২৬
দিল্লির আধিপত্যবাদের দিন শেষ: সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতিতে অবিচল বাংলাদেশ
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক ও সংবাদমাধ্যমীয় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে নয়াদিল্লিতে। বিগত দেড় দশকের শেখ হাসিনা সরকারের আমল থেকে ভিন্ন পথে হেঁটে বর্তমান বাংলাদেশ সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে-কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সুবিধাজনক সময়ে নয়, বরং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও অনুকূল পরিবেশ সাপেক্ষেই পরিচালিত হবে সব দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। ভারতীয় আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও সাবেক স্বৈরশাসকের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টাকে উপেক্ষা করে ঢাকা এখন পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতির চর্চা করছে।বাংলাদেশের স্বাধীন-সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতির পুনর্জাগরণে চরম অস্বস্তিতে পড়েছে প্রতিবেশী ভারত। দেশটির গণমাধ্যম, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক diplomat-রা সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর ও ঢাকায় নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে একধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিরতা ও অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।ঐতিহাসিকভাবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান কখন, কোন দেশে সফর করবেন—তা নির্ধারণ করার একক এখতিয়ার সেই রাষ্ট্রের নিজের। অথচ ভারতীয় গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রচারণায় মনে হচ্ছে, দিল্লির পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ পাওয়া মাত্রই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর তাৎক্ষণিক দিল্লি ছুট দেওয়া উচিত ছিল। বিগত ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা শাসনের আমলে বাংলাদেশ যেভাবে ভারতের প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য দেখিয়েছিল, বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশকে সেই একই ছাঁচে দেখতে চাইছে নয়াদিল্লি।শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনে বাংলাদেশে ভারতের প্রভুত্বকামী নীতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশি জনগণের গণতান্ত্রিক ও মৌলিক অধিকার হরণের বিনিময়ে দিল্লি নিজের বাণিজ্যিক, কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করে নেয়। ফলস্বরূপ, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার সার্বভৌম সত্তা হারিয়ে কার্যত দিল্লির সাউথ ব্লকের একটি 'ক্লায়েন্ট স্টেট'-এ পরিণত হয়েছিল। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের ভাষায় দুই দেশের সম্পর্ক ছিল "স্বামী-স্ত্রীর মতো"—যেখানে ভারত কেবল দাবি করেছে এবং ঢাকা তা পূরণ করেছে। খোদ শেখ হাসিনাও স্বীকার করেছিলেন যে, "ভারতকে যা দিয়েছি, তা তারা চিরদিন মনে রাখবে।"২০২৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, "দিল্লির আছে, আমরা আছি।" কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের ঐতিহাসিক জনঅভ্যুত্থান ভারতের এই প্রভুত্ববাদী নীতির ওপর চরম আঘাত হানে। অন্তর্বর্তী সরকারের পর নির্বাচিত তারেক রহমানের সরকারের আমলেও বাংলাদেশ সেই দাসত্বের নীতি থেকে বেরিয়ে এসে আত্মমর্যাদাশীল পররাষ্ট্রনীতি নিশ্চিত করেছে।দিল্লির হিন্দুত্ববাদী ও নীতি-নির্ধারকরা আশা করেছিলেন, বিমসটেক সম্মেলনের বাহানায় বা পলাতক স্বৈরশাসক শেখ হাসিনাকে দিয়ে ভারতে রাজনৈতিক সভা করিয়ে বাংলাদেশকে মানসিক চাপে রাখা যাবে। কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শক্ত অবস্থান নিয়ে সাফ জানিয়ে দিয়েছে—পলাতক মানবতাবিরোধী অপরাধী শেখ হাসিনাসহ আসামীদের ফেরত দেওয়া এবং সফরের অনুকূল পরিবেশ তৈরির পরেই কেবল সফর সম্ভব। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, "বাংলাদেশ ফার্স্ট" নীতি অনুসরণ করা হবে এবং দিল্লি সফরের কোনো তাড়াহুড়ো ঢাকার নেই।এই আত্মমর্যাদাপূর্ণ অবস্থানের পর ভারতীয় মিডিয়া ও দেশের ভেতরের কিছু চিহ্নিত আওয়ামী প্রচারবিদ অপপ্রচারে মেতে উঠেছেন। ভারত থেকে বিদ্যুৎ ও ডিজেল সরবরাহ বন্ধের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। যদিও বাস্তব সত্য হলো, বাংলাদেশ কোনো কিছুই ভারত থেকে বিনামূল্যে পায় না। মোট ডিজেল চাহিদার ১০ শতাংশেরও কম আসে ভারত থেকে। অন্যদিকে, আদানির সাথে অসচ্ছ ও চড়া দামের বিদ্যুৎ চুক্তি ছিল আদতে মোদি সরকারকে দেওয়া এক রাজনৈতিক ঘুষ।বর্তমানে ভারতীয় মিডিয়ার সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে—সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সমন্বয়ে গঠিত সম্ভাব্য ত্রিদেশীয় 'মক্কা প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক ফ্রেমওয়ার্কে' বাংলাদেশের ইতিবাচক মনোভাব। ভারত তার নিজস্ব কূটনৈতিক জটিলতার কারণে যেসব দেশকে প্রতিপক্ষ মনে করে, বাংলাদেশকেও তাদের সাথে দূরত্ব রাখতে বাধ্য করতে চায়। কিন্তু ঢাকা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—বিশ্ব রাজনীতিতে নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশ যেকোনো আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক জোটে স্বাধীনভাবে যুক্ত হবে। সার্ককে অকার্যকর করে ভারত যে সংকীর্ণ আঞ্চলিক পররাষ্ট্রনীতির পরিচয় দিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটে মিত্র ইরানকে ত্যাগ করে ইসরাইলি আগ্রাসনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তা প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের নীতি কতটা অবিশ্বস্ত ও দুর্বল।সংক্ষেপে, নয়াদিল্লির এই বর্তমান শোরগোল এবং গণমাধ্যমীয় আক্রমণ মূলত ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে নিজেদের একচ্ছত্র প্রভাব ও প্রভুত্ব হারানোর গভীর বেদনা থেকে উদ্ভূত। তবে বাংলাদেশ স্পষ্ট করে দিয়েছে—রক্তের বিনিময়ে অর্জিত নতুন ভারতের অনুগত থাকার দিন শেষ, এখন থেকে প্রতিটি পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে স্বাধীন বাংলাদেশের নিজের শর্তে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ