প্রকাশের তারিখ : ২৮ আগস্ট ২০২৬
চেঙ্গিস খানের নাতির ইসলাম গ্রহণ: ইতিহাসের যে বাঁক বদলে স্বস্তি পেয়েছিল মুসলিম বিশ্ব
ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মঙ্গল সাম্রাজ্যের বিভীষিকাময় আগ্রাসনে যখন পুরো মুসলিম বিশ্ব কেঁপে উঠেছিল, ঠিক তখনই ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব মোড় ঘুরে যায়। মধ্য এশিয়ার প্রখ্যাত সুফি সাধক শায়খ সাইফুদ্দিন বাহারজির হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করেন মঙ্গল সম্রাট চেঙ্গিস খানের পৌত্র এবং গোল্ডেন হোর্ডের (সোনার উর্দু) শাসক বারকে খান। তিনি কেবল নিজে মুসলিম হননি, বরং ১২৫৮ সালে বাগদাদে হালাকু খানের নৃশংস গণহত্যার জবাবে স্বজাতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। বারকে খানের এই দৃঢ় অবস্থান ও ঐতিহাসিক বিজয়ের ফলেই মধ্যপ্রাচ্য মঙ্গলদের রক্তক্ষয়ী ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পায় এবং ইসলামি বিশ্বের ভাগ্য চিরতরে বদলে যায়।চেঙ্গিস খানের সাম্রাজ্য ও জোচি উলুসের উত্থানবিশ্বজয়ী মঙ্গল সম্রাট চেঙ্গিস খান মৃত্যুর পূর্বে তার বিশাল সাম্রাজ্যকে চার পুত্রের মধ্যে বণ্টন করে দেন। সাম্রাজ্যের পশ্চিম ভাগ—যা মধ্য এশিয়া থেকে কাস্পিয়ান সাগর ও কৃষ্ণসাগরের উপকূল (দেশত-ই কিপচাক) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল—তা অর্পিত হয় চেঙ্গিস খানের জ্যেষ্ঠ পুত্র জোচির ওপর। মঙ্গল ঘোড়ার খুরের ছাপ যেখানেই পড়েছে, সেই অঞ্চলই জোচির অধীনে বলে গণ্য হতো। জোচির অকালমৃত্যুর পর চেঙ্গিস খানের সরাসরি আদেশে জোচির ১৮ পুত্রের অন্যতম বাতু খান এই বিশাল ভূখণ্ডের দায়িত্ব লাভ করেন। বাতু খানের এই শাসন এলাকাকে "জোচি উলুস" বলা হতো।১২৩৫ সালে মঙ্গল সাম্রাজ্যের প্রধান কেন্দ্র কারাকোরামে অনুষ্ঠিত কুৰুলতাইয়ে (সর্বোচ্চ সভা) সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, বাতু খানের নেতৃত্বে একটি বিশাল বাহিনী ইউরোপ ও কাস্পিয়ান অঞ্চলের উত্তরে অভিযান চালাবে। বাতু খান কয়েক লাখ তুর্কি ও মঙ্গল সৈন্যের সমন্বয়ে গঠিত বিশাল সৈন্যদল নিয়ে উত্তর কৃষ্ণসাগর, রাশিয়া, পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া এবং বল্টিক সাগরের তীর পর্যন্ত এলাকা জয় করেন।১২৪১ সালে বড় খান ওগেদাইয়ের মৃত্যুর পর বাতু খান তার পূর্ব অভিযান স্থগিত রেখে ইদিল (ভোলা) নদীর নিম্ন অববাহিকায় ফিরে আসেন এবং "সারাই" নামে একটি নতুন রাজধানী স্থাপন করেন। বাতু খানের তাঁবুর উপরিভাগ সোনা দিয়ে মোড়ানো থাকত বলে তার প্রতিষ্ঠিত এই রাষ্ট্রটি ইতিহাসে "গোল্ডেন হোর্ড" বা "আলতুন ওর্দা" নামে পরিচিতি লাভ করে। বাতু খান নিজে শামানবাদী হলেও তার রাজ্যে অন্য ধর্মের প্রতি অত্যন্ত সহনশীল ছিলেন। এমনকি তার ছোট ভাই বারকে খানের ইসলাম গ্রহণেও তিনি পরম সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।শায়খ বাহারজি ও বারকে খানের ঐতিহাসিক রূপান্তরবারকে খান ছিলেন চেঙ্গিস খানের সরাসরি পৌত্র এবং বাতু খানের ছোট ভাই। তার শৈশব সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া না গেলেও জানা যায় যে, তিনি তরুণ বয়সেই বুখারার বিখ্যাত কুবরাবিয়া সুফি তরিকার প্রতিষ্ঠাতা নাজমুদ্দিন কুবরার স্থলাভিষিক্ত শায়খ সাইফুদ্দিন বাহারজির সংস্পর্শে আসেন।ঐতিহাসিক ইবনে খালদুনের বর্ণনানুসারে, বারকে যখন সুফি সাধক শায়খ বাহারজির সঙ্গে দেখা করতে বুখারা পৌঁছান, তখন শায়খ তাকে নিজের দরজায় টানা তিন দিন অপেক্ষা করিয়ে রাখেন। তৎকালীন সময়ের একজন প্রচণ্ড ক্ষমতাশালী ও রাগী মঙ্গল প্রধান হয়েও বারকে খান অত্যন্ত ধৈর্য ও বিনয়ের সাথে অপেক্ষা করেন। এর মাধ্যমে তিনি মুসলিমদের প্রতি তার শ্রদ্ধা ও ইসলামের প্রতি অনুরাগের প্রমাণ দেন। পরবর্তীতে শায়খ বাহারজির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন। চেঙ্গিস খানের বংশের মধ্যে তিনিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি তাওহীদের পাতাকা তলে আশ্রয় নেন। এই ঘটনা ছিল মধ্যযুগের ইসলামি সভ্যতার জন্য এক বিরাট আশীর্বাদ।১২৫৬ সালে বাতু খান এবং তার দুই পুত্র সারতাক ও উলাকচির মৃত্যুর পর গোল্ডেন হোর্ডের সর্বময় কর্তৃত্ব ও মসনদে আরোহণ করেন বারকে খান।বাগদাদের ট্র্যাজেডি ও হালাকু খানের রক্তলোলুপতাঠিক যে সময়ে বারকে খান গোল্ডেন হোর্ডের শাসনভার গ্রহণ করেন, ঠিক সেই সময়েই পারস্যে অবস্থানরত আরেক মঙ্গল রাজপুত্র—চেঙ্গিস খানের অপর পৌত্র ও হালাকু খান—মধ্যপ্রাচ্যে তান্ডব চালাচ্ছিল। বড় খান মেঙ্গুর আদেশে হালাকু খান ১২৫৬ সালে শিয়া ইসমাইলি সম্প্রদায়ের ঘাঁটি আলমুত দুর্গ ধ্বংস করেন এবং ১২৫৮ সালে আব্বাসীয় খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ অবরোধ করেন।বাগদাদ দখলের পর হালাকু খান মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা পরিচালনা করেন। লাখ লাখ মুসলিমকে হত্যা করা হয়, আব্বাসীয় খলিফাকে ঘোড়ার পায়ে পিষে নির্মমভাবে শহীদ করা হয় এবং শত বছরের প্রাচীন বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক বইপুস্তক দাজলা নদীতে নিক্ষেপ করে নদী কালো করে দেওয়া হয়। বাগদাদের পর হালাকু তার দৃষ্টিভঙ্গি ফেরায় সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের দিকে।স্বজাতির বিরুদ্ধে বারকে খানের জিহাদ ঘোষণাহালাকু খানের এই অপকর্ম ও মুসলিমদের রক্তে হাত রাঙানোর খবর পৌঁছালে চরম ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত হন গোল্ডেন হোর্ডের প্রধান বারকে খান। তৎকালীন ম্যামলুক সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্সও হালাকু খানের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়ে বারকে খানের কাছে বার্তা পাঠান।বারকে খান অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হালাকু খানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। তিনি বলেন, "হালাকু বাগদাদ ধ্বংস করেছে এবং অন্যায়ভাবে মুসলিমদের হত্যা করেছে। আল্লাহর কসম! আমি আমার প্রতি ফোঁটা রক্তের বদলে তার বিচার করব।"ইতঃপূর্বে পূর্ব আনাতোলিয়া ও আজারবাইজানের রাজস্ব এবং ভূমিকার বণ্টন নিয়ে হালাকুর সাথে বারকে খানের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু বাগদাদ হত্যাকাণ্ড সেই দ্বন্দ্বকে সরাসরি যুদ্ধে রূপ দেয়। বারকে খান নিজের কেন্দ্র থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ঘোষণা করেন, নিজস্ব মুদ্রা চালু করেন এবং হালাকুর বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন।তেরেক নদীর ঐতিহাসিক যুদ্ধ: হালাকুর শোচনীয় পরাজয়১২৬৩ সালে বারকে খান তার অসামান্য সেনাপতি ও ভাতিজা নোঘাইয়ের নেতৃত্বে এক বিশাল সৈন্যদল আজারবাইজানের দিকে প্রেরণ করেন। বারকে খান তার মুসলিম সৈন্যদের ইসলামের জন্য 'জিহাদ' এবং অমুসলিম মঙ্গল সৈন্যদের চেঙ্গিস খানের আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে লড়ার অনুপ্রেরণা দেন।কুর নদীর উত্তরে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথম সংঘর্ষে বারকে খানের বাহিনী বিজয়ী হয়। হালাকুর সৈন্যরা দরবেন্ত হয়ে তেরেক নদীর দিকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। শীতকাল হওয়ায় তেরেক নদী সম্পূর্ণ বরফে জমে গিয়েছিল। সেনাপতি নোঘাইয়ের চূড়ান্ত আক্রমণের মুখে হালাকুর বিশাল সৈন্যদল যখন বরফে জমে যাওয়া তেরেক নদী পার হয়ে পালানোর চেষ্টা করছিল, তখন সৈন্যদের অতিরিক্ত ওজনে বরফ ভেঙে যায়। হাজার হাজার ইলখানি মঙ্গল সৈন্য তেরেক নদীর বরফশীতল পানিতে ডুবে মারা যায়। হালাকু খান নিজে কোনোমতে প্রাণ বাঁচিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যান।যুদ্ধের পর শহীদ ও নিহত সৈন্যদের লাশ দেখে গভীর আফসোস ও বেদনার সাথে বারকে খান ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছিলেন:"আল্লাহ হালাকুকে লজ্জিত করুন, যে মঙ্গলদের কেদিয়ে মঙ্গলদেরই হত্যা করালো! যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকতাম, তবে পুরো পৃথিবী জয় করতে পারতাম..."মুসলিম বিশ্বের রক্ষাকবচ বারকে খানতেরেক নদীর এই যুদ্ধ ছিল ইতিহাসে মঙ্গল বাহিনীদের তৃতীয় বড় পরাজয়। এর আগে জালালুদ্দিন খারেজমশাহ এবং ম্যামলুক সুলতান কুতুজ (আইন জালুতের যুদ্ধে) মঙ্গলদের পরাজিত করেছিলেন। কিন্তু বারকে খানের কাছে এই পরাজয় হালাকু খানের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। হালাকু খান আইন জালুতের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বারকে খানের অবিরাম আক্রমণের কারণে তাকে আজারবাইজান সীমান্তেই ব্যস্ত থাকতে হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পুনরায় অগ্রসর হওয়ার স্বপ্ন চিরতরে বিলীন হয়ে যায়।১২৬৫ সালে হালাকু খানের মৃত্যুর পর তার পুত্র আবাকার সাথেও বারকে খানের সংঘাত অব্যাহত থাকে। ১২৬৬ সালে কুর নদীর তীরে সৈন্য পরিচালনা করার সময় এই মহান মুসলিম শাসক ও বীর যোদ্ধা ইন্তেকাল করেন। ঐতিহ্যগত মঙ্গল প্রথা অনুসারে তার দেহ রাজধানী সারাইতে এনে সমাহিত করা হয়।বারকে খানের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ও ইসলাম গ্রহণের ফলে পুরো কিপচাক স্তেপ অঞ্চলে হাজার হাজার মঙ্গল ও কিপচাক তুর্কি দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে। তিনি কেবল সাম্রাজ্য বিস্তার করেননি, বরং সাম্রাজ্যের ভেতরে অসংখ্য মসজিদ ও কুরআন শিক্ষার জন্য মাদ্রাসা নির্মাণ করেছিলেন এবং আলেম ও সুফিদের সম্মানজনক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেছিলেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ