গাজায় ত্রাণের কার্টন দিয়ে শিশুদের জন্য রমজান ফানুস বানাচ্ছেন ফিলিস্তিনি নারী
ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা ও কঠোর অবরোধে বিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় জীবনযাপন প্রতিদিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। ধ্বংসস্তূপ আর শরণার্থী শিবিরের মাঝেও রমজানের আনন্দ ধরে রাখতে এক অনন্য মানবিক উদ্যোগ নিয়েছেন ফিলিস্তিনি নারী রেহান শুররাব। ত্রাণ সহায়তার বাক্স থেকে পাওয়া কার্টন দিয়ে তিনি বানাচ্ছেন রমজান ফানুস, যাতে অন্তত শিশুদের মুখে একটু হাসি ফোটে।গাজা উপত্যকার দক্ষিণাঞ্চলীয় খান ইউনুস শহরের মাওয়াসি এলাকায় বসবাসকারী ৩২ বছর বয়সী রেহান শুররাব হাজারো বাস্তুচ্যুত গাজাবাসীর একজন। ইসরায়েলি হামলায় ঘরবাড়ি হারিয়ে তিনি বর্তমানে পরিবারের সঙ্গে একটি তাঁবুতে বসবাস করছেন। অব্যাহত সামরিক আগ্রাসন ও দীর্ঘদিনের অবরোধের কারণে খাদ্য, জ্বালানি, নির্মাণসামগ্রীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সংকট চরমে পৌঁছেছে।এই কঠিন বাস্তবতায় গাজায় প্রবেশ করা সীমিত সংখ্যক ত্রাণ সহায়তার বাক্স থেকে পাওয়া কার্টন অনেক পরিবারের জন্য বেঁচে থাকার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণে পরিণত হয়েছে। রেহান শুররাব সেই কার্টনগুলো দিয়েই তৈরি করছেন রমজানের ফানুস, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবেশে শিশুদের জন্য রমজানের আনন্দ ও ধর্মীয় আবহ টিকিয়ে রাখছে।আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শুররাব বলেন, “রমজান আমাদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস। সবকিছু হারালেও আমরা এই মাসের আত্মিক সৌন্দর্য ধরে রাখতে চাই।” তিনি জানান, আগে কাঠ দিয়ে ফানুস বানালেও যুদ্ধের কারণে এখন কাঠ বা অন্যান্য উপকরণ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই আশপাশে যা পাওয়া যায়, সেটাই কাজে লাগাতে হচ্ছে।তিনি আরও বলেন, আগে এক শেকেলে যে উপকরণ পাওয়া যেত, এখন তার দাম তিন থেকে পাঁচ শেকেল পর্যন্ত বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। তবুও ত্রাণের কার্টনগুলোকে কাজে লাগিয়ে তিনি ছোট-বড় নানা আকারের ফানুস তৈরি করছেন।কার্টন ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাঁকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয় বলে জানান শুররাব। তাঁর ভাষায়, “কার্টনটা সন্তানদের জন্য রাখব, রান্নার কাজে ব্যবহার করব, নাকি ফানুস বানাব—এই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে খুব দ্বিধায় পড়তে হয়।” তবুও তিনি শিশুদের হাসিকেই প্রাধান্য দেন।এই ফানুসগুলো তিনি তাঁবু শিবিরের আশপাশের রাস্তা সাজাতে ও শিশুদের মধ্যে বিতরণ করেন। তাঁর মতে, এসব ছোট উদ্যোগই শিশুদের মনে রমজানের আনন্দ ও আশা জাগিয়ে তোলে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর কাজের ছবি ও ভিডিও শেয়ার করেন, সেখান থেকে পাওয়া অল্প কিছু অর্ডার তাঁকে মানসিক ও আর্থিকভাবে টিকে থাকতে সহায়তা করছে।শুররাব বলেন, যুদ্ধ তাঁর জীবন সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। তিনি ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র ও আগের স্বাভাবিক জীবন হারিয়েছেন। পরিবার নিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় আশ্রয় নিতে হয়েছে, সঙ্গে নেওয়ার মতো কিছুই ছিল না। রমজানের জন্য আগে জমিয়ে রাখা সাজসজ্জাও রেখে আসতে বাধ্য হয়েছেন।প্রায় পাঁচ বছর ধরে ফানুস তৈরির কাজ করছেন শুররাব। প্রথমে সন্তানের আবদারে শুরু হলেও পরে এটি তাঁর জীবিকার অংশ হয়ে ওঠে। একসময় কাঠ দিয়ে ফানুস ও রমজানের টেবিল তৈরি করলেও যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ ছিল। নিরাপত্তা পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলে তিনি আবার কাজ শুরু করেন, যদিও এ বছর সীমিত উপকরণের কারণে উৎপাদন খুব কম।ছোট ফানুস শিশুদের জন্য এবং বড়গুলো দোকান ও মসজিদের জন্য তৈরি করেন তিনি। সব কিছুর মাঝেও তাঁর কণ্ঠে দৃঢ় প্রত্যয়, “আমরা অনেক কিছু হারিয়েছি, কিন্তু আশা হারাইনি। সব হারালেও আমরা এখনও দাঁড়িয়ে আছি। রমজানকে স্বাগত জানানো থেকে আমরা কখনো পিছপা হব না।”