যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জয়ের পর ওয়াশিংটনের ইরান নীতিতে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে—এমন ধারণা করাকে ‘মারাত্মক ভুল’ বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি। বুধবার প্রকাশিত এক লিখিত বার্তায় তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, রাজনৈতিক ক্ষমতা বদল বা আপস করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার শত্রুভাবাপন্ন নীতি পরিবর্তন করা অসম্ভব। একইসঙ্গে নতুন করে আগ্রাসন চালানো হলে যুদ্ধের ভয়াবহতা ও ব্যাপ্তি বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে বলেও ওয়াশিংটন ও তেল আবিবকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস) ও সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা জয়লাভের পর মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রার বাড়তি খরচ, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতি এবং জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেওয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে আমেরিকানদের অসন্তোষই এই নির্বাচনী ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের মতে, সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন কাঠামোর অভ্যন্তরীণ দলীয় পরিবর্তনের ফলে তেহরানের প্রতি তাদের বৈরিতা কমার কোনো সুযোগ নেই।নিজের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বার্তায় ৫৭ বছর বয়সী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি বলেন, “যারা এখনও মনে করেন যে ক্ষমতালোভী মার্কিন ব্যবস্থার আচরণ কোনো দলীয় বা উপদলীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে বদলে যাবে, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড় দিয়ে তাদের শত্রুতা থেকে বিরত রাখা সম্ভব—তারা চরম ভুল ধারণার মধ্যে বাস করছেন।”তিনি আরও যোগ করেন, “যদি এই ধরনের আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে যুদ্ধের পরিধি আরও বহু গুণে বিস্তৃত হবে।”চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা ঘটে, যাতে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শহীদ হন। পরবর্তীতে মার্চ মাসে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণে তিনি জনসমক্ষে না এসে মূলত লিখিত বার্তার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় দিকনির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত পৌঁছে দিচ্ছেন।অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটদের জয়ে মার্কিন নাগরিকদের যুদ্ধবিরোধী মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় যুক্ত ইরানের প্রধান সমন্বয়ক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, “বিবেক কিংবা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি—কারণ যা-ই হোক, মার্কিন জনগণ স্পষ্ট ভাষায় ‘যুদ্ধকে না’ বলেছে এবং আমরা এই বার্তাকে সমর্থন করি।” একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করে দেন যে, “মার্কিন সরকার যদি আন্তর্জাতিক ব্ল্যাকমেইলার ও অর্থদাতাদের স্বার্থে জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে, তবে তারা বুঝতে পারবে যে ইরানের ‘না’ শব্দটির অর্থ তাদের জন্য চরম দুঃস্বপ্ন নিয়ে আসবে।”ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি এজেই-ও এই নির্বাচনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ট্রাম্প সামরিক ও রাজনৈতিক—উভয় ক্ষেত্রেই পরাজিত হয়েছেন এবং ইরান তার ওপর আরও বড় পরাজয় চাপিয়ে দিতে সক্ষম।কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা চললেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব ফের ইরানে হামলার হুমকি দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের স্পষ্ট বার্তা প্রমাণ করে যে, অভ্যন্তরীণ চাপ বা বহিরাগত হুমকির মুখে তেহরান নিজেদের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস করতে নারাজ।