নিজের জন্মভূমিতেই নির্মূল হচ্ছে ফিলিস্তিনি জনগণ: জাতিসংঘের অধিবেশনে মাহমুদ আব্বাস
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞার কারণে সশরীরে উপস্থিত হতে না পেরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভাষণ দিয়েছেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। ২৪ সেপ্টেম্বর বিশ্বমঞ্চে প্রদত্ত এই ভাষণে তিনি ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসন, অবৈধ বসতি স্থাপনকারী উগ্রপন্থীদের বর্বরতা এবং পশ্চিমাদের দ্বিমুখী নীতির কঠোর সমালোচনা করেন। আব্বাস সতর্ক করে বলেন, গাজা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের নিজেদের জন্মভূমি থেকে চিরতরে মুছে ফেলার যে পরিকল্পনা চলছে, তা ১৯৪৮ সালের 'নকবা' বা মহা-বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। ইসরায়েলকে অব্যাহতভাবে অস্ত্র সরবরাহ ও বিশ্বশক্তির নীরবতার বিরুদ্ধে তিনি জাতিসংঘকে অবিলম্বে জোরালো ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান।জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঐতিহাসিক ও কঠোর বার্তা উপস্থাপন করেছেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো মার্কিন প্রশাসন ফিলিস্তিনি প্রতিনিধি দলকে ভিসা দিতে অস্বীকার করায় ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপকে 'বেআইনি, শাস্তিমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত' বলে অভিহিত করেন তিনি।বিশ্বনেতাদের উদ্দেশ্যে আব্বাস বলেন, 'ফিলিস্তিনিদের বেঁচে থাকার সব মৌলিক ভিত্তি আজ ইসরায়েলি আগ্রাসনে ধ্বংস হয়ে গেছে। পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে, আর পবিত্র শহর জেরুজালেমকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর প্রত্যক্ষ সুরক্ষায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী বসতি স্থাপনকারীরা প্রতিদিন ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালাচ্ছে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে এবং তাদের ভূখণ্ড দখল করছে।''নতুন নকবার' পূর্বাভাস ও বৈশ্বিক নীরবতার প্রতিবাদ১৯৪৮ সালের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, 'আমরা আজ আরও বড় এক বিপদের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদকে বহুবার সতর্ক করা সত্ত্বেও ইসরায়েলি নীতি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে চলেছে। পশ্চিম তীর, গাজা ও পূর্ব জেরুজালেমে যা ঘটছে, তা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমিতে জীবনযাপন অসম্ভব করে তুলে তাদের বিতাড়িত করার একটি পরিকল্পিত নীলকশ। আমরা নতুন করে কোনো 'নকবা' বা জাতিগত উচ্ছেদ হতে দেব না।'তিনি বিশ্বশক্তির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, 'কতদিন ধরে কিছু রাষ্ট্র ইসরায়েলি বর্বরতার সামনে এভাবে নীরব থাকবে? যে অস্ত্র ব্যবহার করে আমাদের শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে, সেই অস্ত্র তাদের হাতে তুলে দেওয়া বন্ধ হবে কবে? গাজা ও পশ্চিম তীরের এই নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয় দেখেও বিশ্ববিবেক নিশ্চুপ।'শান্তি প্রস্তাব ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের দাবিযুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফার শান্তি পরিকল্পনা এবং গাজা সংকটের দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছিলেন উল্লেখ করে আব্বাস বলেন, 'আমরা যেকোনো শান্তি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছি যাতে গাজায় আগ্রাসন থামে এবং দখলদার বাহিনী পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু বাস্তবে ইসরায়েলি আগ্রাসন থামেনি। কাগজের চুক্তি কাগজে রয়ে গেছে, আর বাস্তবে শিশুদের প্রাণহানি অব্যাহত রয়েছে। অবিলম্বে সময়সীমাবদ্ধ রাজনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।'তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'গাজা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম নিয়ে একটিই নীতি প্রযোজ্য হবে—'এক রাষ্ট্র, এক সরকার, এক আইন এবং এক বৈধ সশস্ত্র বাহিনী'। ফিলিস্তিনের জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেই এই ভূখণ্ড পরিচালনা করতে হবে।'ধর্মীয় স্থানসমূহের সুরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ সংস্কারআল-আকসা মসজিদসহ মুসলিম ও খ্রিস্টানদের পবিত্র স্থানগুলোতে ইসরায়েলি উগ্রপন্থীদের অব্যাহত হামলার তীব্র নিন্দা জানান আব্বাস। এটি কেবল ধর্মীয় স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন নয়, বরং পুরো অঞ্চলকে একটি বড় ধরনের ধর্মীয় ও জাতিগত সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে সতর্ক করেন তিনি। একই সাথে জাতিসংঘের উনরোয়া (UNRWA) সহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাকে অবরুদ্ধ ও আক্রমণ করার ইসরায়েলি চক্রান্ত রুখে দেওয়ার আহ্বান জানান।অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আব্বাস জানান, ইউনেস্কোর (UNESCO) সহায়তায় শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। জাতীয় পরিচয় ও শান্তিকেন্দ্রিক শিক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। আগামী ২৮ নভেম্বর ফিলিস্তিনের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে, যার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল কাউন্সিলসহ সব জাতীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠিত হবে।আমরা আমাদের মাটিতেই থাকববিশ্বমঞ্চ থেকে মাহমুদ আব্বাস সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে বলেন, 'ফিলিস্তিনি জনগণ নিজেদের পবিত্র মাটি ছেড়ে কখনো যাবে না। সাময়িক সামরিক দখলদারিত্ব, অবৈধ বসতি কিংবা উগ্র সন্ত্রাসবাদ কোনো সমাধান আনবে না—এগুলোই মূল সমস্যা। দখলদার সরকারের আমাদের প্রতিনিধিত্ব করার বা আমাদের ভাগ্য নির্ধারণের কোনো অধিকার নেই।'তিনি আরও বলেন, '১৯৮৮ সালে আমাদের নেতৃবৃন্দ আন্তর্জাতিক বৈধতার ভিত্তিতে দুই-রাষ্ট্র সমাধানের কঠিন কিন্তু ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আজ বিশ্বের ১৬০টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। যারা এখনো স্বীকৃতি দেয়নি, তাদের প্রতি আমাদের আহ্বান—অবিলম্বে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে পূর্ণ স্বীকৃতি দিন এবং জাতিসংঘে আমাদের পূর্ণ সদস্যপদ নিশ্চিত করুন।'উপসংহারে তিনি ফিলিস্তিনের অকুতোভয় জনগণের উদ্দেশ্যে বলেন, 'আপনারা পৃথিবীর বুকে গৌরব ও মর্যাদার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। নিজ মাতৃভূমি না ছেড়ে আপনারা অধিকারের ওপর অটল রয়েছেন। আমরা যেকোনো মূল্যে আমাদের স্বাধিকার রক্ষা করব এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবই।'
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৩ পিএম