ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ের মালাড ওয়েস্টে অবস্থিত খ্যাতনামা শপিং মল ‘ইনঅরবিট’-এ মুসলিম দর্শনার্থী ও কর্মীদের জন্য নির্ধারিত একটি নামাজ ঘর উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর প্রতিবাদের জের ধরে বন্ধ ও ভাঙচুর করার ঘটনা ঘটেছে। সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক আইন মেনে তৈরি ও পরিচালিত শপিং মলে ধর্মীয় অনুভূতির ওপর এহেন আক্রমণ এবং পরবর্তীতে প্রশাসনিক নীরবতা স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।ঘটনার সূত্রপাত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিওর মাধ্যমে। ভিডিওতে দেখা যায়, হিজাব পরিহিত দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণী ইনঅরবিট মলের ভেতরের নামাজ ঘরটির একটি ইতিবাচক পরিচিতি তুলে ধরছেন। তারা স্থানটিকে অত্যন্ত চমৎকার ও সুসজ্জিত হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে নারী ও পুরুষদের জন্য পৃথক প্রার্থনার ব্যবস্থা এবং অজুখানা (পবিত্রতার জন্য হাত-মুখ ধোয়ার স্থান) বিদ্যমান। তারা মলে আগত মুসলিম দর্শনার্থীদের ওয়াক্তমতো নামাজ আদায় করার আহ্বান জানান।তবে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পরপরই এটি ভারতের ডানপন্থী ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর নজরে আসে। তারা শপিং মলের মতো একটি সার্বজনীন স্থানে মুসলিমদের জন্য প্রার্থনার জায়গা থাকাকে 'নরম পন্থায় ইসলামী এলাকা গড়ে তোলা' এবং 'মুম্বাইকে পাকিস্তান বানানোর চক্রান্ত' বলে বিভ্রান্তিকর প্রচার চালাতে থাকে।হিন্দুত্ববাদী জোট ‘সকাল হিন্দু সমাজ’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) ভিডিওটি শেয়ার করে উসকানিমূলক মন্তব্য করে। তারা লেখে— 'মুম্বাইয়ের মালাড এলাকার ইনঅরবিট মলে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্য গোপন মসজিদ বা নির্দিষ্ট ঘর তৈরি করা হয়েছে, যেখানে সব ধর্মের মানুষ যাতায়াত করে।' তারা আরও দাবি করে যে, মলটি ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের স্মৃতিবিজড়িত পুণ্যভূমিতে অবস্থিত, তাই সেখানে হিন্দুদের ধর্মীয় অনুভূতি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। সংগঠনটির কর্মীরা মলে উপস্থিত হয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং অবিলম্বে স্থানটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার দাবি তোলে।গত ৩১ অক্টোবর সকাল হিন্দু সমাজ তাদের এক্স পেজে আরেকটি ‘বিফোর অ্যান্ড আফটার’ (আগে ও পরের) ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করে যে, তাদের প্রতিবাদের মুখে নামাজ ঘরটি পুরোপুরি ধ্বংস ও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রকাশিত নতুন ভিডিওতে ঘরের ভেতরের টাইলস ভাঙা এবং আসবাবপত্র সরিয়ে ফেলা অবস্থায় দেখা যায়। ক্যাপশনে তারা লিখেছিল: 'প্রতিবাদের মুখে মুম্বাইয়ের ইনঅরবিট মলের ভেতরে থাকা গোপন মসজিদটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে'ইনঅরবিট মল ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত মুম্বাইয়ের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ শপিং মল, যা 'কে রাহেজ গ্রুপ' পরিচালনা করে থাকে। এই বাণিজ্যিক কেন্দ্রে প্রতিদিন হাজার হাজার দেশি-বিদেশি ক্রেতা ও দর্শনার্থী আগমন করেন। শপিং মলটিতে কেবল মুসলিম নয়, অন্যান্য ধর্মীয় বিশ্বাসের মানুষের জন্য ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে শান্তিকক্ষ বা মাল্টি-ফেইথ প্রেয়ার রুম রাখা একটি সাধারণ বাণিজ্যিক চর্চা।ইতোমধ্যে ভারতের প্রধান প্রধান শহরের শপিং মল, বিমানবন্দর ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক হাবগুলোতে (যেমন: দিল্লি, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু এবং আন্তর্জাতিকভাবে ইউএই, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে) এ ধরনের সার্বজনীন বা নির্দিষ্ট প্রার্থনা কক্ষ অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে গণ্য হয়। ভারতীয় আইন অনুযায়ী কোনো সরকারি বা বাণিজ্যিক স্থানকে অনুমোদন ছাড়া স্থায়ী ধর্মীয় উপাসনালয়ে রূপান্তর করা নিষিদ্ধ হলেও, নিজস্ব গ্রাহকদের সুবিধার জন্য সাধারণ প্রার্থনা কক্ষ বরাদ্দ রাখা সম্পূর্ণ বৈধ ও মলের নিজস্ব নীতির এখতিয়ারভুক্ত।