যুদ্ধবিরতিতেও ফিলিস্তিনিদের দেখামাত্র গুলি করে হত্যার নির্দেশ ছিল: রোমহর্ষক স্বীকারোক্তি
গাজা উপত্যকায় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ভয়াবহ গণহত্যার অংশীদার খোদ ইসরাইলি তোপের মুখে থাকা সেনারাই এবার মুখ খুলতে শুরু করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ইসরাইলি সেনা চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি দিয়ে জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও তথাকথিত 'ইয়েলো লাইন' বা হলুদ সীমান্তের কাছাকাছি আসা যে কোনো ফিলিস্তিনিকে সরাসরি গুলি করে হত্যার স্পষ্ট নির্দেশ ছিল তাদের ওপর। গাজায় যা ঘটেছে তা কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করা এক নির্মম 'অরণ্য রাজত্ব' বা জঙ্গল আইনের শামিল বলে তারা উল্লেখ করেছেন।২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরাইল যে পদ্ধতিগত গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে আসছে, তার ভেতরের নির্মম ও বিশৃঙ্খল চিত্র এবার উন্মোচন করেছেন খোদ ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর (আইডিএফ) দায়িত্বে থাকা সেনারা। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (AP) কাছে দেওয়া একাধিক গোপন সাক্ষাৎকারে তারা স্বীকার করেছেন যে, গাজায় তথাকথিত 'যুদ্ধবিরতি' ছিল মূলত একটি তামাশা।ক্ষোভ ও অনুশোচনা থেকে সেনাদের মুখ খোলাখবরের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানের সম্মুখভাগে দায়িত্ব পালন করা এই সেনারা গণমাধ্যমের সামনে এসেছেন। গাজায় নিজেদের চোখে দেখা নির্মম বর্বরতা ও অমানবিক কর্মকাণ্ডের প্রতি গভীর ক্ষোভ ও অনুশোচনা থেকেই তারা এই সত্য বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেন।তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গাজায় পরিচয় নিশ্চিত না হয়েই নির্বিচারে ফিলিস্তিনিদের নিশানা করা হতো। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যেখানে ইসরাইলি বাহিনীর একাংশের কাছে ফিলিস্তিনিদের হত্যা করা একটি ডাল-ভাত বা অতি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। এমনকি অনেক সেনা ফিলিস্তিনিদের হত্যা করার পর বিকৃত আনন্দ প্রকাশ করত।সাক্ষাৎকার দাতা সেনারা জানান, গাজা উপত্যকায় দায়িত্বরত ইসরাইলি বাহিনীর ভেতরে তীব্র "অরাজকতা ও চরম বিশৃঙ্খলা" বিরাজ করছিল। বিশেষ করে 'ইয়েলো লাইন' (সীমান্তবর্তী সংবেদনশীল অঞ্চল) বা হলুদ রেখার আশেপাশে যুদ্ধক্ষেত্রের নিয়মকানুন (Rules of Engagement) নিয়ে সাধারণ সেনাদের মধ্যে ছিল চরম অস্পষ্টতা।সেনারা আরও জানান, মাঠপর্যায়ের কিছু কমান্ডার মুখে ও জনসমক্ষে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার ভন্ডামি দেখালেও, আড়ালে এবং ব্যক্তিগত কথাবার্তায় গাজায় যুদ্ধ ও হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতেন। এমন একটি ঘটনার বিবরণ দিয়ে তারা বলেন, এক যুদ্ধবিরতির সময় ইসরাইলি সেনাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের একটি গাড়িকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয় এবং গাড়ির ভেতরে থাকা সবাইকে হত্যা করা হয়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ঘাতক সেনাদের বাকি সহকর্মীরা অভিনন্দন জানায় এবং তারা সম্মিলিতভাবে উৎসবে মেতে ওঠে।গাজায় যুদ্ধবিরতি বলে যা চালানো হচ্ছে, তা একটি তামাশা বৈ কিছু নয়ফিলিস্তিনিদের হত্যা করার পর এমন পৈশাচিক উৎসব বা উদযাপনে মেতে ওঠা ইসরাইলি সেনাদের একটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। বিশেষ করে ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর থেকে এই প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পায়।এপি-র সাথে আলাপকালে মাত্র ২০ বছর বয়সী এক ইসরাইলি তরুণ সেনা বলেন:"আমি নিজে এমন সেনাদের দেখেছি যারা ইয়েলো লাইন অতিক্রম করা বা তার কাছাকাছি আসা যে কোনো ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যা করতে চরম আনন্দ পেত। গাজার পুরো পরিস্থিতি তখন একটি হিংস্র বনের মতো রূপ নিয়েছিল। যুদ্ধবিরতির পর আমাদের দেওয়া নির্দেশনা ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার: এই সীমান্ত রেখা যে কেউ স্পর্শ বা অতিক্রম করার চেষ্টা করবে, তার ওপর সরাসরি প্রাণঘাতী গুলি চালাও।"ওই সেনারা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, "গাজা উপত্যকায় 'যুদ্ধবিরতি' শব্দটা আসলে একটা বড় রসিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়।"অজ্ঞাত পরিচয়ে চোখের সামনে ফিলিস্তিনিদের হত্যার দৃশ্যঅবশ্য এই সমস্ত গুরুতর অভিযোগের বিপরীতে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে একটি সাফাই বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। এপি-কে দেওয়া ওই বিবৃতিতে তারা দাবি করে, গাজার ইয়েলো লাইন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা এবং সেখানে সতর্কবার্তা সম্বলিত সাইনবোর্ড রয়েছে। ফিলিস্তিনিরা কেবল লাইনের কাছে আসলেই তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয় না, বরং "সরাসরি কোনো হুমকি বা বিপদের আশঙ্কা থাকলে" তবেই সেনারা গুলি চালাতে পারে।তবে সেনাদের একজন এই দাবি সরাসরি নাকচ করে বলেন, "ইসরাইলি সেনারা অধিকাংশ সময় অনেক দূরবর্তী নিরাপদ অবস্থানে বসে থাকতো এবং তারা কার ওপর গুলি চালাচ্ছে তার পরিচয় নিশ্চিত না করেই দূর থেকে সরাসরি নিশানা বানাতো।" গাজার হলুদ রেখা থেকে মাত্র কয়েকশো মিটার দূরত্বে ডিউটি করা অন্য এক সেনা বলেন, "আমি নিজের চোখে ইয়েলো লাইন অতিক্রমের চেষ্টা করা বেশ কয়েকজন সাধারণ ফিলিস্তিনিকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করতে দেখেছি।" শুধু তাই নয়, মাঠপর্যায়ের সেনারা গাজায় বিমান বা ভারী কামানের বোমা হামলার জন্য কোনো নিশ্চিত তথ্য ছাড়াই কেবল নিজেদের অনুমান ও অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে স্থানাঙ্ক (Coordinates) বা লোকেশন পাঠিয়ে দিত।যেকোনো মূল্যে নিশ্চিহ্ন করোউর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশের কথা উল্লেখ করে এক সেনা জানান, হলুদ রেখার কাছে আসা যে কোনো ব্যক্তির জন্য ইসরাইলি ফোর্সের কাছে নির্দেশ ছিল— "মূল্য যাই হোক না কেন, তাদের পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন বা খতম করে দাও।" যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরেও মাঠপর্যায়ের সেনাদের একই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, "যেকোনো মূল্যে ইয়েলো লাইন রক্ষা করো।"আরেক ইসরাইলি সেনা দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, "গাজা উপত্যকায় নিয়োজিত ইসরাইলি বাহিনীর পুরো কাঠামোর মধ্যে মানুষের জীবনের আসলে কোনো মূল্যই ছিল না। প্রথম প্রথম স্নাইপাররা (দূরপাল্লার বন্দুকধারী) লাইনের দিকে আসা লোকেদের সতর্ক করতে ফাঁকা আওয়াজ বা পায়ের কাছে গুলি করতো। কিন্তু পরবর্তীতে ওপর থেকে নির্দেশ আসে— 'নিজেদের সুরক্ষায় তোমাদের আরও কঠোর ও চূড়ান্ত হতে হবে।' এই নির্দেশের অর্থই দাঁড়ায় হলুদ লাইনের কাছে আসা যে কাউকে সরাসরি বুক বা মাথায় প্রাণঘাতী গুলি করা।"বাস্তবতার নিরিখে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই সেনারা অকপটে স্বীকার করেছেন যে, গাজা উপত্যকায় প্রকৃত অর্থে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। তাদেরই একজন শেষ মন্তব্য করেন, "আমাদের এখন থেকে 'যুদ্ধবিরতি' শব্দটা ব্যবহার করাই বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কারণ এই শব্দটা আসলে যারা সত্যিই যুদ্ধ শেষ করতে চায়, তাদের কোনো কাজেই আসছে না, বরং বিশ্বকে এক চরম অন্ধকারে রাখছে।"