ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন মুসলিম শিক্ষার্থীকে মধ্য কলকাতায় প্রকাশ্যে উগ্র হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থীরা শারীরিক নিগ্রহ, সাম্প্রদায়িক গালিগালাজ এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ক্লাস শেষে বাসায় ফেরার পথে তালতলা মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় এই নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটে। ঐতিহ্যবাহী পোশাক, দাড়ি ও টুপি পরায় চরমপন্থীরা শিক্ষার্থীদের ‘জিহাদি’ ও ‘জঙ্গি’ বলে আখ্যা দেয়। মারাত্মক অপরাধের ঘটনা জানালেও পুলিশ মামলা (এফআইআর) নথিভুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানী কলকাতায় আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের তিন শিক্ষার্থী হিন্দুত্ববাদী উগ্রপন্থীদের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের শিকার হয়েছেন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর দুপুর আনুমানিক ২টা ৪০ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের তালতলা ক্যাম্পাস থেকে শিয়ালদহ রেলস্টেশনে যাওয়ার পথে জিডি হাসপাতাল ও ডায়াবেটিস ইনস্টিটিউটের কাছে লেনি সরণিতে এই ঘটনা ঘটে।হামলার শিকার শিক্ষার্থীরা হলেন—২৪ বছর বয়সী মোহাম্মদ আশিক বিল্লাহ, ২৩ বছর বয়সী মুজিম হোসেন এবং ২৪ বছর বয়সী হাসানুর জামান। তারা তিনজনই নিয়মিত চার ঘণ্টার দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে হাসনাবাদ লোকাল ট্রেনে আসা-যাওয়া করেন।শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, সাদা-কালো রঙের স্কুটারে আসা ৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী দুই ব্যক্তি তাদের গতিরোধ করে অহেতুক তর্ক শুরু করে। হামলাকারীদের একজনের পরনে ছিল শর্টস ও গেঞ্জি এবং অন্যজনের পরনে ছিল ট্রাউজার ও টি-শার্ট। উভয়ের কপালে গেরুয়া তিলক আঁকা ছিল। প্রাথমিক অবস্থায় শিক্ষার্থীরা কোনো ঝামেলায় না জড়িয়ে এগিয়ে যেতে চাইলেও, ওই ব্যক্তিরা পিছু ধাওয়া করে গালিগালাজ শুরু করে।একপর্যায়ে উগ্রপন্থীরা শিক্ষার্থীদের পোশাক, দাড়ি ও মাথার টুপি লক্ষ্য করে ‘জিহাদি’ ও ‘জঙ্গি’ বলে চেঁচাতে থাকে। শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানালে ও নিজেদের ছাত্র পরিচয় দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলে এক হামলাকারী আশিককে সজোরে থাপ্পড় মারে। এরপর দুজনেই শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয়, এলোপাতাড়ি মারধর করে এবং জামাকাপড় ছিঁড়ে ফেলে। এক হামলাকারী আশিককে পাশের একটি গলিতে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে বাকি দুজন বাধা দেন, তখন মুজিমকেও মারধর করা হয়। মারধরের তীব্রতায় আশিক মাথা ঘুরে পড়ে যান এবং হাসানুরের মুখে প্রচণ্ড ঘুষি মারা হলে তার দাঁতের মাড়ি থেকে রক্তপাত শুরু হয়। সে সময় তাদের প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়।বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রতিনিধি মোহাম্মদ মতসিম বিল্লাহ জানান, কেবল মুসলিম হিসেবে দৃশ্যমান পোশাক ও পরিচয়ের কারণেই তাদের ওপর এই পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া এই এলাকায় এর আগেও মুসলিম নারী শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে ‘মোল্লা’ ও ‘জিহাদের সন্তান’ বলে ইসলামোফোবিক মন্তব্য করার অভিযোগ রয়েছে।পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক ভূমিকাঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা পর ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা সাতজন সহপাঠীকে নিয়ে তালতলা থানায় যান। তবে কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট (এফআইআর) নথিভুক্ত না করে কেবল একটি সাধারণ লিখিত অভিযোগ জমা দিতে বলেন। শিক্ষার্থীরা অপরাধীদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার দাবি জানালেও পুলিশ তৎপরতা দেখায়নি।ঘটনার সময় আরও চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যখন অভিযুক্তদের একজন সরাসরি থানায় এসে উপস্থিত হয় এবং আশিককে উদ্দেশ্য করে হুমকি ও ভীতি প্রদর্শন করতে থাকে। কিন্তু পুলিশ কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে ওই ব্যক্তিকে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ ও ‘গাঁজাখোর’ বলে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে।থানার বাইরে স্থানীয় ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এক নেতা শিক্ষার্থীদের এফআইআর দায়ের না করার জন্য ভয় দেখায়। তিনি হুমকি দেন যে, মামলা করলে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে উল্টো কাউন্টার-কেস করা হবে। শিক্ষার্থীরা আর্থিক দিক থেকে দুর্বল পরিবারের হওয়ায় আইনি জটিলতা ও আর্থিক ক্ষতির ভয়ে শেষ পর্যন্ত কোনো এফআইআর দায়ের করতে পারেননি। এ প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত পুলিশ এই ঘটনায় কোনো মামলা নথিভুক্ত করেনি কিংবা কাউকে গ্রেপ্তার করেনি।