ভারতের রাজধানী দিল্লির মুস্তফাবাদ বিধানসভা কেন্দ্রে জীবিত মুসলিম বাসিন্দাদের ‘মৃত’ অথবা ‘স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত’ দেখিয়ে ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়ার এক গুরুতর প্রশাসনিক চক্রান্ত উন্মোচিত হয়েছে। ভারতের জাতীয় দৈনিক ‘দ্য হিন্দু’-র এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মনোনীত বুথ লেভেল এজেন্টরা (বিএলএ-২) নিয়মবহির্ভূতভাবে ফর্ম-৭ জমা দিয়ে বছরের পর বছর একই ঠিকানায় বসবাসকারী মুসলিম নাগরিকদের ভোটার অধিকার কেড়ে নেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত বা খসড়া তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া কেবল ধর্মীয় পরিচয় লক্ষ্য করে এই পদ্ধতিগত জালিয়াতি চালানো হচ্ছে বলে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন।ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মুস্তফাবাদ বিধানসভা কেন্দ্রে মুসলিম ভোটারদের ভোটাধিকার হরণ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়ার এক ভয়াবহ ছক উন্মোচিত হয়েছে। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মনোনীত বুথ লেভেল এজেন্ট (বিএলএ-২) চন্দ্র শেখর নৈনওয়াল একাই ২৮ জন স্থানীয় মুসলিম নাগরিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে কাটার জন্য নির্বাচন কমিশনে আবেদন বা 'ফর্ম-৭' জমা দিয়েছেন। তার অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, এই ব্যক্তিরা হয় মারা গেছেন, না হয় এলাকা ছেড়ে স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে গেছেন। অথচ বাস্তব অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তারা সবাই স্বশরীরে নিজেদের বাড়িতেই বাস করছেন এবং তাদের প্রত্যেকের কাছে বৈধ পরিচয়পত্র রয়েছে।এক পরিবারের একাধিক সদস্যের নাম কাটার অপচেষ্টামুস্তফাবাদের দয়ালপুর এলাকার বাসিন্দা সাজিদ হোসেন গত দুই দশক ধরে সপরিবারে নিজ ভিটায় বসবাস করে আসছেন। হঠাৎ তিনি জানতে পারেন, চন্দ্র শেখর নৈনওয়াল নামের সম্পূর্ণ অপরিচিত এক ব্যক্তি নির্বাচন কমিশনে আবেদন করে তার স্ত্রী আফসানা খাতুন এবং ছেলে আসাদ রেজা জাইদির নাম ভোটার তালিকা থেকে কেটে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বিস্মিত সাজিদ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমার পরিবারে ৮ জন সদস্য এবং আমরা কয়েক দশক ধরে এই একই ঠিকানায় নিবন্ধিত। কীভাবে শুধু আমার স্ত্রী ও ছেলের নাম স্থানান্তরিত হতে পারে? এটি কী ধরণের তামাশা?"সাজিদ হোসেনের প্রতিবেশী আব্দুল জব্বারের মেয়ে আয়েশা ও ২২ বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ হুজাইফার নামও একইভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে। হুজাইফা জানান, তাদের প্রতিবেশী ও স্থানীয় ক্ষুদ্র মুদি দোকানদার উম্মেদ আলীর নামও এই জালিয়াতির তালিকায় তুলে দেওয়া হয়েছে।মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা ও সংখ্যাভিত্তিক জালিয়াতির তথ্যঅনুসন্ধানী প্রতিবেদন মতে, গত ৩১ আগস্ট থেকে মুস্তফাবাদ বিধানসভা কেন্দ্রে মোট ৮৪৩টি আপত্তি বা বাদ দেওয়ার আবেদন (ফর্ম-৭) জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৫৯৭টি আবেদন করেছে তৃতীয় পক্ষ বা বহিরাগত ব্যক্তিরা। চরম উদ্বেগের বিষয় হলো, এই তৃতীয় পক্ষের আবেদনের ৯৬ শতাংশই জমা দিয়েছে বিজেপির বুথ লেভেল এজেন্টরা (বিএলএ)। এর মধ্যে ২৪টি ওয়ার্ড জুড়ে কেবল মুসলিম ভোটারদের লক্ষ্য করে ৫৭২টি ফর্ম-৭ জমা দেওয়া হয়েছে।পোলিং বুথ নম্বর ১২৯-এ জমা পড়া ২৮টি আবেদনের সবকটিই একা বিজেপির বিএলএ চন্দ্র শেখর নৈনওয়াল দিয়েছেন। গত ১৯ অক্টোবর একটি, ২১ অক্টোবর ৯টি এবং ২৫ অক্টোবর ১৮টি আবেদন দিল্লির মুখ্য নির্বাচনী কর্মকর্তার তালিকায় যুক্ত হয়।নির্বাচন কমিশনের (ECI) নিয়ম লঙ্ঘনভারতের নির্বাচন কমিশনের বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী, একজন ভোটার বা বুথ লেভেল এজেন্ট দিনে সর্বোচ্চ ১০টি ফর্ম-৭ জমা দিতে পারেন। তবে বিএলএ-২-দের ক্ষেত্রে যদি তারা অন্য কারও পূরণ করা ফর্ম জমা দেন, তবে তার সাথে যথাযথ তালিকা এবং নিজে যাচাই করেছেন মর্মে একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।মুস্তফাবাদে বিজেপি এজেন্টরা এই আইনের তোয়াক্কা না করে নিজেরাই আবেদনকারী বা ‘অবজেক্টর’ সেজে শত শত ফর্ম জমা দিয়েছে। যেমন:শশী জমা দিয়েছেন ৪২টি ফর্মরমন জমা দিয়েছেন ৩৫টিমনোজ কুমার ও মোহন মদন ৩৩টি করেসওয়ার সিং ৩২টিরাজ কুমার ও হিমাংশু ৩১টি করেকপিল, নিতিন কুমার ও রবিন সিং ধামা ৩০টি করেনীরজ শর্মা ২৯টি এবং অভিষেক মিশ্র ২৮টিনির্বাচনী কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, এসব আবেদনের সাথে বিএলএ-দের কোনো বৈধ ঘোষণা বা অঙ্গীকারনামা জমা দেওয়া হয়নি। এমনকি নিতিন কুমার নামের এক এজেন্টের হাতে লেখা ফর্মে তিনি যে একজন বিএলএ, তারও উল্লেখ ছিল না।ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ভোটাধিকার হরণের আশঙ্কা৭৬ বছর বয়সী প্রবীণ জহীর আলীকেও ফর্ম-৭ ফর্মে ‘মৃত’ দেখিয়ে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। তার স্বজন শামা পারভীন কওমী টাইমসকে প্রতিনিধি সূত্রে জানান, "আমরা আমাদের ধর্মীয় ও মুসলিম পরিচয়ের কারণেই উগ্রপন্থীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছি। আবেদনকারীকে আমরা চিনিও না। এটি মূলত আমাদের ভোটাধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার এক সুপরিকল্পিত চক্রান্ত।"একইভাবে সালমান সিদ্দিকীর ভাই সুলেমান সিদ্দিকী জানান, তারা জন্মসূত্রে এই এলাকার বাসিন্দা এবং ৩০ বছর ধরে এই বাড়িতে থাকছেন। তবুও সালমান, তার বোন শাগুফতা খাতুন এবং ভগ্নিপতি এখলাকের নাম বাতিল তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।ভারতের ‘জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০’ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে মিথ্যা ঘোষণা বা ভুয়া তথ্য দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে বাস্তবে বিজেপি কর্মীদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়া এবং নির্বাচন কমিশনের উদাসীনতায় দিল্লির সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।