সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে করা একটি ভিডিওতে 'আসসালামু আলাইকুম' ও 'ইনশাআল্লাহ' শব্দ ব্যবহারের অপরাধে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের আইপিএস কর্মকর্তা বুশরা বানোকে বদলি করা হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী 'হিন্দু লিগ্যাল ফান্ড'-এর অভিযোগ ও দাবির মুখেই সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) তাকে খড়গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদ থেকে সরিয়ে রাজ্য সশস্ত্র পুলিশের ডেপুটি কমান্ড্যান্ট হিসেবে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ পদে পাঠানো হয়। সিভিল সার্ভেন্টের ধর্মীয় স্বাধীনতা বনাম উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের এই ইস্যুতে ভারতজুড়ে তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়েছে।ভারতে সরকারি পদে আসীন মুসলিম কর্মকর্তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর ক্রমাগত হস্তক্ষেপের আরেকটি দৃষ্টান্ত সামনে এলো। ইউপিএসসি (UPSC) পরীক্ষার প্রস্তুতি ও নিজের সফল জীবনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে করা একটি ভিডিওতে ইসলামী অভিবাদন ব্যবহারের অভিযোগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারের ২০২১ ব্যাচের আইপিএস কর্মকর্তা বুশরা বানোকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।তিনি খড়গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অ্যাডিশনাল এসপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত ১৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি অনুপ্রেরণামূলক ভিডিওতে তিনি তরুণদের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সাফল্যের দিকনির্দেশনা দেন। ভিডিওর শুরুতে তিনি 'আসসালামু আলাইকুম' বলেন এবং বক্তব্যের বিভিন্ন অংশে 'ইনশাআল্লাহ' ও 'জাযাকাল্লাহ' শব্দগুলো ব্যবহার করেন।এরপরই উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন 'হিন্দু লিগ্যাল ফান্ড' পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। সংগঠনটির দাবি, একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত সিভিল সার্ভেন্টের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখা উচিত এবং কথা বলার সময় কেবল 'জয় হিন্দ' বা 'বন্দে মাতরম'-এর মতো জাতীয়তাবাদী বাক্য ব্যবহার করা উচিত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে সংগঠনটি অভিযোগ করে বলে, 'তিনি আসসালামু আলাইকুম দিয়ে শুরু করেছেন, ইনশাআল্লাহ ব্যবহার করেছেন এবং জাযাকাল্লাহ বলে শেষ করেছেন। কিন্তু তিনি কোনো বন্দে মাতরম বা জয় হিন্দ ব্যবহার করেননি।' তারা বুশরা বানোর বিরুদ্ধে তদন্তেরও দাবি জানায়। হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর এই অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের পরপরই রাজ্য সরকার তাকে দ্রুত বদলি করে রাজ্য সশস্ত্র পুলিশের ডেপুটি কমান্ড্যান্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়।প্রতিভাধর আইপিএস বুশরা বানোর সফরউত্তর প্রদেশের কনৌজ জেলায় জন্মগ্রহণ করা বুশরা বানো অত্যন্ত মেধাবী একজন ব্যক্তিত্ব। তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় (AMU) থেকে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজে পিএইচডি সম্পন্ন করেন এবং জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপের (JRF) জন্য ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি টেস্ট (NET) পাস করেন। পরবর্তীতে তিনি সৌদি আরবে একজন সহকারী অধ্যাপক (অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর) হিসেবে কর্মরত ছিলেন।সৌদি আরব থেকে ভারতে ফিরে এসে তিনি ইউপিএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। নিজের এই সাফল্যে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসিডেন্সিয়াল কোচিং একাডেমির (RCA) অসামান্য অবদানের কথা তিনি স্মরণ করেন। ২০১৮ সালে তিনি প্রথমবার ইউপিএসসি পরীক্ষায় সারা ভারতে ২৭৭তম স্থান অর্জন করেন এবং ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ট্রাফিক সার্ভিসে (IRTS) চান্স পান। কিন্তু সে সময় দ্বিতীয় সন্তানের মা হতে চলায় তিনি যোগ দেননি। পরবর্তীতে পরবর্তী বছর আবারও পরীক্ষা দিয়ে ২৩৪তম স্থান অর্জন করে মর্যাদাপূর্ণ ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস (IPS)-এ যুক্ত হন।বুশরা বানোকে ২০২১ ব্যাচের আইপিএস কর্মকর্তা হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি হুগলি গ্রামীণ এলাকার সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং গত জুনে খড়গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে উন্নীত হন। অত্যন্ত দক্ষ ও সৎ অফিসার হিসেবে পরিচিত বুশরা বানোর এই হঠাৎ বদলি স্থানীয় সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। উল্লেখ্য, এই রদবদলের অংশ হিসেবে পার্থ ঘোষকে খড়গপুরের নতুন অতিরিক্ত এসপি এবং শুভেন্দু মণ্ডলকে চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার করা হয়েছে।মানবাধিকার সংস্থা ও সাধারণ মুসলিম সমাজের মতে, ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদের চাপে মুসলিম কর্মকর্তাদের নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় ও সংস্কৃতি প্রকাশের মৌলিক অধিকার সংকুচিত করা হচ্ছে। একজন আইপিএস কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কেবল সালাম ও ইসলামিক বাক্যাংশ ব্যবহারের কারণে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে নিরপেক্ষতার নামে মুসলিমদের কোণঠাসা করার অশুভ চেষ্টার শামিল।