যুক্তরাজ্যে ‘বছরের সেরা সাংবাদিক’ (Journalist of the Year) নির্বাচিত হওয়ার পরও লন্ডনের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারলেন না সুদানি সাংবাদিক মুহাম্মদ আমিন। ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (হোম অফিস) তার ৮ দিনের ভিসা আবেদন রহস্যজনকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। সুদানের যুদ্ধ, মানবিক সংকট এবং আধাসামরিক বাহিনী আরএসএফ (RSF)-এর গণহত্যার বিরুদ্ধে সাহসিকতার সাথে সংবাদ প্রকাশের পুরস্কার হিসেবে এই ভিসা বাতিলকে ব্রিটিশ সরকারের ‘দ্বিমুখী নীতি, বর্ণবাদ ও সেন্সরশিপ’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন আমিন।লন্ডন-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম 'মিডল ইস্ট আই' (MEE)-এর সুদানের স্বাধীন প্রতিনিধি মুহাম্মদ আমিন "২০২৬ ওয়ান ওয়ার্ল্ড মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডস"-এ সুদানের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে অসামান্য প্রতিবেদনের জন্য ‘বছরের সেরা সাংবাদিক’ হিসেবে ভূষিত হন। কিন্তু ট্র্যাজিক বিষয় হলো, যে দেশে তাকে এই সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করা হলো, সেই দেশের সরকারই তার প্রবেশের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। ব্রিটিশ হোম অফিসের এই সিদ্ধান্তের কারণে আমিন সশরীরে উপস্থিত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করতে পারেননি। বাধ্য হয়ে তাকে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে পুরস্কারটি গ্রহণ করতে হয়।ব্রিটিশ সরকারের অজুহাত ও মুসলিম সাংবাদিকদের প্রতি বৈষম্যভিসা প্রত্যাখ্যানের চিঠিতে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, সফর শেষে মুহাম্মদ আমিন নিজ দেশে ফিরে যাবেন—এমন কোনো নিশ্চয়তা তারা পাননি। অর্থাৎ, তিনি যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বর্ণবাদী হোম অফিস। অথচ, এই সফরের সমস্ত খরচ বহন করছিল মিডল ইস্ট আই (MEE) এবং অ্যাওয়ার্ড কমিটির আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্রও সংযুক্ত ছিল। আরও অমানবিক বিষয় হলো, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আপিল বা প্রশাসনিক পর্যালোচনার অধিকারও তাকে দেওয়া হয়নি।এ বিষয়ে আনাদোলু এজেন্সির সাথে আলাপকালে ক্ষোভ প্রকাশ করে মুহাম্মদ আমিন বলেন:"ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্ত স্পষ্ট বৈষম্যমূলক। তারা গ্লোবাল সাউথ এবং আফ্রিকা বা মুসলিম বিশ্বের যেকোনো মানুষকে কেবল সম্ভাব্য 'আশ্রয়প্রার্থী' হিসেবে দেখে। আমি আমার দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও থাকতে চাই না। যুক্তরাজ্য একদিকে সুদানের সংকট নিয়ে বড় বড় আন্তর্জাতিক মানবিক সম্মেলন করে, অন্যদিকে সুদানি সাংবাদিকদের ভিসা দেয় না—এটি ব্রিটিশ সরকারের একটি বড় কেলেঙ্কারি।"পশ্চিমা ভূ-রাজনীতি ও দ্বিমুখী নীতিসাংবাদিক আমিন এটিই প্রথম যুক্তরাজ্যের ভিসার জন্য আবেদন করেননি। এর আগে ২০২২ সালেও তিনি যুক্তরাজ্যে ১১ দিন অবস্থান করেছিলেন। সে সময় সুদান ও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে রাশিয়ার ভাড়াটে সেনা দল 'ওয়াগনার গ্রুপ'-এর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ওপর একটি সাহসী রিপোর্টের জন্য তিনি লন্ডনে 'মার্টিন অ্যাডলার পুরস্কার' গ্রহণ করেন।আমিনের মতে, ২০২২ সালে ওয়াগনার গ্রুপের বিরুদ্ধে তার রিপোর্ট পশ্চিমা ভূ-রাজনীতির পক্ষে ছিল, তাই মাত্র ৩ দিনে তাকে ভিসা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার তার রিপোর্টটি ছিল সুদানের সেনাবাহিনী ও জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত এবং বিদেশী মদদপুষ্ট 'র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস' (HDK/RSF) মিলিশিয়াদের নৃশংসতার বিরুদ্ধে। এই মিলিশিয়ারা সুদানে জাতিগত নিধন ও গণহত্যা চালাচ্ছে। আমিনের ধারণা, পশ্চিমা কোনো কোনো মহলের গোপন এজেন্ডার বিরুদ্ধে যাওয়ায় এবার তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সেন্সরশিপের মুখোমুখি হতে হয়েছে।সুদানীরা কারও বোঝা নয়সুদানের বর্তমান মানবিক বিপর্যয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমিন উল্লেখ করেন, ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সুদানের এই সংকট গাজা সংকটের মতোই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমান সংহতি ও মনোযোগ পাওয়ার যোগ্য।তিনি আরও বলেন, "আমরা মানবতার সমান অংশীদার। সুদানীরা কারও বোঝা নয়। সন্ত্রাসবাদ বা অন্য কোনো অজুহাতে আমাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া অন্যায়। সুদান বিগত ৩০ বছর ধরে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে প্রথম সারিতে লড়াই করেছে। আমরা ব্রিটিশ সরকারের এই মুসলিম ও আফ্রিকা-বিদ্বেষী নীতি পুনর্বিবেচনার দাবি জানাই।"উল্লেখ্য, ব্রিটিশ সরকারের এই মুসলিম ও ভিন্নমতাবলম্বী বিদ্বেষী আচরণ নতুন কিছু নয়। সম্প্রতি তুর্কি-আমেরিকান রাজনৈতিক বিশ্লেষক জেঙ্ক উইগুর এবং জনপ্রিয় ব্রডকাস্টার হাসান পিকারকেও "ইহুদি বিদ্বেষ ছড়ানোর ঝুঁকি" নামক কাল্পনিক অভিযোগে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল ব্রিটিশ হোম অফিস। মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার দাবিদার যুক্তরাজ্যের এই মুখোশ এখন বিশ্ববাসীর কাছে উন্মোচিত।