৭ অক্টোবরের ৩ বছর: ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজা, প্রাণ হারিয়েছেন ৭৫ হাজার ফিলিস্তিনি
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডে ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর চালানো ভয়াবহ ও নৃশংস যুদ্ধ ৩ বছরে পদার্পণ করেছে। এই তিন বছরে ইসরায়েলি গণহত্যা ও নির্বিচার বোমাহামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ৭৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি, যার একটি বড় অংশই শিশু ও নারী। বসতবাড়ি, হাসপাতাল, স্কুল ও মৌলিক অবকাঠামো ধ্বংসের মাধ্যমে একটি পুরো জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে, যার ফলে গাজার ২১ লাখেরও বেশি অধিবাসী চরম মানবিক বিপর্যয়ে দিন কাটাচ্ছেন।গাজা সংকট: ৩ বছরেও থামেনি মানবতার কান্নাআজ বুধবার (৭ অক্টোবর) পূর্ণ হলো ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার টানা ৩ বছর। ৭ অক্টোবরের পর থেকে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর পরিচালিত অভূতপূর্ব গণহত্যামূলক সামরিক অভিযান পুরো অঞ্চলটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। এই দীর্ঘ সময় ধরে চলা নির্বিচার হামলায় মানুষের পাশাপাশি গাজার সার্বিক পরিকাঠামো ও অর্থনীতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। গাজার প্রায় সব ফিলিস্তিনির সাধারণ জীবনে ফিরে আসার ন্যূনতম সক্ষমতাও কাড়িয়া নেওয়া হয়েছে।হৃদয়বিদারক প্রাণহানি ও মানবিক ক্ষতিগাজার চিকিৎসা সূত্রের বরাতে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী (৫ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত), ইসরায়েলি আগ্রাসনে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৪,২৪৩ জনে পৌঁছেছে এবং আহত হয়েছেন ১৭৫,২৩২ জন। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা নিখোঁজদের যুক্ত করলে নিহতের মোট সংখ্যা ৭৫ হাজার ছাড়িয়ে যায়। যদিও ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, তবে তার পরও ইসরায়েলি বাহিনীর ধারাবাহিক যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনে আরও ১,৪৬০ জন ফিলিস্তিনি শহীদ এবং ৫,১১৬ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও ৮৩৬ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।এই নৃশংস গণহত্যার সবচেয়ে বড় শিকার গাজার নিষ্পাপ শিশুরা। গাজার সরকারি তথ্যমতে, গত বছরের জুলাই পর্যন্ত ২১,৫০০ শিশু ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছে। এদের মধ্যে ৫২০ জনেরও বেশি এমন শিশু রয়েছে, যাদের জন্ম হয়েছিল এই চলমান যুদ্ধের সময় এবং জন্মগ্রহণের কিছুদিন পরেই তারা ইসরায়েলি বোমার আঘাতে শহীদ হয়।আবাসন ও পরিকাঠামোর ব্যাপক বিনাশউপগ্রহ চিত্র ও ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন অনুযায়ী, গত ১৬ জুন পর্যন্ত গাজার প্রায় ৮২ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৩৪,৪২২টি ভবন সম্পূর্ণ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং মোট ক্ষতিগ্রস্ত আবাসন ইউনিটের সংখ্যা ৩২৮,৬২৭টি।গাজার চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ১,৮০০টিরও বেশি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ইসরায়েলি হামলায় আংশিক বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। অন্যদিকে, গাজার ৯৮ শতাংশ স্কুল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ৯৩ শতাংশেরই মৌলিক অবকাঠামো নতুন করে পুনর্নির্মাণ বা সার্বিক মেরামত ব্যতিরেকে ব্যবহারের অযোগ্য।মানবেতর বাস্তুচ্যুতি ও দীর্ঘমেয়াদী মানবিক সংকটবর্তমানে গাজার প্রায় ২১ লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনি চরম অমানবিক পরিস্থিতিতে জীবনযাপন করছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৮ লাখ মানুষ বসবাস করছেন বসবাসের অনুপযোগী ও জরাজীর্ণ তাঁবুতে। জরুরি ভিত্তিতে ১৬২,০০০টি তাঁবু পরিবর্তন করা প্রয়োজন। জাতিসংঘ সতর্ক করে জানিয়েছে, আসন্ন শীত মৌসুমে বন্যা ও অতিবৃষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে অস্থায়ী শিবিরে বসবাসকারী প্রায় ২৭৯,০০০ ফিলিস্তিনি।এ ছাড়া, গাজার শিক্ষা ব্যবস্থা থমকে যাওয়ায় প্রায় দুই লাখ শিশু শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত রয়েছে। ধারাবাহিক হামলা ও স্বজন হারানোর ট্রমা বা মানসিক আঘাতে ভুগছে প্রায় ১০ লাখ ফিলিস্তিনি শিশু, যাদের জরুরি ভিত্তিতে মানসিক ও সামাজিক সহায়তা প্রয়োজন।অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও পুনর্নির্মাণের বিশাল চ্যালেঞ্জইসরায়েলি হামলায় গাজার প্রায় ৯২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক কাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে, যার ফলে সেখানে উৎপাদনশীল সকল কর্মকাণ্ড অচল হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, গাজার সার্বিক পুনর্নির্মাণ ও পুনর্দখল প্রক্রিয়ার জন্য আনুমানিক ৭১.৪ বিলিয়ন (৭,১৪০ কোটি) মার্কিন ডলার প্রয়োজন।এর মধ্যে ভৌত অবকাঠামোর প্রত্যক্ষ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৩৫.২ বিলিয়ন ডলার এবং পরোক্ষ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতির পরিমাণ ২২.৭ বিলিয়ন ডলার। মৌলিক পরিষেবা পুনর্বহাল এবং জরুরি জীবন রক্ষাকারী অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের জন্য যুদ্ধের পরবর্তী প্রথম ১৮ মাসেই প্রয়োজন হবে অন্তত ২৬.৩ বিলিয়ন ডলার। ফলে কেবল যুদ্ধের ক্ষতিই নয়, বরং গাজাবাসীকে এক দীর্ঘমেয়াদী পুনর্গঠন ও অস্তিত্ব রক্ষার কঠিন সংগ্রামের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০১ পিএম