ভারতে ২০২০ থেকে ২১০০টির বেশি মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনায় ‘বুলডোজার অভিযান’
ভারতে ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তত ২,১৬৬টি ঘটনা ও নথিপত্রে মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা—যেমন মসজিদ, মাদ্রাসা, মাজার ও দরগাহর ওপর প্রশাসনিক ‘বুলডোজার অভিযান’ পরিচালিত হয়েছে। সরকারি নথি, আদালতের রায় ও গণমাধ্যম প্রতিবেদনের সংকলন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব অভিযানের পেছনে উচ্ছেদ, সরকারি জমি দখলমুক্তকরণ ও অবৈধ নির্মাণের অজুহাত দেখানো হয়েছে। কওমী টাইমসের পর্যালোচনায় স্পষ্ট, এ ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে ভারতের মুসলিমদের ধর্মীয় ও নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি করেছে।ভারতে সরকারি ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ২০২০ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে মুসলিম ধর্মীয় ও সামাজিক স্থানগুলোর ওপর উচ্ছেদ ও ধ্বংসাভিযান চালানো হচ্ছে। সংগৃহীত আন্তর্জাতিক নথিপত্র এবং সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, গুজরাট, দিল্লি, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, তেলেঙ্গানা ও আসামসহ একাধিক রাজ্যে ২,১৬৬টিরও বেশি এ সংক্রান্ত ঘটনা ও পরিসংখ্যান রেকর্ড করা হয়েছে।প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই ২,১৬৬টি সংখ্যাটি একক কোনো পৃথক ধ্বংসাভিযানের নিখুঁত সংখ্যা নয়; বরং এতে ব্যক্তিগত ঘটনা, সরকারি পরিসংখ্যান, আংশিক ধ্বংস এবং একীভূত ডেটা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এটি ভারতে মুসলিমদের ওপর ক্রমবর্ধমান প্রশাসনিক নিপীড়ন ও তাদের অবকাঠামোগত অস্তিত্ব ধ্বংসের একটি পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরে।প্রারম্ভিক ঘটনা ও উত্তর প্রদেশের ভূমিকা২০২১ সালের মে মাসে উত্তর প্রদেশের বারাবঙ্কির রাম সানেহি ঘাটের ঐতিহাসিক 'গরিব নেওয়াজ' (তহসিল ওয়ালি) মসজিদটি জেলা প্রশাসন বুলডোজার দিয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। প্রশাসন দাবি করেছিল যে স্থাপনাটি অবৈধ এবং সরকারি জমিতে অবস্থিত, যদিও সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আইনি লড়াই শুরু করে।২০২২ সালে কানপুরে হাইওয়ে নির্মাণের দোহাই দিয়ে একটি মাজার অপসারণ করা হয় এবং গুজরাটের বেট দ্বারকায় অবৈধ দখলের অজুহাতে ১০টি মাজার ও দরগাহ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ২০২৩ সালে দিল্লির ঐতিহ্যবাহী মান্ডি হাউজের কাছে নানহে মিয়াঁ চিশতি মাজার এবং ভজনপুরার একটি মাজার রাস্তা সম্প্রসারণের নামে ভেঙে ফেলা হয়।উত্তরাখণ্ড ও দিল্লির বৃহৎ অভিযান (২০২৪)উত্তরাখণ্ডে ২০২৩-২৪ সালের মধ্যে বনভূমির জমি উদ্ধারের নামে ২০০ থেকে ৩০০টিরও বেশি মাজার ধ্বংস করা হয়। ২০২৪ সালে দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (ডিডিএ) মেহরাউলিতে ঐতিহাসিক আখুন্দজি মসজিদ ও বাহরুল উলুম মাদ্রাসা বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেয়, যার পেছনে সংলগ্ন সঞ্জয় বনের জমি সংক্রান্ত অজুহাত দেওয়া হয়।একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে উত্তরাঞ্চলের হলদ্বানির বানভুলপুরায় মরিয়ম মসজিদ ও আব্দুল রাজ্জাক জাকারিয়া মাদ্রাসা ভেঙে ফেলার পর স্থানীয় মুসলিমদের ওপর মারাত্মক সহিংসতা নেমে আসে, যাতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। তাছাড়া গুজরাটের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিধানসভায় স্বীকার করেন যে, এক অভিযানেই রাজ্যে ১০৮টি মাজার ধ্বংস করা হয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ সোমনাথে ৯টি ঐতিহ্যবাহী মসজিদ ও দরগাহ একই প্রক্রিয়ায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।২০২৫-২০২৬: সীমান্ত অঞ্চল ও মাদ্রাসাকে নিশানা২০২৫ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, পুণে, মিরাট, গোরখপুর ও আসামের বহু প্রাচীন মসজিদ ও মাদ্রাসা টার্গেট করা হয়। আসামের ডিব্রুগড়ে ১২৮ বছরের প্রাচীন চাওখাওয়া জামে মসজিদ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। উত্তর প্রদেশ-নেপাল সীমান্ত এলাকায় প্রায় ৪২৯টি কাঠামো চিহ্নিত করে ২০টি মসজিদ ও মাদ্রাসা উচ্ছেদ করা হয়।চলতি ২০২৬ সালেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। মে ২০২৬-এ দিল্লির মঙ্গলপুরীর দরগাহ পঞ্চ পীরন এবং জুন ২০২৬-এ এটোয়ার সাইয়েদ শাহ বাবা মাজার প্রশাসনিক অভিযানে আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ ধ্বংস করা হয়। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর শুরুতে সাহারানপুরের কালেক্টরেট মসজিদটি আদালতের একটি উচ্ছেদ আদেশের পর তড়িঘড়ি ধ্বংস করা হয়।উগ্র হিন্দুত্ববাদ ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যযদিও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সবসময় এসব অভিযানকে 'জমি উদ্ধার' বা 'অবৈধ নির্মাণ প্রতিরোধ' হিসেবে তুলে ধরেছে, বাস্তবে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই মুসলিমদের ধর্মীয় পরিচয় ও ওয়াকফ সম্পদকে নিশানা করার অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে রাতারাতি নোটিশ দিয়ে শত বছরের পুরোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী মানসিকতা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের এই মিশ্রণ ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিমদের মৌলিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে।
১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম