৩৭ বছর ধরে রাষ্ট্র সুরক্ষায় নিয়োজিত বাঙালি মুসলিম পুলিশের নামই কাটা গেল ভোটার তালিকা থেকে
যাঁদের ঘাম ও রক্তে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, তাঁদেরই যদি হঠাৎ নিজের দেশে 'উদ্বাস্তু' বা 'সন্দেহভাজন' বানিয়ে দেওয়া হয়, তবে সেই আঘাতের গভীরতা পরিমাপ করা কঠিন। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে চলমান নির্বাচনের মধ্যেই তেমনি এক নজিরবিহীন ও বেদনাদায়ক ঘটনা সামনে এসেছে। দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশে সততা ও বীরত্বের সঙ্গে সেবা দিয়ে আসা একজন বাঙালি মুসলিম সাব-ইন্সপেক্টরের নাম কেটে দেওয়া হয়েছে খোদ ভোটার তালিকা থেকে। যে নির্বাচনের নিরাপত্তা রক্ষায় তিনি দিনরাত মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন, সেই নির্বাচনেই তিনি নিজে ভোট দেওয়ার অধিকার হারিয়েছেন।পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার পাড়ুই থানায় বর্তমানে কর্মরত আছেন সাব-ইন্সপেক্টর রেজাউল করিম। আর মাত্র ২১ মাস পর তিনি চাকরি থেকে অবসরে যাবেন। চলমান লোকসভা নির্বাচনকে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ করতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রুট মার্চ করা থেকে শুরু করে সমস্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমন্বয় করছেন তিনি। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তব হলো, আগামী ভোটের দিন যখন সাধারণ মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন, তখন রেজাউল করিম সেখানে কেবলই একজন নীরব দর্শক হয়ে থাকবেন। মুর্শিদাবাদের ৫৭-সুতি বিধানসভা কেন্দ্রের ১১১ নম্বর বুথের ভোটার তালিকা থেকে তাঁর নামটি সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়েছে।শেকড়ের ইতিহাস এবং এই বৈপরীত্যের শুরুমুর্শিদাবাদের সুতি এলাকার ডেবিপুর গ্রামে রেজাউল করিমের বেড়ে ওঠা। এলাকাটি স্থানীয়ভাবে মেকানিক ও কারিগরদের জন্য "মিস্ত্রি পাড়া" নামে পরিচিত। রেজাউলের পিতা নাইমুদ্দিন বিশ্বাস গরুর গাড়ির কাঠের চাকা তৈরি করতেন। রেজাউল করিমের রাজনৈতিক ও নাগরিক ইতিহাস কোনো বৈষয়িক সম্পত্তির চেয়েও পুরনো। ১৯৫২ সালে স্বাধীন ভারতের প্রথম যখন ভোটার তালিকা তৈরি হয়, তখন থেকেই তাঁর দাদা এবং বাবার নাম মুর্শিদাবাদের নিবন্ধিত ভোটার হিসেবে নথিবদ্ধ ছিল।রেজাউল করিমের পরিবারে মোট পাঁচজন ভোটার আছেন—তাঁর স্ত্রী, দুই ছেলে এবং এক মেয়ে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পাঁচজনের নামই বর্তমান ভোটার তালিকায় বহাল রয়েছে। আরও আশ্চর্যের বিষয়, পরিবারের বাকি সদস্যদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ও যাচাই করা হয়েছিল ২০০২ সালের একটি রেফারেন্স রেকর্ডের ওপর ভিত্তি করে, যা ছিল স্বয়ং রেজাউল করিমের নিজস্ব ভোটার রেকর্ড। অথচ, যে রেকর্ড তাঁর পরিবারের বাকি সদস্যদের ভোটার হিসেবে টিকিয়ে রাখল, সেই একই রেকর্ড রেজাউল করিমকে তালিকায় রাখতে ব্যর্থ হলো। তাঁকে কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই হঠাৎ ‘সন্দেহভাজন ভোটার’ (Suspicious Voter) হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁর ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।“আমি ১৯৯১ সাল থেকে পুলিশে চাকরি করছি,” একটি বিশাল নির্বাচনী জনসভার আগে সাঁইথিয়ায় নিজের দায়িত্ব পালনের ফাঁকে রেজাউল করিম গণমাধ্যমকে বলেন। তিনি আরও যোগ করেন, “২০০২ সালের ভোটার তালিকায় আমার নাম স্পষ্টভাবে ছিল। তারও আগে আমার বাবা ও দাদার নাম তালিকায় ছিল। কিন্তু এখন আমার নাম নেই। আমি সত্যিই জানি না কেন এমনটা হলো।”বীরত্ব ও সাহসিকতার এক দীর্ঘ ক্যারিয়াররেজাউল করিমের পুরো ক্যারিয়ার জুড়েই রয়েছে অদম্য সাহসিকতার অসংখ্য গল্প। ১৯৯১ সালে একজন সাধারণ কনস্টেবল হিসেবে তিনি পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। এরপর ২০১৫ সালে অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর (ASI) এবং এই ২০২৬ সালের শুরুর দিকেই তিনি সাব-ইন্সপেক্টর (SI) পদে পদোন্নতি পান। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বিভিন্ন জেলায় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বহু অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন।২০০৯ সালের মালদা অপারেশন: মালদার ইংলিশ বাজারে ডিউটি করার সময় সশস্ত্র মোটরসাইকেল আরোহী সন্ত্রাসীদের গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। একটি বুলেট তাঁর মাথায় আঘাত করে, যার জন্য তাঁকে দীর্ঘ চিকিৎসা ও মাথায় সেলাই নিতে হয়েছিল। সুস্থ হয়েই তিনি আবার জনগণের সুরক্ষায় ডিউটিতে ফিরে আসেন।২০১৬ সালের চাঁচল এনকাউন্টার: মালদার চাঁচলে ছয়জন সশস্ত্র ডাকাতের একটি দল জড়ো হয়েছে—এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জনবল সংকটের কারণে মাত্র চারজন হোম গার্ডকে সাথে নিয়ে অভিযানে নামেন রেজাউল। সেই অভিযান এক রাতের মুখোমুখি বন্দুকযুদ্ধে রূপ নেয়, যেখানে ডাকাতরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ১৮ রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে। রেজাউলের বুকের ঠিক কাছাকাছি গাড়ির বডিতে বুলেট লাগলেও তিনি পিছু হটেননি। একাই বীরত্বের সাথে সেই ছয় ডাকাতকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসেন।২০২৫ সালের আন্তঃরাজ্য অভিযান: গত বছরও তিনি ঝাড়খণ্ড পুলিশের সাথে সমন্বয় করে একটি বড় চোরাচালান চক্রকে সফলভাবে গুঁড়িয়ে দেন।এছাড়া ১৯৯২, ১৯৯৩ এবং ১৯৯৪ সালে অল ইন্ডিয়া পুলিশ মিটে তিনি পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং পরবর্তীতে অসাধারণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রপতির প্রশংসাপত্রও লাভ করেন।“দেশ আমার, দায়িত্বও আমার”এত বড় অপমানের পরও রেজাউল করিমের দেশপ্রেম এবং কর্তব্যের প্রতি নিষ্ঠা বিন্দুমাত্র কমেনি। তিনি জানান, এই ঘটনায় তিনি গভীরভাবে মর্মাহত এবং অপমানিত বোধ করছেন, তবুও তাঁর কাছে ডিউটি সবার আগে। দেশের জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত। কিন্তু কর্তব্যের বাইরেও রেজাউল করিমের বড় পরিচয়, তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় আজীবন কাজ করে গেছেন। তিনি কোনোভাবেই চান না তাঁর এই ব্যক্তিগত দুঃখকে কেন্দ্র করে সমাজে কোনো ‘অশান্তির বাতাাবরণ’ বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হোক। তিনি দেশের বিচার ব্যবস্থা এবং ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ECI) ওপর এখনো আস্থা রাখতে চান।তিনি ভারতকে গর্বের সাথে "আমার দেশ" বলে ডাকেন। ভারতভাগের ক্ষত নিরাময় করে এক মিশ্র ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেন তিনি। কিন্তু মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জ থেকে লালগোলা পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার যে প্রশাসনিক বঞ্চনা ও নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার অদৃশ্য রাজনীতি চলছে, রেজাউল করিমের ঘটনা প্রমাণ করে যে, সেই বঞ্চনার হাত থেকে রাষ্ট্রের সুরক্ষায় পরা খাকি ইউনিফর্মও আজ সুরক্ষিত নয়।