শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
কওমী টাইমস
সর্বশেষ
হায়দরাবাদের 'বারকাস': দাক্ষিণাত্যের বুকে বেঁচে থাকা এক টুকরো আরব ঐতিহ্য

হায়দরাবাদের 'বারকাস': দাক্ষিণাত্যের বুকে বেঁচে থাকা এক টুকরো আরব ঐতিহ্য

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় ঐতিহাসিক শহর হায়দরাবাদের বুকে কয়েক শতাব্দী ধরে গড়ে উঠেছে এক অনন্য আরব ডায়াসপোরা বা প্রবাসী সম্প্রদায়, যা আজ 'হায়দরাবাদি আরব' বা স্থানীয়ভাবে 'চাওশ' নামে পরিচিত। মধ্যযুগ থেকে শুরু করে আসাফ জাহি (নিজাম) রাজবংশের শাসনামল পর্যন্ত আরব উপদ্বীপ, বিশেষ করে ইয়েমেনের হাদরামাউত অঞ্চল থেকে আসা এই লড়াকু ও ধর্মপ্রাণ মানুষগুলো হায়দরাবাদের সামরিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। শত প্রতিকূলতা ও রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যেও তারা আজ ভারতের বুকে ধরে রেখেছে তাদের খাঁটি ইসলামি ঐতিহ্য ও আরব সংস্কৃতি।ঐতিহাসিক সম্পর্কের সূচনা: বাণিজ্য থেকে বসতি স্থাপনহায়দরাবাদে আরবদের আগমনের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই আরব বণিকরা ব্যবসার উদ্দেশ্যে ভারতের পশ্চিম উপকূল এবং মালাবার উপকূলে যাতায়াত শুরু করেন। পারস্য উপসাগর, ওমান এবং ইয়েমেনের বন্দরগুলো থেকে মসলা ও কাপড়ের বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে যে সংযোগ তৈরি হয়েছিল, তা কেবল পণ্যের আদান-প্রদানই ঘটায়নি, বরং এই অঞ্চলে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।পরবর্তীতে বাহমানি সালতানাত এবং দাক্ষিণাত্যের অন্যান্য স্বাধীন সুলতানদের আমলে আরব থেকে বহু নামকরা আলেম, সুফি এবং দক্ষ সেনারা এখানে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৫৯১ সালে কুতুবশাহী রাজবংশের হাত ধরে ঐতিহাসিক হায়দরাবাদ শহর প্রতিষ্ঠা লাভ করলে এই ধারা আরও গতিশীল হয়।নিজামদের সেনাবাহিনী ও হাদরামি বীরদের বীরত্বগাথাঅষ্টাদশ শতাব্দীতে হায়দরাবাদে আসাফ জাহি বা নিজাম রাজবংশের শাসনামলে আরবদের আগমন সবচেয়ে বড় রূপ নেয়। নিজামরা তাদের রাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও রাজপ্রাসাদ পাহারার জন্য এমন এক বাহিনীর সন্ধান করছিলেন যারা হবে নির্ভীক ও চরম বিশ্বস্ত। এই সূত্র ধরে ইয়েমেনের শুষ্ক পাহাড়ি অঞ্চল 'হাদরামাউত', ওমান এবং হিজাজ থেকে হাজার হাজার লড়াকু আরবদের হায়দরাবাদ সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়।ইয়েমেনের হাদরামি আরবরাই মূলত এই ডায়াসপোরার মেরুদণ্ড। দাক্ষিণাত্যের জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজামদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও শক্তিশালী রক্ষাকবচ ছিল এই আরব বাহিনী। রাজপ্রাসাদের প্রধান পাহারাদার থেকে শুরু করে যেকোনো কঠিন সামরিক অভিযানে এই আরবরা তাদের সাহসিকতা ও শৃঙ্খলার প্রমাণ দিয়েছে।জ্ঞানচর্চায় অবদান ও ইসলামের প্রচার-প্রসারআরবরা কেবল অস্ত্র হাতেই লড়েনি, তারা হায়দরাবাদের জ্ঞান ও ধর্মীয় চেতনার জগতেও বিপ্লব ঘটিয়েছিল। ইয়েমেন ও হিজাজ থেকে আসা প্রখ্যাত ইসলামি স্কলার বা আলেম সমাজ হায়দরাবাদে অনেক চমৎকার মাদ্রাসা ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তারা হাদিস, ফিকহ (ইসলামি আইন) এবং তাফসির শাস্ত্রের এক সমৃদ্ধ পরিবেশ তৈরি করেন, যা দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে হায়দরাবাদকে অন্যতম প্রধান ইসলামি শিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত করেছিল।১৬১৭ সালে কুতুবশাহী রাজবংশের পঞ্চম শাসক সুলতান মুহাম্মদ কুলি কুতুব শাহ কর্তৃক নির্মিত ঐতিহাসিক মক্কা মসজিদ এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ ইসলামি স্থাপত্যের অন্যতম সাক্ষী।বারকাস: হায়দরাবাদের ভেতরেই যেন এক মিনি ইয়েমেনহায়দরাবাদে আরব সংস্কৃতি সবচেয়ে জীবন্ত রূপ ধারণ করেছে যে এলাকাটিকে ঘিরে, তার নাম 'বারকাস' (Barkas)। ইংরেজি 'Barracks' (সেনা ছাউনি) শব্দ থেকে এই নামের উৎপত্তি। নিজামদের শাসনামলে আরব সৈন্যদের থাকার জন্য যে ছাউনি তৈরি করা হয়েছিল, সেটিই আজকের বারকাস।আজও বারকাসে প্রবেশ করলে মনে হবে আপনি ভারতের কোনো শহর নয়, বরং ইয়েমেনের হাদরামাউতের কোনো জনপদে দাঁড়িয়ে আছেন। সেখানকার মানুষের পরনে ঐতিহ্যবাহী আরব পোশাক (লুঙ্গি বা ইজার), চেহারায় আরব বংশোদ্ভূত ছাপ এবং আতিথেয়তায় এখনো টিকে আছে মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতি।বিশেষ করে হাদরামি রন্ধনশৈলী হায়দরাবাদের ঐতিহ্যবাহী বিরিয়ানির সমান্তরালে নিজের অবস্থান করে নিয়েছে। আরবদের ঐতিহ্যবাহী গোশতের পদ 'মান্দি' (Mandi) এবং 'কাবসা' (Kabsa) আজ পুরো হায়দরাবাদ তথা ভারতের ভোজনরসিকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।১৯৪৭ পরবর্তী সময় ও বর্তমান বাস্তবতা১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার সময় হায়দরাবাদ নিজাম শাসিত একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে টিকে থাকার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ১৯৪৮ সালে ভারত সরকারের বিতর্কিত সামরিক অভিযান 'অপারেশন পোলো' (Operation Polo)-র মাধ্যমে হায়দরাবাদকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই অভিযানের পর নিজামদের রাজকীয় সেনাবাহিনী ভেঙে দেওয়া হয়, যা আরবদের জন্য এক বড় ধাক্কা ছিল। ঐতিহ্যগত সামরিক পেশা হারিয়ে অনেকে সংকটে পড়েছিলেন।তবে সময়ের সাথে সাথে এই সাহসী জাতি নিজেদের পুনর্গঠিত করেছে। তারা ব্যবসা-বাণিজ্য, আধুনিক শিক্ষা ও মধ্যপ্রাচ্যের সাথে বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার দিকে মন দেয়। বিশেষ করে গত কয়েক দশকে পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর (সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার) অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হায়দরাবাদি আরবদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। দুই অঞ্চলের আত্মীয়তার সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তারা আজ মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতের মাঝে এক মজবুত অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সেতু হিসেবে কাজ করছে।
৩ ঘন্টা আগে

পশ্চিমবঙ্গে ওবিসি কোটা ১৭% থেকে কমিয়ে ৭%: ৬৫টি মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকার হরণের বিল পাস

পশ্চিমবঙ্গে ওবিসি কোটা ১৭% থেকে কমিয়ে ৭%: ৬৫টি মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকার হরণের বিল পাস

গোপালগঞ্জে আওয়ামীলীগ বিহীন নির্বাচন: মুফতী শুয়াইবকে ঘিরে নতুন সমীকরণ

গোপালগঞ্জে আওয়ামীলীগ বিহীন নির্বাচন: মুফতী শুয়াইবকে ঘিরে নতুন সমীকরণ

ঈদের দিনেও বন্ধ শ্রীনগরের জামে মসজিদ, টানা সপ্তম বছর নামাজে নিষেধাজ্ঞা

ঈদের দিনেও বন্ধ শ্রীনগরের জামে মসজিদ, টানা সপ্তম বছর নামাজে নিষেধাজ্ঞা

গোপালগঞ্জ–২ আসনে মুফতি শুয়াইব ইবরাহীমের প্রতি জেলার শীর্ষ ওলামায়েকেরামের সর্বসম্মত সমর্থন

গোপালগঞ্জ–২ আসনে মুফতি শুয়াইব ইবরাহীমের প্রতি জেলার শীর্ষ ওলামায়েকেরামের সর্বসম্মত সমর্থন

জাপানে মুসলিমবিদ্বেষী অনলাইন প্রচারণার জেরে মসজিদে অগ্নিসংযোগ

জাপানে মুসলিমবিদ্বেষী অনলাইন প্রচারণার জেরে মসজিদে অগ্নিসংযোগ

রংপুরে মসজিদে খতমে নবুওয়ত আলোচনায় পুলিশের বাধার নিন্দা ও ১৪ জুলাই নতুন সম্মেলনের ডাক

রংপুরে মসজিদে খতমে নবুওয়ত আলোচনায় পুলিশের বাধার নিন্দা ও ১৪ জুলাই নতুন সম্মেলনের ডাক

কলকাতায় বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় মুসলিম তরুণীকে পুড়িয়ে হত্যা

কলকাতায় বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় মুসলিম তরুণীকে পুড়িয়ে হত্যা

ভারতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে সংখ্যালঘু নিপীড়ন: ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে ১৩ মুসলিম খুন

ভারতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে সংখ্যালঘু নিপীড়ন: ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে ১৩ মুসলিম খুন

মিরপুরে ফার্মেসির সাইনবোর্ড নিয়ে ভারতীয় অ্যাকাউন্টের অপপ্রচার; সাম্প্রদায়িক উস্কানির অভিযোগ

মিরপুরে ফার্মেসির সাইনবোর্ড নিয়ে ভারতীয় অ্যাকাউন্টের অপপ্রচার; সাম্প্রদায়িক উস্কানির অভিযোগ

রংপুরে কাদিয়ানী আগ্রাসন: ‘ধর্মে আয়, নইলে ভিটা ছাড়’ হুমকির মুখে মুসলিম পরিবার, ৭ বছর ধরে নির্যাতন

রংপুরে কাদিয়ানী আগ্রাসন: ‘ধর্মে আয়, নইলে ভিটা ছাড়’ হুমকির মুখে মুসলিম পরিবার, ৭ বছর ধরে নির্যাতন

হায়দরাবাদের 'বারকাস': দাক্ষিণাত্যের বুকে বেঁচে থাকা এক টুকরো আরব ঐতিহ্য

হায়দরাবাদের 'বারকাস': দাক্ষিণাত্যের বুকে বেঁচে থাকা এক টুকরো আরব ঐতিহ্য

ইসলামের শাশ্বত শান্তিতে মুগ্ধ হয়ে ১২ বছরের দাম্পত্যের পর সত্যকে বেছে নিলেন জার্মান নারী এলা

ইসলামের শাশ্বত শান্তিতে মুগ্ধ হয়ে ১২ বছরের দাম্পত্যের পর সত্যকে বেছে নিলেন জার্মান নারী এলা

মাদ্রাসার কোমলমতি শিশুদের নিয়ে টিকটকে আপত্তিকর কনটেন্ট: নেপথ্যে বিকৃত মানসিকতার এক চক্র

মাদ্রাসার কোমলমতি শিশুদের নিয়ে টিকটকে আপত্তিকর কনটেন্ট: নেপথ্যে বিকৃত মানসিকতার এক চক্র

ভারতে মুসলিম যুবককে জোরপূর্বক বাছুরের পায়ে মাথা নোয়াতে বাধ্য করল হিন্দুত্ববাদীরা

ভারতে মুসলিম যুবককে জোরপূর্বক বাছুরের পায়ে মাথা নোয়াতে বাধ্য করল হিন্দুত্ববাদীরা

ভারতে মুসলিম অটোচালককে ‘শুয়োর’ সম্বোধন ও নির্মম মারধর করল ট্রাফিক পুলিশ

ভারতে মুসলিম অটোচালককে ‘শুয়োর’ সম্বোধন ও নির্মম মারধর করল ট্রাফিক পুলিশ

কওমি ঘরানার ৭ দলের ঐতিহাসিক বৈঠক: উম্মাহর স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ পথ চলার নতুন বার্তা

কওমি ঘরানার ৭ দলের ঐতিহাসিক বৈঠক: উম্মাহর স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ পথ চলার নতুন বার্তা

ইসরায়েলি পাঠ্যপুস্তকে ফিলিস্তিনিরা কেবলই সমাধানযোগ্য সমস্যা ও অভ্যন্তরীণ হুমকি

ইসরায়েলি পাঠ্যপুস্তকে ফিলিস্তিনিরা কেবলই সমাধানযোগ্য সমস্যা ও অভ্যন্তরীণ হুমকি

ভণ্ড নবী আল-মুকান্না: খোরাসানের সেই মায়াবী চাঁদ ও এক পাপিষ্ঠের করুণ পরিণতি

ভণ্ড নবী আল-মুকান্না: খোরাসানের সেই মায়াবী চাঁদ ও এক পাপিষ্ঠের করুণ পরিণতি

কলকাতায় বজরং দলের হুমকি: হালাল বিক্রি বন্ধ করো, নয়তো এলাকা ছাড়ো

কলকাতায় বজরং দলের হুমকি: হালাল বিক্রি বন্ধ করো, নয়তো এলাকা ছাড়ো

তুর্কি গোয়েন্দা সংস্থার সফল অভিযান: সিরিয়া থেকে ‘দায়েশ’ শীর্ষ নেতা তালেব গুলের গ্রেপ্তার

তুর্কি গোয়েন্দা সংস্থার সফল অভিযান: সিরিয়া থেকে ‘দায়েশ’ শীর্ষ নেতা তালেব গুলের গ্রেপ্তার

হায়দরাবাদের 'বারকাস': দাক্ষিণাত্যের বুকে বেঁচে থাকা এক টুকরো আরব ঐতিহ্য

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় ঐতিহাসিক শহর হায়দরাবাদের বুকে কয়েক শতাব্দী ধরে গড়ে উঠেছে এক অনন্য আরব ডায়াসপোরা বা প্রবাসী সম্প্রদায়, যা আজ 'হায়দরাবাদি আরব' বা স্থানীয়ভাবে 'চাওশ' নামে পরিচিত। মধ্যযুগ থেকে শুরু করে আসাফ জাহি (নিজাম) রাজবংশের শাসনামল পর্যন্ত আরব উপদ্বীপ, বিশেষ করে ইয়েমেনের হাদরামাউত অঞ্চল থেকে আসা এই লড়াকু ও ধর্মপ্রাণ মানুষগুলো হায়দরাবাদের সামরিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। শত প্রতিকূলতা ও রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যেও তারা আজ ভারতের বুকে ধরে রেখেছে তাদের খাঁটি ইসলামি ঐতিহ্য ও আরব সংস্কৃতি।ঐতিহাসিক সম্পর্কের সূচনা: বাণিজ্য থেকে বসতি স্থাপনহায়দরাবাদে আরবদের আগমনের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই আরব বণিকরা ব্যবসার উদ্দেশ্যে ভারতের পশ্চিম উপকূল এবং মালাবার উপকূলে যাতায়াত শুরু করেন। পারস্য উপসাগর, ওমান এবং ইয়েমেনের বন্দরগুলো থেকে মসলা ও কাপড়ের বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে যে সংযোগ তৈরি হয়েছিল, তা কেবল পণ্যের আদান-প্রদানই ঘটায়নি, বরং এই অঞ্চলে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।পরবর্তীতে বাহমানি সালতানাত এবং দাক্ষিণাত্যের অন্যান্য স্বাধীন সুলতানদের আমলে আরব থেকে বহু নামকরা আলেম, সুফি এবং দক্ষ সেনারা এখানে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৫৯১ সালে কুতুবশাহী রাজবংশের হাত ধরে ঐতিহাসিক হায়দরাবাদ শহর প্রতিষ্ঠা লাভ করলে এই ধারা আরও গতিশীল হয়।নিজামদের সেনাবাহিনী ও হাদরামি বীরদের বীরত্বগাথাঅষ্টাদশ শতাব্দীতে হায়দরাবাদে আসাফ জাহি বা নিজাম রাজবংশের শাসনামলে আরবদের আগমন সবচেয়ে বড় রূপ নেয়। নিজামরা তাদের রাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও রাজপ্রাসাদ পাহারার জন্য এমন এক বাহিনীর সন্ধান করছিলেন যারা হবে নির্ভীক ও চরম বিশ্বস্ত। এই সূত্র ধরে ইয়েমেনের শুষ্ক পাহাড়ি অঞ্চল 'হাদরামাউত', ওমান এবং হিজাজ থেকে হাজার হাজার লড়াকু আরবদের হায়দরাবাদ সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়।ইয়েমেনের হাদরামি আরবরাই মূলত এই ডায়াসপোরার মেরুদণ্ড। দাক্ষিণাত্যের জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজামদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও শক্তিশালী রক্ষাকবচ ছিল এই আরব বাহিনী। রাজপ্রাসাদের প্রধান পাহারাদার থেকে শুরু করে যেকোনো কঠিন সামরিক অভিযানে এই আরবরা তাদের সাহসিকতা ও শৃঙ্খলার প্রমাণ দিয়েছে।জ্ঞানচর্চায় অবদান ও ইসলামের প্রচার-প্রসারআরবরা কেবল অস্ত্র হাতেই লড়েনি, তারা হায়দরাবাদের জ্ঞান ও ধর্মীয় চেতনার জগতেও বিপ্লব ঘটিয়েছিল। ইয়েমেন ও হিজাজ থেকে আসা প্রখ্যাত ইসলামি স্কলার বা আলেম সমাজ হায়দরাবাদে অনেক চমৎকার মাদ্রাসা ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তারা হাদিস, ফিকহ (ইসলামি আইন) এবং তাফসির শাস্ত্রের এক সমৃদ্ধ পরিবেশ তৈরি করেন, যা দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে হায়দরাবাদকে অন্যতম প্রধান ইসলামি শিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত করেছিল।১৬১৭ সালে কুতুবশাহী রাজবংশের পঞ্চম শাসক সুলতান মুহাম্মদ কুলি কুতুব শাহ কর্তৃক নির্মিত ঐতিহাসিক মক্কা মসজিদ এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ ইসলামি স্থাপত্যের অন্যতম সাক্ষী।বারকাস: হায়দরাবাদের ভেতরেই যেন এক মিনি ইয়েমেনহায়দরাবাদে আরব সংস্কৃতি সবচেয়ে জীবন্ত রূপ ধারণ করেছে যে এলাকাটিকে ঘিরে, তার নাম 'বারকাস' (Barkas)। ইংরেজি 'Barracks' (সেনা ছাউনি) শব্দ থেকে এই নামের উৎপত্তি। নিজামদের শাসনামলে আরব সৈন্যদের থাকার জন্য যে ছাউনি তৈরি করা হয়েছিল, সেটিই আজকের বারকাস।আজও বারকাসে প্রবেশ করলে মনে হবে আপনি ভারতের কোনো শহর নয়, বরং ইয়েমেনের হাদরামাউতের কোনো জনপদে দাঁড়িয়ে আছেন। সেখানকার মানুষের পরনে ঐতিহ্যবাহী আরব পোশাক (লুঙ্গি বা ইজার), চেহারায় আরব বংশোদ্ভূত ছাপ এবং আতিথেয়তায় এখনো টিকে আছে মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতি।বিশেষ করে হাদরামি রন্ধনশৈলী হায়দরাবাদের ঐতিহ্যবাহী বিরিয়ানির সমান্তরালে নিজের অবস্থান করে নিয়েছে। আরবদের ঐতিহ্যবাহী গোশতের পদ 'মান্দি' (Mandi) এবং 'কাবসা' (Kabsa) আজ পুরো হায়দরাবাদ তথা ভারতের ভোজনরসিকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।১৯৪৭ পরবর্তী সময় ও বর্তমান বাস্তবতা১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার সময় হায়দরাবাদ নিজাম শাসিত একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে টিকে থাকার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ১৯৪৮ সালে ভারত সরকারের বিতর্কিত সামরিক অভিযান 'অপারেশন পোলো' (Operation Polo)-র মাধ্যমে হায়দরাবাদকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই অভিযানের পর নিজামদের রাজকীয় সেনাবাহিনী ভেঙে দেওয়া হয়, যা আরবদের জন্য এক বড় ধাক্কা ছিল। ঐতিহ্যগত সামরিক পেশা হারিয়ে অনেকে সংকটে পড়েছিলেন।তবে সময়ের সাথে সাথে এই সাহসী জাতি নিজেদের পুনর্গঠিত করেছে। তারা ব্যবসা-বাণিজ্য, আধুনিক শিক্ষা ও মধ্যপ্রাচ্যের সাথে বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার দিকে মন দেয়। বিশেষ করে গত কয়েক দশকে পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর (সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার) অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হায়দরাবাদি আরবদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। দুই অঞ্চলের আত্মীয়তার সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তারা আজ মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতের মাঝে এক মজবুত অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সেতু হিসেবে কাজ করছে।

হায়দরাবাদের 'বারকাস': দাক্ষিণাত্যের বুকে বেঁচে থাকা এক টুকরো আরব ঐতিহ্য