ভারতের মধ্যপ্রদেশের বিতর্কিত ঐতিহাসিক ভোজশালা-কামাল মওলা মসজিদকে শুক্রবার একটি হিন্দু মন্দির হিসেবে ঘোষণা করেছে রাজ্যের উচ্চ আদালত। বিচারপতি বিজয় কুমার শুক্লা ও বিচারপতি অলোক আওয়াস্থির ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, এই স্থানটি মূলত রাজা ভোজের নির্মিত দেবী সরস্বতীর মন্দির ও একটি সংস্কৃত শিক্ষা কেন্দ্র। আদালতের এই রায়ের ফলে সেখানে মুসলিমদের নামাজ পড়ার দীর্ঘদিনের অনুমতি বাতিল হয়ে গেছে।ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ASI)-এর বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে শুক্রবার এক স্পর্শকাতর রায় প্রদান করেছে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট। রায়ে আদালত স্পষ্ট করেছে যে, ধারের এই বিতর্কিত কাঠামোটি কোনো মসজিদ নয়, বরং এটি রাজা ভোজের আমলের একটি প্রাচীন মন্দির।আদালত ২০০৩ সালে এএসআই কর্তৃক জারি করা সেই আদেশটি বাতিল করে দিয়েছে, যার মাধ্যমে সেখানে মুসলিমদের শুক্রবারের নামাজ পড়ার এবং হিন্দুদের মঙ্গলবারের পূজার অধিকার দেওয়া হয়েছিল। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, এখন থেকে এই কমপ্লেক্সে কেবল হিন্দুরাই পূজা ও উপাসনা করতে পারবেন। তবে মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অধিকারের কথা বিবেচনা করে আদালত জানিয়েছে, তারা চাইলে ধার জেলায় একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য উপযুক্ত জমির আবেদন করতে পারবে। রাজ্য সরকার আইন অনুযায়ী সেই আবেদন বিবেচনা করবে।২০২৪ সালের মার্চ মাসে আদালতের নির্দেশে শুরু হওয়া ৯৮ দিনের বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার পর এএসআই তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, মসজিদের বর্তমান কাঠামোর নিচে একটি বিশাল প্রাচীন স্থাপত্যের অস্তিত্ব রয়েছে এবং এটি মন্দিরের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করে নির্মিত হয়েছে। হিন্দু পক্ষের আইনজীবী বিষ্ণু শঙ্কর জৈন জানান, সমীক্ষায় প্রাপ্ত শিলালিপি, মুদ্রা ও ভাস্কর্য প্রমাণ করে যে এটি মূলত একটি মন্দির ছিল। তবে মুসলিম পক্ষ এই জরিপকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে দাবি করেছে।আদালত কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে যেন লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত দেবী সরস্বতীর প্রাচীন মূর্তিটি ভারতে ফিরিয়ে আনার আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এই মূর্তিটি ১০১০ থেকে ১০৫৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পারমার রাজবংশের রাজা ভোজ স্থাপন করেছিলেন বলে স্বীকৃত।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং আইনি বিশ্লেষকরা প্রায়ই ভারতের উপাসনালয় আইন ১৯৯১ (Places of Worship Act, 1991)-এর প্রসঙ্গ টেনে এই জাতীয় রায়ের সমালোচনা করছেন। উক্ত আইন অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের সময়কার ধর্মীয় কাঠামোর চরিত্র পরিবর্তন করা নিষিদ্ধ। মুসলিম পক্ষের দাবি ছিল, এএসআই-এর জরিপ প্রতিবেদনটি একপাক্ষিক এবং এটি মূলত একটি বিদ্যমান মসজিদের চরিত্র পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করেছে।একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থায় নাগরিকের ধর্মীয় অধিকার সুরক্ষা করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। কামাল মওলা মসজিদের মতো ঐতিহাসিক নিদর্শনে নামাজের অধিকার কেড়ে নেওয়া ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। ন্যায়বিচারের দাবি হলো—প্রত্নতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার চেয়ে বর্তমান সাংবিধানিক অধিকার ও দীর্ঘদিনের স্থিতাবস্থাকে প্রাধান্য দেওয়া। উম্মাহর সচেতন নাগরিক হিসেবে এটি স্পষ্ট যে, ঐতিহাসিক স্থাপত্যগুলোকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই আইনি জটিলতাগুলো ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিমদের ধর্মীয় ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। স্বচ্ছ তদন্ত ও আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ডের আলোকে এই স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি।