আঘাত, অবহেলা ও অহংকার: মুসলিম চরিত্রের পরীক্ষা
মানুষের হৃদয় আয়নার মতো—একবার ফাটল ধরলে তার দাগ ঢেকে রাখা যায় না। একটি কথার ধারালো প্রান্ত, একটি অবহেলামূলক দৃষ্টিভঙ্গি, কিংবা অহংকারের ভারী ছায়া—এই তিনটি মিলেই মানুষের অন্তরে নীরবে ক্ষত তৈরি করে। আমরা প্রায়ই বুঝতে পারি না, আমাদের আচরণে কার হৃদয়ে আঘাত পড়ছে।ইসলাম মানুষের হৃদয়কে হালকা করে দেখেনি। বরং কাবাঘরের মতো মর্যাদা দিয়েছেন মানুষের মর্যাদাকে। তাই কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সতর্ক করে বলেছেন—وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا“যারা ঈমানদার পুরুষ ও নারীদের কষ্ট দেয়, তারা নিজেদের ওপর বড় অপবাদ ও প্রকাশ্য গুনাহের বোঝা বহন করে।” (সূরা আহযাব: ৫৮)রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—“প্রকৃত মুসলিম সে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।” (বুখারি, মুসলিম)এখানে ‘নিরাপত্তা’ শুধু শারীরিক নয়—মানসিক নিরাপত্তাও অন্তর্ভুক্ত।অবহেলার শিকড় থেকে জন্ম নেয় অহংকার। এটি মানুষের অন্তরে এমন এক আগুন, যা বাইরে প্রকাশ পায় না, কিন্তু ধীরে ধীরে চরিত্র ভেঙে দেয়। কুরআন স্পষ্ট করে ঘোষণা করেছে—إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ“নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো অহংকারী ও আত্মগর্বীকে ভালোবাসেন না।” (সূরা লুকমান: ১৮)অতএব নামাজ, রোজা, দান—সব থাকলেও অহংকার সেই আমলগুলোকে ছাই করে দিতে পারে। রাসূল ﷺ বলেছেন—“যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।” (সহিহ মুসলিম)ইসলাম কেবল নিষেধাজ্ঞার ধর্ম নয়; এটি সুন্দর বিকল্পও দেয়। একজন মুসলিমের মেজাজ কেমন হওয়া উচিত, তা কুরআন সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছে—وَعِبَادُ الرَّحْمَٰنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا“রহমানের বান্দারা তারা—যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে।” (সূরা ফুরকান: ৬৩)রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন এই আয়াতের জীবন্ত উদাহরণ। তিনি ক্ষমতায় থেকেও বিনয়ী ছিলেন, মর্যাদা পেলেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে বসতেন। কারও দুর্বলতা বা দারিদ্র্যকে তিনি কখনো অবহেলার কারণ বানাননি।শেষ পর্যন্ত একজন প্রকৃত মুসলিম সে-ই, যে আঘাতের বদলে আশ্রয় দেয়, অবহেলার বদলে সম্মান দেয়, অহংকারের বদলে বিনয় শেখে। কারণ হৃদয় ভাঙা সহজ, কিন্তু আল্লাহর কাছে সেই ভাঙনের জবাব দেওয়া কঠিন।সুন্দর আখলাকই ইসলামের সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয়।