বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
কওমী টাইমস

শীতকাল: ইবাদত ও মানবসেবার সোনালী সময়

শীতের আগমন প্রকৃতিকে শান্ত, স্নিগ্ধ ও প্রশান্তিময় করে। কুয়াশা মোড়ানো ভোর, দীর্ঘ রাত ও সংক্ষিপ্ত দিন—সব মিলিয়ে শীতকাল ইবাদতের জন্য এক অনন্য সময়। বাংলাদেশের ষড়ঋতুর মধ্যে শীতকাল আল্লাহ তাআলার বান্দাদের জন্য এক বিশেষ নিয়ামত। এটি শুধু শীতল আবহাওয়া নয়, বরং এক ধরণের আধ্যাত্মিক বসন্ত, যেখানে মুমিনের আমল পূর্ণ শক্তিতে বিকশিত হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ শীত ও গ্রীষ্ম—উভয় ঋতুর তীব্রতা এবং তাদের সুযোগকে আখিরাতের স্মরণে পরিণত করার গুরুত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।শীতকাল ও জাহান্নামের নিঃশ্বাসহাদিসে এসেছে—قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ : اشْتَكَتِ النَّارُ إِلَى رَبِّهَا فَقَالَتْ: يَا رَبِّ أَكَلَ بَعْضِي بَعْضًا، فَأَذِنَ لَهَا بِنَفَسَيْنِ، نَفَسٍ فِي الشِّتَاءِ وَنَفَسٍ فِي الصَّيْفِ(বুখারী, মুসলিম)অর্থ: "জাহান্নাম তার রবের নিকট অভিযোগ করল—‘হে রব! আমার এক অংশ অপর অংশকে গ্রাস করছে।’ তখন আল্লাহ তা‘আলা তাকে দুইবার নিঃশ্বাস নেওয়ার অনুমতি দিলেন—একবার শীতে, একবার গ্রীষ্মে।"শীতের কষ্টকেও বান্দা আখিরাতের স্মরণে পরিণত করতে পারে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শারীরিক অস্বস্তি কখনও আধ্যাত্মিক কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে না।শীতকাল: আমলের বসন্তসালাফে সালেহীন শীতকালকে ‘আমলের বসন্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। দিনের সংক্ষিপ্ততা রোজা ও নফল ছিয়ামের জন্য সুবিধাজনক, আর রাতের দীর্ঘতা ক্বিয়ামুল লাইল ও কুরআন তিলাওয়াতের সুযোগ তৈরি করে।হযরত ইবনু মাস‘উদ (রা.) বলেন—مرحبا بالشتاء، فيه تنزل الرحمة، أما ليله فطول للقائم، وأما نهاره فقصير للصائمঅর্থ: "শীতকে স্বাগতম। এতে রহমত নাযিল হয়। এর রাত দীর্ঘ—ক্বিয়ামকারীদের জন্য, দিন ছোট—ছিয়ামের জন্য।"শীতের দীর্ঘ রাত কুরআন তিলাওয়াত ও ইলম অর্জনের জন্য বিশেষ সুযোগ এনে দেয়। ফজরের জামা‘আতে অংশগ্রহণ করলে পুরো রাতের ইবাদতের সমতুল্য সওয়াব লাভ হয়।নফল ছিয়াম: শীতকালই সেরা সময়শীতকাল নফল ছিয়ামের জন্য এক বিরল গণীমত। শরীর তাপমাত্রা কম থাকায় ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট কম অনুভূত হয়। সোমবার–বৃহস্পতিবার, আইয়ামে বীয বা একদিন পরপর ছিয়াম পালন করা এ সময় সহজ।রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—الْغَنِيمَةُ الْبَارِدَةُ الصَّوْمُ فِي الشِّتَاءِ(মুসনাদ আহমাদ)অর্থ: "শীতকালের ছিয়াম হচ্ছে শীতল গণীমত।"শীতের কষ্টকর ওযুর মর্যাদাশীতের ঠান্ডা পানিতে ওযূ করা কষ্টকর হলেও এর প্রতিদান অসীম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—إِسْبَاغُ الْوُضُوءِ عَلَى الْمَكَارِهِ… فَذَلِكُمُ الرِّبَاطُ(মুসলিম)অর্থ: "কষ্ট সত্ত্বেও পূর্ণরূপে ওযূ করা আল্লাহর পথে স্থির থাকার চিহ্ন।"সহীহ মুসলিমে আরও এসেছে—إِذَا تَوَضَّأَ الْعَبْدُ الْمُسْلِمُ … فَإِذَا غَسَلَ رِجْلَيْهِ، خَرَجَتْ كُلُّ خَطِيئَةٍ مَشَتْهَا رِجْلَاهُ مَعَ الْمَاءِ حَتَّى يَخْرُجَ نَقِيًّا مِنَ الذُّنُوب(মুসলিম, কিতাবুত তাহারাহ)অর্থ: "ওযূর মাধ্যমে চোখ, হাত ও পায়ের গুনাহ পানি দিয়ে ধুয়ে যায়, বান্দা হয়ে ওঠে পবিত্র।"শীতের দীর্ঘ রাতে ফজরের জামা‘আতে অংশগ্রহণ করলে আল্লাহর বিশেষ হেফাজত লাভ হয়।مَنْ صَلَّى الصُّبْحَ فَهُوَ فِي ذِمَّةِ اللَّهِ(মুসলিম)مَنْ صَلَّى الصُّبْحَ فِي جَمَاعَةٍ فَكَأَنَّمَا صَلَّى اللَّيْلَ كُلَّهُঅর্থ: "যে ব্যক্তি ফজরের ছালাত জামা‘আতে আদায় করে, সে আল্লাহর নিরাপত্তায় থাকে। এবং যেন পুরো রাত ইবাদত করেছে।"মানবসেবা: শীতকালই সেরা সময়শীতকাল শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদতের জন্য নয়, মানবসেবার জন্যও বিশেষ। সমাজের অসহায়—বৃদ্ধ, শিশু, অসুস্থ ও দরিদ্ররা প্রচণ্ড শীতে কষ্টে থাকে। তাদের পাশে দাঁড়ানো—কম্বল, চাদর, সোয়েটার বা গরম পানির ব্যবস্থা—এটি একটি স্থায়ী সাদকাহ।শীতকালে গরম পানির ব্যবস্থা ও অসহায়দের খোঁজ নেওয়া।শীতকালে ঠান্ডা পানিতে ওযূ করা অনেকের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে—বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের জন্য। তাই মসজিদগুলোতে গরম পানির ব্যবস্থা করা একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও স্থায়ী মানবসেবা। একটি বৈদ্যুতিক হিটার কিংবা পানির পাত্র স্থাপন করে নিয়মিত গরম পানির ব্যবস্থা করা হলে বহু মানুষ সহজে ওযূ করে জামা‘আতে শরিক হতে পারেন।এ ধরনের উদ্যোগ শুধু মসজিদেই নয়—মাদরাসা,এতিমখানা,হাসপাতাল,মানবসেবা প্রতিষ্ঠান ওআশ্রয়কেন্দ্রগুলোতেও গরম পানির ব্যবস্থা করা হলে অসংখ্য মানুষ উপকৃত হবে।এটি এমন একটি সেবা, যার মাধ্যমে ইবাদতের পথ সুগম হয় এবং যার সওয়াব দীর্ঘদিন পর্যন্ত চলমান থাকে।অনেক সময় শীতের কষ্ট প্রকাশ্যে চোখে পড়ে না। পাশের বাড়ির বৃদ্ধ মানুষটি, রাস্তার পাশে থাকা শ্রমজীবী মানুষটি কিংবা দূরের কোনো গ্রামে বসবাসকারী অসহায় পরিবারটি—তারা অনেকেই মুখ ফুটে কষ্টের কথা বলতে পারে না। শীতকালে তাদের খোঁজ নেওয়া, প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করা—ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ।রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللَّهِ أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ(তাবারানী)অর্থ: "আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হলো, যিনি মানুষকে সবচেয়ে বেশি উপকার করেন।"শীতকালে অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো—গরম পানি, নিরাপদ আশ্রয় বা শীতবস্ত্রের ব্যবস্থা করা—এটি নীরব কিন্তু অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ মানবসেবা।مَنْ كَانَ فِي حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ اللَّهُ فِي حَاجَتِهِ(বুখারী, মুসলিম)অর্থ: "যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে থাকে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণে থাকেন।"শীতকাল মুমিনের জীবনে এক বিশেষ নিয়ামত। দীর্ঘ রাত ক্বিয়াম ও দো‘আর আহ্বান জানায়, সংক্ষিপ্ত দিন ছিয়ামের প্রতি উৎসাহিত করে, আর চারপাশের শীতার্ত মানুষ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের কথা।ইবাদত ও মানবসেবা—দুটি অবিচ্ছেদ্য পথ।

শীতকাল: ইবাদত ও মানবসেবার সোনালী সময়