বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
কওমী টাইমস

চীনের জোরপূর্বক শ্রমশিবিরে মুসলিম নিপীড়ন: গভীর উদ্বেগ প্রকাশ জাতিসংঘের

চীনের শিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর চলমান নিপীড়ন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ।উইঘুর, কাজাখ, কিরগিজসহ বিভিন্ন মুসলিম জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির মাধ্যমে জোরপূর্বক শ্রমশিবিরে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রক্রিয়া মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শামিল হতে পারে।জাতিসংঘের (UN) একদল বিশেষজ্ঞ এক যৌথ বিবৃতিতে চীনের শিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে মুসলিম সংখ্যালঘুদের জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, উইঘুরদের পাশাপাশি কাজাখ, কিরগিজ এবং তিব্বতি সংখ্যালঘুরাও এই নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।চীনের কমিউনিস্ট পার্টি (CCP) দীর্ঘদিন ধরেই শিনজিয়াং অঞ্চলে বসবাসকারী প্রধানত মুসলিম জাতিগোষ্ঠীগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া জোরপূর্বক শ্রমনীতি চালু করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই অঞ্চলটি মুসলিমদের কাছে ঐতিহাসিকভাবে পূর্ব তুর্কিস্তান নামেও পরিচিত।জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, চীনে জোরপূর্বক শ্রম কার্যকর করা হচ্ছে তথাকথিত “শ্রম স্থানান্তরের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন” কর্মসূচির আওতায়। এই কর্মসূচির মাধ্যমে উইঘুর ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিজ এলাকা থেকে সরিয়ে শিনজিয়াংয়ের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে।এই শ্রমশিবিরগুলোতে কর্মরতদের ওপর চলছে সর্বক্ষণিক নজরদারি, শোষণ, ধর্মীয় অধিকার দমন এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ। শ্রম প্রত্যাখ্যান করার কোনো সুযোগ তাদের নেই। কারণ, কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে শাস্তি, এমনকি অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক বা বন্দিত্বের ভয় রয়েছে।জাতিসংঘের বিবৃতিতে বলা হয়,“অনেক ক্ষেত্রে জবরদস্তির মাত্রা এতটাই ভয়াবহ যে তা জোরপূর্বক স্থানান্তর কিংবা দাসত্বে পরিণত হচ্ছে, যা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।”জনসংখ্যাগত পুনর্গঠন ও সাংস্কৃতিক ধ্বংসচীনা সরকারের শিনজিয়াং অঞ্চলের ২০২১–২০২৫ সালের পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই সময়ে প্রায় ১ কোটি ৩৭ লাখ ৫০ হাজার শ্রম স্থানান্তরের ঘটনা ঘটেছে। বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, এই শ্রম স্থানান্তর প্রকল্প মূলত দারিদ্র্য বিমোচনের নামে উইঘুর ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ধ্বংসের একটি কৌশল।কৃষিভিত্তিক বা যাযাবর জীবনধারা থেকে জোর করে তাদের মজুরি-নির্ভর শ্রমজীবনে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে তাদের ভাষা, সমাজব্যবস্থা, ধর্মীয় অনুশীলন ও ঐতিহ্য বিলুপ্তির মুখে পড়ছে—যা অপূরণীয় ক্ষতির কারণ।বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর জড়িত থাকার অভিযোগদ্য ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম (TBIJ)–এর নেতৃত্বে পরিচালিত এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিশ্বের শতাধিক নামকরা ব্র্যান্ড এমন কারখানার সঙ্গে যুক্ত, যেখানে উইঘুর ও অন্যান্য সংখ্যালঘু মুসলিমদের জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা হচ্ছে।এই তালিকায় অ্যাপল (Apple) ও ভক্সওয়াগেন (Volkswagen)–এর মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের নামও রয়েছে, যাদের সরবরাহকারী কারখানাগুলো চীনা সরকারের এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে বলে অভিযোগ।বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যযুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসনের সাবেক সিনিয়র নীতিনির্ধারক উপদেষ্টা লরা মারফি বলেন,“যখন কোনো সরকারি কর্মকর্তা উইঘুরের দরজায় কড়া নাড়ে এবং বলে—দূরে কোথাও কাজ নিতে হবে—তখন এটি অনুরোধ নয়। তারা জানে, অস্বীকার করলে আটক করা হবে। এটি কোনোভাবেই স্বেচ্ছাসেবী বা সম্মতির বিষয় নয়।”দীর্ঘদিনের কাঠামোগত নিপীড়ন২০১৪ সাল থেকে চীনা সরকার ‘সহিংস সন্ত্রাসবিরোধী কঠোর অভিযান’ নামে যে অভিযান শুরু করে, তার আওতায় ব্যাপক হারে উইঘুরদের গ্রেপ্তার করা হয়।স্ট্যানফোর্ড ল’ স্কুল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এই অভিযানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ তুলে ধরেছে।আনুমানিকভাবে, কয়েক মিলিয়ন উইঘুর ও অন্যান্য মুসলিম এই কারাগার ও শ্রমশিবিরে বন্দি হয়েছে—যেখানে নির্যাতন, জোরপূর্বক শ্রম, রাজনৈতিক মগজধোলাইসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।

চীনের জোরপূর্বক শ্রমশিবিরে মুসলিম নিপীড়ন: গভীর উদ্বেগ প্রকাশ জাতিসংঘের