জুলাই সনদে ১৯৭১ বা বিসমিল্লাহ বাদ দেওয়ার প্রশ্নই নেই: অধ্যাপক আলী রীয়াজ
জুলাই জাতীয় সনদ পাস হলে সংবিধান থেকে ১৯৭১ সালের ইতিহাস মুছে ফেলা হবে কিংবা ‘বিসমিল্লাহ’ বাদ দেওয়া হবে—এমন দাবিকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ।চট্টগ্রামে বিভাগীয় ইমাম সম্মেলনে তিনি বলেন, গণভোট ও জুলাই সনদকে ঘিরে মিথ্যাচার ছড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চলছে।এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সত্য ও তথ্যভিত্তিক আলোচনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও গণভোটসংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার বা সংবিধান থেকে ‘বিসমিল্লাহ’ বাদ দেওয়ার বিষয়ে কোনো আলোচনা নেই। এ ধরনের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার।আজ বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম স্টেডিয়াম এলাকায় আয়োজিত বিভাগীয় ইমাম সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, একটি মহল পরিকল্পিতভাবে জুলাই জাতীয় সনদকে বিতর্কিত করতে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে। কেউ যদি এমন দাবি করে থাকেন, তবে তারা হয় বিষয়টি না বুঝে বলছেন, নয়তো জেনেবুঝে জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন।তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। জুলাই সনদের পক্ষে বা বিপক্ষে আলোচনা হতে পারে, তবে সেই আলোচনা অবশ্যই যুক্তিনির্ভর, তথ্যভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ হতে হবে। হাজারো মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই ঐতিহাসিক সুযোগ যেন নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।অধ্যাপক আলী রীয়াজ আরও বলেন, ফ্যাসিবাদ পরাজিত হয়েছে। এখন বাংলাদেশে একটি সুন্দর, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার বাস্তব সুযোগ এসেছে। বিশ্বের বহু দেশে গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সংস্কার হয়েছে, বাংলাদেশও সেই গণতান্ত্রিক পথেই এগোচ্ছে।আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার, সরকারি কর্ম কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করা, সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা হ্রাস এবং বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণের মতো যুগান্তকারী পরিবর্তন সম্ভব হবে।তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতে সংবিধান ১৭ বার সংশোধন করা হয়েছে, যার মধ্যে কিছু সংশোধনী ছিল ব্যক্তি-কেন্দ্রিক ও স্বার্থান্বেষী। ভবিষ্যতে যেন সংবিধান সংশোধন জনগণের স্বার্থে ও যুক্তিসংগতভাবে হয়, সে জন্য সংসদে উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা জরুরি। জনগণের ভোটের অনুপাতভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে জুলাই সনদের কোনো বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।ইমাম ও ধর্মীয় নেতাদের উদ্দেশে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, সাধারণ মানুষের কাছে জুলাই সনদের সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সংস্কার সম্পন্ন হলে দেশে টেকসই গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য) মনির হায়দার বলেন, গণভোট বা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার প্রয়োজন হওয়ার কথা নয়, কারণ এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে সব রাজনৈতিক দল, সরকার ও জনগণের সম্মিলিত অঙ্গীকার। তবে ভয়ংকর মাত্রার মিথ্যা ও অপপ্রচারের কারণেই এই প্রচার কার্যক্রমে নামতে হয়েছে।তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালে পলাতক ফ্যাসিস্টদের হাতে থাকা বিপুল অবৈধ অর্থ এখন গণভোটবিরোধী অপপ্রচারে ব্যয় করা হচ্ছে। এই মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে সত্যকে সামনে আনার জন্যই আজকের এই আয়োজন। মনির হায়দার বলেন, গণভোটের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক দল অবস্থান নেয়নি; কেবল পলাতক ফ্যাসিস্টরাই ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিরোধিতা করছে।চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীনের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সম্মেলনে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিনসহ বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে বিভাগীয় পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক ইমাম ও ধর্মীয় নেতারা অংশ নেন।