মানুষ যখন ‘মানুষ’ হিসেবে অবহেলিত: ভবঘুরে জীবনের করুণ আর্তনাদ
দুনিয়াতে আমরা মানুষের ঘরে জন্মেছি বলেই আমাদেরকে মানুষ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে কারো বুলিতে একজন মানুষ, "মানুষ" হিসেবে বিবেচিত হয় না। বরং এর জন্য প্রয়োজন ভিন্ন কিছু গুণাবলীর। যার অর্জন একজন মানুষকে বানাতে পারে আশরাফুল মাখলুকাত বা শ্রেষ্ঠ জীব। এমন কিছু গুণাবলী সমৃদ্ধ বিষয়ের নাম হল তাকওয়া বা খোদাভীতি। একমাত্র খোদাভীতির ফলে একজন মানুষ হতে পারে সম্মানিত মানুষ।আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- اِنَّ اَکۡرَمَکُمۡ عِنۡدَ اللّٰہِ اَتۡقٰکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَلِیۡمٌ خَبِیۡرٌ অর্থ: 'প্রকৃতপক্ষে তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা বেশি মর্যাদাবান সেই, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশি মুত্তাকী। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু জানেন, সবকিছু সম্পর্কে অবহিত'। —আল হুজুরাত - ১৩আল্লাহ প্রদত্ত এত বড় সম্মানের স্বীকৃতি লাভের পরেও আমাদের সমাজের এক শ্রেণীর মানুষের জীবন যেন নিগৃহীত। মানুষ হয়ে বাঁচাটাও যেন তাদের জন্য বড় দায়। এমন এক শ্রেণীর জীবন আমাদের সমাজে "ভবঘুরে জীবন" হিসেবে পরিচিত। ভবঘুরে জীবন পরিচিতিভবঘুরের জীবন বলতে বোঝানো হয় ঐ সমস্ত ব্যক্তিদের, যাদের কোন বাড়ি ঘর নেই কিংবা তাদের কোন জীবনের লক্ষ্য নেই। রাস্তার পাশে জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় নোংরা কাপড় পরে কোনোমতে জীবনের ইতি টানায় যেন তাদের লক্ষ্য। সমাজের সর্বক্ষেত্রে যারা অবহেলিত। প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, বুঝার সুবিধার্থে সমাজের বিভিন্ন সেক্টরে তাদের অবহেলার নানান দিকগুলো আপনাদের খেদমতে তুলে ধরার প্রয়াস চালাবো । ইনশাআল্লাহ! অর্থ উপার্জন থেকে বঞ্চিত মানবসন্তান হয়েও এ সকল কঙ্কালসার মানুষগুলো নিজের জীবিকা নির্বাহের জন্য অর্থ উপার্জন থেকে বঞ্চিত থাকে। তীব্র ক্ষুধার যন্ত্রণায় তারা আহারের জন্য অন্যের কাছে হাত পাতে। যে সকল খাবার সাধারণ কোন মানুষের পক্ষে খাওয়া সম্ভব নয়, সেগুলো যেন তাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র পন্থা। এমনকি রাস্তার কুকুরগুলোর খাবারের পাত্রেও যেন তাদের জন্যে বরাদ্দ থাকে একটি অংশ। একটিবারের জন্যও কী কেউ তাদের এই সংকট নিরসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে! অবাক করার বিষয় হলো, আমাদের কেউ কেউ তো এদেরকে মানুষের গণ্ডির বাহিরের কিছু মনে করে থাকে। একটি বাস্তব অভিজ্ঞতাঢাকা কাকরাইল মসজিদের পাশের সড়কে নোংরা কিছু কাপড় পরিহিত একজন মা ও তার সন্তান শুয়ে আছে। রাত তখন আনুমানিক ১১ টা। মা আমার কাছে হাত পাতে সন্তানের খাবারের জন্য। ছেলেটি খাবারের জন্য কাঁদছে। ঝিরঝিরে ঠান্ডা বাতাস বইছে চারদিকে । মনে হয় শিশু বাচ্চাটির ঠান্ডাও লাগছে। অত্যন্ত ভয়ংকর এ দৃশ্য দেখে আমার চোখে পানি এসে যায়। সাধ্য অনুযায়ী আমি তাদেরকে কিছু সহযোগিতা করি। এমন চিত্র আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সড়কের আশপাশে দেখতে পাই। কিন্তু গভীরভাবে কতজন আমরা এসব নিয়ে ভাবি। অথচ সাহাবাদের জীবনী গ্রন্থ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা অসহায়, গরিব-দুঃখীদের কে নিজেদের পরিবারের সদস্য মনে করত। তাদের দুঃখ দুর্দশায় সবসময় এগিয়ে আসতো। এমনকি তাদের আয়রোজগার না থাকলে আয়-রোজগারের ব্যবস্থা করে দিত। সাহাবাদের এমন মহৎ গুণাবলীর কথা আল্লাহতায়ালা কুরআন কারীমের তুলে ধরেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন - وَیُؤۡثِرُوۡنَ عَلٰۤی اَنۡفُسِہِمۡ وَلَوۡ کَانَ بِہِمۡ خَصَاصَۃٌ ؕ۟ অর্থ: 'এবং তাদেরকে তারা নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয়, যদিও তাদের অভাব-অনটন থাকে'। —আল হাশ্র - ৯বুখারী শরীফের বর্ণনা। রাসূল সাল্লাল্লাহু সালাম এরশাদ করেন-فِي كُلِّ كَبِدٍ رَطْبَةٍ أَجْرٌ“প্রত্যেক জীবিত প্রাণীর সেবায় সওয়াব রয়েছে।” (সহিহ বুখারি: ২৪৬৬) অতএব আমাদের উচিত, এ সকল অসহায় দুঃস্থদের সেবায় এগিয়ে আসা। এবং তাদের আর্থিক সংকট নিরসনের একটি যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। আল্লাহপাক আমাদের প্রত্যেককে তাওফীক দান করুন। চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত দীর্ঘদিন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও খাবারের ফলে তারা বিভিন্ন মারাত্মক রোগে জড়িয়ে পড়ে। আর এর ফলে তাদের জীবনের যাত্রার ইতি ঘটে। একজন মানুষ হিসাবে চিকিৎসা সেবার যতটুকু প্রয়োজন ছিল, বর্তমান এই সমাজে তারা সেই সেবাটুকু থেকেও বঞ্চিত। কুকুর বিড়ালের মতই এভাবেই তাদেরকে জীবনযাত্রা করতে হচ্ছে আজ। তাদের রোগ মুক্তি ও সুস্বাস্থ্যের জন্য একটি সুবিন্যস্ত ব্যবস্থাপনা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এরপরেও নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিত তাদের খোঁজখবর নেওয়া। অসুস্থ হলে তাদের সেবা শুশ্রূষা করা। তিরমীজি শরীফের বর্ণনা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-مَنْ عَادَ مَرِيضًا أَوْ زَارَ أَخًا لَهُ فِي اللَّهِ نَادَاهُ مُنَادٍ أَنْ طِبْتَ وَطَابَ مَمْشَاكَ وَتَبَوَّأْتَ مِنَ الْجَنَّةِ مَنْزِلًاঅর্থ:'যে ব্যক্তি কোনো অসুস্থকে দেখতে যায় বা আল্লাহর জন্য কোনো ভাইকে সাক্ষাৎ করে, একজন আহ্বানকারী তাকে ডেকে বলে—“তুমি কল্যাণ লাভ করেছ, তোমার চলা বরকতময় হয়েছে এবং জান্নাতে তোমার জন্য একটি বাসস্থান নির্ধারিত হয়েছে'।(তিরমীজি, হাদিস: ২০০৮)পারিবারিক জীবন গঠন থেকে বঞ্চিত মানুষ হিসেবে মানুষের কিছু মানবিক চাহিদা থাকে। এটাই স্বাভাবিক। যৌবনের প্রারম্ভে পৌঁছালে একজন মানুষের একটি সঠিক পন্থায় সেই চাহিদা পুরা করতে হয়। কিন্তু তারা সেটুকু অধিকার থেকেও বঞ্চিত। সুস্থভাবে তাদের এই চাহিদা বৈবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পাদিত হয় না। ফলে স্বামী স্ত্রী ছেলে সন্তানদের আদর সমাদর যেন তাদের জন্যে একটি গল্পকাহিনীর মত। ছেলে সন্তান থেকেও যেন তারা নিঃসন্তান। মা-বাবার থেকেও যেন তারা সর্বহারা। নিজ স্বামী থেকেও যেন তারা বিধবা। আমাদের উচিত, সমাজের এই নিকৃষ্ট গণ্ডি থেকে তাদেরকে বের করে এনে একটি মানবিক জীবন তাদের কে উপহার দেওয়া। গৃহহীন জীবন যাপন গৃহহীন ব্যক্তিই বুঝে একটি ঘরের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু। একটি ঘর সভ্যতা ও সম্ভ্রম রক্ষার অন্যতম উপায়। ইতিহাস ঐতিহ্যকেও বহন করে। শীত কিংবা গরম, রোদ কিংবা বৃষ্টি প্রত্যেক প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে নিরাপদে থাকার এক অনন্য উপকরণ হলো ঘর। এমন ছোট্ট একটি ছাপরা ঘরও কপালে জোটে না এসব দূর্ভাগাদের। প্রতিনিয়ত প্রতিকূল পরিবেশের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদেরকে। বিভিন্ন কঠিন দুর্যোগের মুহূর্তে এদের জন্য মেলেনা একটুকরো আশ্রয়স্থল। এদের নিভৃত এই আহাজারি কে শুনবে! আজকের মানবতা নিস্তব্ধ! মানবতার স্লোগান থাকলেও মানুষত্ববোধের কিছুই নেই আমাদের মাঝে। আমরা দোয়া করি, আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের মাঝে মানুষত্ববোধ জাগ্রত করে দিন। আমীন।ভবঘুরে জীবন যেন একটি অভিশাপ নিঃসঙ্গ একটি জীবন। সমাজের কোথাও যাদের কোন ঠাঁই মেলে না। এদেরকে সকলেই ঘৃনা করে। ফলে এরা নিজেদের জীবনে কিছু জঘন্য অধ্যায়কে বেছে নেয়। কেউ ভয়ংকরভাবে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আবার কেউ অন্যায় ভাবে মানুষের হত্যার বলি হয়। সাম্প্রতিককালের একটি ঘটনা বিষয়টিকে সারা বিশ্বজুড়ে চিত্রায়িত করেছে। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী, একজন ভবঘুরে বেশধারী ব্যক্তি অন্যায়ভাবে একাধারে ছয়জন ভবঘুরে ব্যক্তিকে নির্মমভাবে হত্যা করে। (যমুনা নিউজ)এ ছাড়াও আমাদের সমাজে এমনও কিছু নিকৃষ্ট মানুষ আছে, যারা তাদেরকে যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণের বস্তু হিসেবে ব্যবহার করে। সম্প্রতি কালের একটি ঘটনার বিবরণ রাস্তার পাশে এক ভবঘুরে নারী প্রেগন্যান্ট। বিষয়টি ভাবতেও অবাক লাগে। পরবর্তীতে প্রকাশ হয়, যে রাত্রে কোন এক পথচারী তার সাথে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে । যার ফলে তার পেটে সন্তান এসে যায়। এভাবেই তারা তাদের অভিশপ্ত এই জীবনটা কোনমতে পার করে দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করে থাকে।ভবঘুরের জীবনের নেপথ্যে কারা?আমাদের সমাজে কিছু অসাধু ব্যক্তি রয়েছে, যারা মানুষের সেবা তো দূরের কথা মানুষকে মানুষ হিসেবেই বিবেচনা করে না। বাধ্য হয়ে কিছু মানুষ তাদের সাথে লেনদেন করতে চাইলে চড়া মূল্যে তারা সুদের লেনদেন করে। ফলে কিছু মানুষ সর্বস্বহারা হয়ে তারা ভবঘুরে জীবনের পথ অবলম্বন করে। আর এভাবেই একটি সুন্দর জীবন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। শুধু সুদী কারবার নয়, এছাড়াও আরো অনেক কারণ রয়েছে যার ফলে বিভিন্ন মানুষ সর্বস্ব হারা হয়ে পথের দ্বারে বসবাস করতে থাকে।আমাদের সকলের করণীয় একজন মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ববোধ থাকা প্রয়োজন। বুখারী শরীফের বর্ণনা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,الا كلكم راع وكلكم مسؤول عن رعيته.অর্থ: তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল। এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। (সহিহ বুখারী: ৫২০০)হাদিসে বর্ণিত দায়িত্ববোধকে ধারণ করে যেন আমরা প্রত্যেকে এ সকল নিগৃহীত মানুষের সেবায় এগিয়ে আসি। তাদেরকে এ সংকটময় জীবন থেকে উদ্ধার করি। তাদের যাবতীয় সকল প্রয়োজন পূরণের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করি। সর্বশেষ কথা হল,মানুষ হিসেবে আমরা সকলেই মিলেমিশে বসবাস করি, এটাই যেন হয়, আমাদের অঙ্গীকার। মানবতার প্রতি যেন আমাদের সকলের থাকে ভালোবাসা। তবেই আমরা হতে পারব, একজন উৎকৃষ্ট মানব। আল্লাহতায়ালা আমাদের প্রত্যেককে তাওফীক দান করুন। আমীন!