দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ফ্রান্সের স্ট্রাসবার্গে নির্মিত ইউরোপের বৃহত্তম মসজিদ 'আইয়ুব সুলতান' চলতি বছরের গ্রীষ্মের শেষ নাগাদ উদ্বোধনের জন্য প্রস্তুত। ২০১৭ সালে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন উগ্রবাদী রাজনৈতিক উস্কানি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অতিক্রম করে প্রকল্পটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এটি কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং একটি সমন্বিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স হিসেবে কাজ করবে।নির্মাণাধীন এই মসজিদটিকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘসময় ধরে নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়েছে।অতি-ডানপন্থী নেত্রী মেরিন লে পেন এবং ম্যারিয়ন মারেচাল এই প্রকল্পটিকে 'রাজনৈতিক ইসলামের বিস্তার' হিসেবে অভিহিত করে একাধিকবার উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন।২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর ম্যারিয়ন মারেচাল মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে একটি ভিডিও ধারণ করেন, যেখানে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করা হয়।রাজনৈতিক এই মেরুকরণের ফলে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় এবং মসজিদ পরিচালনা পর্ষদ মাঝেমধ্যেই হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিপরীতে কোনো আইনি অসংগতি প্রমাণ করতে পারেনি বিরোধীরা।মিল্লি গোরাস কনফেডারেশন (CIMG) ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব শাহিন আনাতোলু নিউজ এজেন্সিকে জানিয়েছেন, সমস্ত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মসজিদটি এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায়।এটি ইউরোপের অন্যতম বিস্তৃত ইসলামী কমপ্লেক্স। এখানে নামাজের স্থানের পাশাপাশি শিক্ষা কেন্দ্র, সামাজিক অনুষ্ঠানস্থল এবং সাংস্কৃতিক সেবার ব্যবস্থা রয়েছে।আইয়ুব শাহিন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, এই বিশাল প্রকল্পের জন্য কোনো রাষ্ট্রীয় অনুদান নেওয়া হয়নি। এটি সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় জনগণের অনুদান এবং সংহতির মাধ্যমে নির্মিত হয়েছে।মজার বিষয় হলো, উগ্রবাদীরা যখন বিরোধিতা করছিল, তখন স্থানীয় খ্রিস্টান সম্প্রদায় এবং গির্জাগুলো মুসলিমদের পাশে দাঁড়িয়েছে। এমনকি একজন স্থানীয় যাজক ব্যক্তিগতভাবে অনুদান দিয়ে ভ্রাতৃত্বের অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। যাজকটির ভাষ্যমতে, এটি তার পূর্বপুরুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং মানবিকতার দায়বদ্ধতা।ইউরোপে ক্রমবর্ধমান ইসলামোফোবিয়া বা মুসলিম বিদ্বেষের প্রেক্ষাপটে আইয়ুব সুলতান মসজিদের সফল সমাপ্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।মসজিদ কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই ফরাসি আইন ও প্রশাসনিক নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলেছে। বারবার বাধা আসা সত্ত্বেও তারা আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে নির্মাণকাজ চালিয়ে গেছে।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণ নাগরিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। এই প্রকল্পটির সমাপ্তি ইউরোপে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।রাজনৈতিক ব্যক্তিরা যখন একটি ধর্মীয় স্থাপনাকে অস্থিতিশীলতার হাতিয়ার বানাতে চেয়েছেন, তখন আইয়ুব শাহিন ‘ধৈর্য এবং উত্তম চরিত্রের’ মাধ্যমে তার জবাব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।স্ট্রাসবার্গের এই আইয়ুব সুলতান মসজিদটি উসমানীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। ২০১৭ সালে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর থেকেই এটি স্থানীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। বিশেষ করে ফ্রান্সের নতুন বিচ্ছিন্নতাবাদ বিরোধী আইনের আবহে এই মসজিদের অর্থায়ন ও পরিচালনা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছিল।আইয়ুব সুলতান মসজিদটি কেবল ইটের স্থাপনা নয়, বরং এটি ইউরোপের বুকে মুসলিমদের ধৈর্য এবং আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির এক নতুন প্রতীক। উগ্রবাদের বিপরীতে সহাবস্থানের এই বার্তাটিই এখন বিশ্বদরবারে প্রাসঙ্গিক।