অস্ট্রিয়ায় ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ নিষিদ্ধকরণের খসড়া আইনের প্রস্তাবনা ঘিরে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবার, সংহতি ও ইউরোপীয় বিষয়ক মন্ত্রী ক্লাউডিয়া বাউয়ার দেশটির আইনগতভাবে স্বীকৃত সরকারি প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা 'অস্ট্রিয়ান ইসলামিক কমিউনিটি' (IGGÖ)-কে বন্ধ করে দেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়ায় মুসলিম সমাজসহ রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম ক্ষোভের জন্ম হয়েছে। ভিয়েনার মেয়র মাইকেল লুডভিগ চরমপন্থী সংস্থাকে দমন করার অজুহাতে একটি বৈধ ধর্মীয় সংস্থাকে হুমকির মুখে ফেলার নীতিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।অস্ট্রিয়ার পরিবার, সংহতি ও ইউরোপীয় বিষয়ক মন্ত্রী ক্লাউডিয়া বাউয়ার সম্প্রতি দেওয়া এক মন্তব্যে নতুন বিতর্কের উসকানি দিয়েছেন। অস্ট্রিয়ান নিউজ এজেন্সি (এপিএ)-কে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি জানান, দেশে ‘রাজনৈতিক ইসলামের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে একটি খসড়া আইন তৈরি করা হচ্ছে, যার উদ্দেশ্য মুসলিম ব্রাদারহুডসহ বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা। তবে এই নতুন আইনি কাঠামোর আওতায় আইনগতভাবে স্বীকৃত মুসলিম প্রতিনিধিত্বশীল সংস্থা ‘অস্ট্রিয়ান ইসলামিক কমিউনিটি’ (IGGÖ) প্রভাবিত বা বন্ধ হতে পারে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, 'আমি মনে করি না যে এর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায়'।বাউয়ার আরও দাবি করেন, তথাকথিত "রাজনৈতিক ইসলাম" দেশটির প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অলক্ষ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি আইজিজিও-কে তাদের সীমানা স্পষ্ট করার আহ্বান জানান এবং দাবি করেন যে মৌলবাদ ও চরমপন্থা দমনে সংস্থাটির দৃশ্যমান ভূমিকা তিনি দেখতে পাননি।মন্ত্রীর এই দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ভিয়েনার মেয়র মাইকেল লুডভিগ। এপিএ-কে দেওয়া বক্তব্যে মেয়র বলেন, চরমপন্থা চাই তা ইসলামপন্থী হোক বা উগ্র-ডানপন্থী, তার বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনি লড়াই চালাতে হবে; কিন্তু এই আলোচনায় একটি সতর্ক পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, আইজিজিও অস্ট্রিয়ার আইনত স্বীকৃত একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং দেশটির মুসলিমদের আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিনিধিত্ব করে। লুডভিগ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, চরমপন্থী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত আইনি হাতিয়ার বা পদ্ধতি প্রয়োগ করে একটি স্বীকৃত সংস্থাকে হুমকি দেওয়ার মতো পদক্ষেপকে তিনি ভিয়েনার মেয়র হিসেবে কখনোই সমর্থন করবেন না।এদিকে, সরকারের এমন অবস্থানের প্রতিবাদে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে আইজিজিও (IGGÖ)। সংস্থাটি লিখিত বিবৃতিতে জানায়, রাজনৈতিক বা চরমপন্থী উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার, গণতান্ত্রিক আইন ব্যবস্থার প্রত্যাখ্যান এবং নারী স্বাধীনতার বিরোধী যেকোনো মতাদর্শের স্থান আইজিজিও বা অস্ট্রিয়ান সমাজে নেই। তারা উল্লেখ করে, রাজনীতি ও গণমাধ্যমে অবাধে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ পরিভাষাটির ব্যবহারের ফলে অতীতে সাধারণ মুসলিমদের পাশাপাশি তাদের স্বীকৃত সংস্থাকেও পাইকারি অভিযুক্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে।আইজিজিও জোর দিয়ে বলেছে, নতুন কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপের পূর্বে লক্ষ্যবস্তু চরমপন্থী আচরণ ও কাঠামোর সুস্পষ্ট আইনি সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে হবে, যাতে বৈধ ধর্মীয় কর্মকাণ্ড এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থার পরিপন্থী কাজের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকে। রাষ্ট্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে গঠনমূলক সংলাপ বজায় রাখার বিষয়ে মন্ত্রী বাউয়ারের বিশেষ দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও তার বর্তমান অবস্থানে কোনো সংবেদনশীলতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলেও সংস্থাটি ক্ষোভ প্রকাশ করে।আইজিজিও-এর সভাপতি উমিত ভুরাল এক বিবৃতিতে বলেন, 'চরমপন্থা যে রূপেই আসুক না কেন, তা আমাদের মৌলিক ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। অস্ট্রিয়ায় ১১০ বছরেরও বেশি পুরনো সমৃদ্ধ ইতিহাসের অংশ হিসেবে আমরা নিঃশর্তভাবে দেশের সংবিধান ও আইনের শাসনের পাশে রয়েছি'।উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে ৩১শে আগস্ট অস্ট্রিয়ার প্রধানমন্ত্রী ক্রিশ্চিয়ান স্টোকার সাংবিধানিক পর্যায়ে 'রাজনৈতিক ইসলাম' নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানান। পরবর্তীতে ১লা সেপ্টেম্বর থেকে স্কুলে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য হিজাব নিষিদ্ধকরণের আইন বাস্তবায়ন করা হয়। বিতর্কিত হিজাব নিষেধাজ্ঞা এবং একের পর এক মুসলিমবিদ্বেষী সরকারি পদক্ষেপে স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন, রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ মুসলিম কমিউনিটির মধ্যে মারাত্মক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
সহজ ও দ্রুত খবরের আপডেট পেতে আমাদের অ্যাপটি ইন্সটল করুন।