ভারতের কর্নাটক রাজ্যের বিজাপুর (বিজয়পুরা) জেলার আটজন মুসলিম নারী কাগজে-কলমে নিজেদের মৃত ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ব্যাঙ্গালুরুতে এক নজিরবিহীন সংবাদ সম্মেলন করেছেন। ‘জাগৃতা কর্নাটক’ নামের সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে জীবিত নারীরা তাদের নামে তৈরি ভুয়া মৃত্যু সনদ দেখিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) চরম কারচুপি ও বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেন। তারা অভিযোগ করেছেন, মুসলিম ভোটারদের নির্বাচনী তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলতেই উগ্র হিন্দুত্ববাদী চক্রান্তের অংশ হিসেবে এই জালিয়াতি করা হয়েছে।ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধনের (স্পেশাল ইন্টেন্সিভ রিভিশন - এসআইআর) নামে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ভোটাধিকার হরণের এক আশঙ্কাজনক চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে। কর্নাটকের বিজয়পুরার দীর্ঘ ৩০ বছরের বাসিন্দা রাজিয়া শেখ, যিনি পেশায় একজন অঙ্গনওয়াড়ি সহকারী, ব্যাঙ্গালুরুর সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ ও দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেন। নিরক্ষর এই নারী প্রতিবন্ধী স্বামীর পরিবার পরিচালনা করেন। কাগজে-কলমে নিজের ‘মৃত্যু’র খবর শুনে তিনি আতঙ্কিত, কারণ এর ফলে সরকারি রেশন কার্ডসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন তিনি।সংবাদ সম্মেলনে মহাবুবী শেখ ও মালানি জমাদারসহ ভুক্তভোগী অন্য নারীরা নির্বাচন কমিশনের নিকট সেইসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে এফআইআর (FIR) দায়ের করার জোর দাবি জানান, যারা এই ভুয়া সনদ প্রদান ও জমা দিয়েছেন। তারা স্পষ্ট অভিযোগ করেন, শুধুমাত্র মুসলিম হওয়ার কারণেই তাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চেষ্টা চালানো হয়েছে।‘জাগৃতা কর্নাটক’-এর আহ্বায়ক এইচ ভি বাসু এই জালিয়াতির পেছনের প্রক্রিয়া উন্মোচন করেন। তিনি জানান, বিজেপি থেকে সম্প্রতি বহিষ্কৃত হলেও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় বিজয়পুরার বিধায়ক বাসনাগৌড়া পাতিল ইয়াতনাল গত ৩১ আগস্ট নির্বাচন কর্তৃপক্ষের কাছে ১,০৫৪ জন ব্যক্তির একটি তালিকা জমা দেন। মাত্র সাত দিনের মধ্যে ১৯৮টি পোলিং বুথের তালিকা যাচাই করে এত বিশালসংখ্যক মানুষকে ‘মৃত’ বলে দাবি করা রাজনৈতিক চক্রান্তের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, জমাকৃত ১,০৫৪টি নামের মধ্যে মাত্র ৮টির ক্ষেত্রে মৃত্যু সনদ সংযুক্ত করা হয়েছিল—যার আটটিই মুসলিম নারীদের এবং কাকতালীয়ভাবে তাদের প্রত্যেকেই জীবিত! বাসু প্রশ্ন তোলেন, শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ ডেটাবেজে সংরক্ষিত রঙিন ভোটার আইডি ছবি কীভাবে ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটার ফাইলে পৌঁছাল? নামের সামান্য বানান ভুলকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে এই নারীদের ‘মৃত’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিক ইরফান শেখ আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত ‘ফর্ম-৭’ (Form 7)-এর প্রায় ১৩,০০০ কপি দুই দফায় পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচন কমিশন স্ব-ঘোষণা (Self-declaration) বাধ্যতামূলক করার পরপরই রহস্যজনকভাবে ওইদিন সন্ধ্যায় সব আবেদন প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।আইনি পদক্ষেপ ও ফৌজদারি মামলার দাবিতে সোচ্চার হওয়া এই আট নারী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার এই উগ্র সাম্প্রদায়িক জালিয়াতির বিরুদ্ধে তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই করবেন।
সহজ ও দ্রুত খবরের আপডেট পেতে আমাদের অ্যাপটি ইন্সটল করুন।