কানাডার কুইবেকে প্রকাশ্য স্থানে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণ-ইবাদত নিষিদ্ধ ঘোষণা
কানাডার ফরাসি ভাষী প্রদেশ কুইবেকের সরকার ধর্মনিরপেক্ষতাকে শক্তিশালী করার অজুহাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনাগুলোতে ইবাদত বা প্রার্থনার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ‘৯ নম্বর বিল’ (Bill 9) নামক এই নতুন আইনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে প্রকাশ্য পার্ক পর্যন্ত ধর্মীয় কার্যক্রমকে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে, যা স্থানীয় মুসলিম ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।কুইবেক সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, রাষ্ট্রকে ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত রাখতেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কুইবেকের ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়ক মন্ত্রী জিন-ফ্রঁসোয়া রোবার্জ এই পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, "এই নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রের ধর্মীয় নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং সকল নাগরিকের মধ্যে সমতা বজায় রাখা।"সরকার পক্ষের দাবি অনুযায়ী, সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের প্রাধান্য থাকা উচিত নয়। এই আইনের আওতায় সরকারি শিশু যত্ন কেন্দ্রে (ডে-কেয়ার) কর্মরতদের ধর্মীয় প্রতীক পরিধানে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া, সরকারি হাসপাতালে নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের খাদ্যাভ্যাস (যেমন হালাল বা কোশার মেনু) একচেটিয়াভাবে অনুসরণ করা যাবে না বলে সরকারি নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের মতে, এটি বিভাজন কমিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনে সহায়তা করবে।৬ এপ্রিল কার্যকর হওয়া এই বিতর্কিত আইনের মাধ্যমে কুইবেকের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইবাদত বা নামাজের জন্য নির্দিষ্ট কক্ষ রাখা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সিবিসি (CBC) নিউজ জানায়, নতুন এই আইনের ফলে এখন থেকে মিউনিসিপ্যাল কর্তৃপক্ষের আগাম অনুমতি ছাড়া পার্ক বা উন্মুক্ত কোনো স্থানে দলবদ্ধভাবে প্রার্থনা করা যাবে না।এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কুইবেকের কয়েক লক্ষ মুসলিম শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিক। তারা এখন বিশ্ববিদ্যালয় বা কর্মস্থলে জোহরের নামাজ বা জুমার মতো জামাত আদায়ের স্থান হারাচ্ছেন। এছাড়া, যেসব বেসরকারি স্কুল ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ছাত্র ভর্তি বা শিক্ষক নিয়োগ দেয়, তাদের জন্য সরকারি অনুদান পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, অনেক আগে থেকেই কুইবেকে হিজাব বা ধর্মীয় পোশাকের ওপর চাপ ছিল, কিন্তু এবারের আইনটি সরাসরি ইবাদতের অধিকারের ওপর আঘাত হেনেছে। স্থানীয় মুসলিম কমিউনিটির নেতারা একে ‘অধিকার হরণের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও কানাডার নিজস্ব ‘চার্টার অফ রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমস’ অনুযায়ী, প্রতিটি নাগরিকের তার ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ মানে ধর্মহীনতা নয়, বরং সকল ধর্মের মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের সমান আচরণ। তবে কুইবেকের এই আইনটি নিরপেক্ষতার চেয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দৃশ্যমানতাকে মুছে ফেলার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাবলিক ফান্ডিং বন্ধ করা বা প্রার্থনার কক্ষ বন্ধ করে দেওয়া মূলত বিশেষ একটি গোষ্ঠীকে কোণঠাসা করার নামান্তর। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইতোমধ্যেই এই আইনের ফলে ধর্মীয় বৈষম্য বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে।