কালান্দিয়ায় ইউএনআরডব্লিউএ কেন্দ্র দখল, দায় স্বীকার করলেন নেতানিয়াহু
আন্তর্জাতিক সংস্থাকে প্রদত্ত বিশেষাধিকার এবং জাতিসংঘের দায়মুক্তি আইনকে প্রকাশ্যে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের কালান্দিয়ায় অবস্থিত জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (UNRWA)-র ঐতিহাসিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি দখল করে নিয়েছে ইসরায়েল। মঙ্গলবার ইসরায়েলি বাহিনীর সশস্ত্র উপস্থিতিতে উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির কেন্দ্রটিতে ইসরায়েলি পতাকা উত্তোলন করেন। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সরাসরি এ উচ্ছেদ অভিযানের নির্দেশ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন, যা ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের ওপর এক চরম ও পরিকল্পিত আঘাত।অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জাতিসংঘের সমস্ত মানবিক কার্যক্রম স্তব্ধ করা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাকে সম্পূর্ণ উচ্ছেদের ইসরায়েলি ষড়যন্ত্র নতুন মাত্রা লাভ করেছে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রে স্বীকৃত ৪৯টি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মিশন ও সংস্থার প্রতিনিধিরা ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের পরিস্থিতি এবং জাতিসংঘের সংস্থাটির কাজে ইসরায়েলি প্রতিবন্ধকতা সরেজমিনে পরিদর্শনের মাত্র একদিনের মাথায় এই হঠকারী ও আন্তর্জাতিক অপরাধমূলক অভিযান চালায় তেল আবিব।মঙ্গলবারের এই নগ্ন দখলদারিত্বের পর চরমপন্থী ইসরায়েলি মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'এক্স'-এ একটি ছবি পোস্ট করেন। সেখানে দেখা যায়, কালান্দিয়া কেন্দ্রটির প্রবেশপথে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের দেশের পতাকা উত্তোলন করছে। ছবিটি শেয়ার করে দম্ভভরে তিনি লেখেন, "ইউএনআরডব্লিউএ এখন আমাদের হাতে।" আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, চরম অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট এবং নির্বাচনকে সামনে রেখে চরমপন্থী ইহুদি গোষ্ঠী ও উগ্র ডানপন্থীদের সমর্থন ধরে রাখতেই নেতানিয়াহু সরকার এই চরম আন্তর্জাতিক অপরাধের আশ্রয় নিয়েছে।পরবর্তীকালে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু অভিযানের সরাসরি দায় স্বীকার করে বলেন, "আমার নির্দেশনা অনুযায়ী এবং আমাদের প্রণীত আইন মেনে, জেরুজালেমের কালান্দিয়ার সংলগ্ন কাফর আকাবে অবস্থিত ইউএনআরডব্লিউএ কম্পাউন্ড থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার কাজ আজ শুরু হয়েছে।" তিনি আরও স্পষ্ট হুমকি দিয়ে বলেন, ইসরায়েল অধিকৃত কোনো স্থানে ইউএনআরডব্লিউএ-কে কার্যক্রম চালাতে দেবে না এবং রাষ্ট্রীয় সব শক্তি ব্যবহার করে তাদের নিষিদ্ধ করা হবে।ভূমি দখল ও মুসলিম জনতাত্ত্বিক চরিত্র ধ্বংসের চক্রান্ত ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, উক্ত ভূমিতে জেরুজালেম পৌরসভার অর্থায়নে একটি "নতুন শিক্ষা ও সামাজিক কমপ্লেক্স" স্থাপন করা হবে, যা নাকি হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে পরিষেবা দেবে। মন্ত্রণালয় দাবি করে, ১৯৩৭ সাল থেকে এই জমিটি ‘জুয়িশ ন্যাশনাল ফান্ড’-এর মালিকানাধীন।তবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিক্ষার অজুহাতে এই ভূমি বাজেয়াপ্তকরণ মূলত অধিকৃত জেরুজালেমে ইসরায়েলি দখলদারিত্বকে সুসংহত করার চেষ্টা। এটি জেরুজালেমের মুসলিম ও ফিলিস্তিনি জনতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক চরিত্র ধুলিসাৎ করার এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র।জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সুরক্ষা ও কেন্দ্রটির গুরুত্ব সংস্থাটির পক্ষ থেকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কালান্দিয়া কেন্দ্রসহ ইউএনআরডব্লিউএ-র প্রতিটি স্থাপনা জাতিসংঘের বিশেষাধিকার ও দায়মুক্তির অধীনে সুরক্ষিত।ঐতিহাসিক ভিত্তি ও চুক্তি: ১৯৫২ সালের ১৬ অক্টোবর জর্ডান সরকারের সাথে স্বাক্ষরিত একটি কার্যকর চুক্তির অধীনে ইউএনআরডব্লিউএ-কে এই জমিটি হস্তান্তর করা হয় এবং এটি ছিল সংস্থাটির প্রথম বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।বিশাল অবকাঠামো: ৮০ ডুনাম এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই সেন্টারে রয়েছে আধুনিক প্রশিক্ষণ কর্মশালা, শ্রেণীকক্ষ, ছাত্রাবাস ও প্রশাসনিক ভবন, যার সম্পদের বর্তমান মূল্য ৫০ লাখ (৫ মিলিয়ন) মার্কিন ডলারের বেশি।কারিগরি শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু: প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছর প্রায় ৩৪০ জন তরুণ ফিলিস্তিনি শরণার্থীকে ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, অটোমোটিভ মেকাট্রনিক্স, কনস্ট্রাকশন ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনসহ ১৬টি বিশেষায়িত কারিগরি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়। এখানকার ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী কোর্স সম্পন্ন করেই কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারেন।২০২৪ সালের অক্টোবরে নেসেটে পাস করা একটি বেআইনি আইনের দোহাই দিয়ে এবং ২০২৫ সালের শুরুতে অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের শেখ জাররাহতে অবস্থিত ইউএনআরডব্লিউএ-র মূল সদর দপ্তর বন্ধ ও বাজেয়াপ্ত করার পর, এবার কালান্দিয়ার এই ঐতিহাসিক শিক্ষাকেন্দ্রে আঘাত হানল বর্ণবাদী দখলদার বাহিনী। ১৯৪৯ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে গঠিত এ সংস্থাটি গাজা, পশ্চিম তীর, জর্ডান, লেবানন ও সিরিয়ায় লাখ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থীর জীবনধারণ ও অধিকার রক্ষায় কাজ করে আসছে। ইসরায়েলের এই দখলদারিত্ব বিশ্বব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সরাসরি এক খোলা চ্যালেঞ্জ।