বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
কওমী টাইমস

মজলুমের কোনো ধর্ম বা জাতি হয় না, তাদের আরশ কাঁপানো দীর্ঘশ্বাস জালিমদের ধ্বংস করবেই: প্রেসিডেন্ট এরদোগান

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোগান বলেছেন, তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট (কিজিলায়) ফিলিস্তিন, বসনিয়া, আফগানিস্তান, সোমালি, ইরাক ও সিরিয়াসহ মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি মজলুম ও ক্ষতিগ্রস্ত ভাই-বোনদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। ১১ জুন আঙ্কারার বেশতেপে মিল্লেত কংগ্রেস ও সংস্কৃতি কেন্দ্রে আয়োজিত 'তুর্কি কিজিলায় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে' প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ কথা বলেন। একই সাথে তিনি ফিলিস্তিনে চলমান ইহুদিবাদী আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে হুঁশিয়ারি দেন যে, যারা আজ হিটলারের পথ অনুসরণ করছে, ইতিহাসের অন্য সব জালিমদের মতোই তাদের পতন ও বিচার অনিবার্য।তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট (কিজিলায়)-এর ১৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আঙ্কারার বেশতেপে মিল্লেত কংগ্রেস ও সংস্কৃতি কেন্দ্রে এক বর্ণাঢ্য পুরস্কার বিতরণী ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোগান সংস্থাটির দীর্ঘ ঐতিহাসিক গৌরব ও বিশ্বজুড়ে এর মানবিক তৎপরতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি কিজিলায়ের দাতা, কর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে বিশ্বের আনাচে-কানাচে ইসলামের মানবিক মূল্যবোধ ও সহমর্মিতার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন।বক্তব্যের শুরুতেই এরদোগান কিজিলায়ের প্রতিষ্ঠাতা ড. মার্কো পাশা, ড. আবদুল্লাহ বে, ক্রিমিয়ান আজিজ বে এবং সেরদার-ই একরেম ওমর পাশাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। একই সাথে সংস্থাটির হয়ে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন সংকট ও যুদ্ধকবলিত এলাকায় যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।আর্তের সেবায় ধর্ম ও বর্ণের ভেদাভেদ নেইপ্রেসিডেন্ট এরদোগান তাঁর ভাষণে তুর্কি জাতির ঐতিহাসিক ও নৈতিক দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, "ইতিহাসের প্রতিটি পৃষ্ঠায় যেখানেই তুর্কি জাতি রয়েছে, সেখানেই নৈতিকতা, সদগুণ, শভলতা ও করুণার ইতিহাস রয়েছে। সংহতি, অংশীদারিত্ব এবং কল্যাণের প্রতিযোগিতা আমাদের জাতীয় চরিত্রের মূল উপাদান। আমাদের মূল চেতনা এতটাই গভীর যে, কারো কষ্ট দূর করতে বা ক্ষত নিরাময় করতে আমাদের কোনো ভাষা বা অভিধানের প্রয়োজন হয় না। মজলুম ও ক্ষতিগ্রস্তদের কোনো ভাষা, ধর্ম বা মাযহাব জিজ্ঞেস করা হয় না। সাহায্যপ্রার্থীর জাতি, গায়ের রং বা বংশ কী, তা আমরা দেখি না। অসহায়, দরিদ্র ও এতিমদের দোয়া নেওয়া এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ছাড়া আমাদের আর কোনো লক্ষ্য নেই।"অটোমান আমল থেকে জিহাদের ময়দানে কিজিলায়১৮৬৮ সালের ১১ জুন 'অটোমান সোসাইটি ফর এইড টু উন্ডেড অ্যান্ড সিক সোলজার্স' নামে যাত্রা শুরু করা এই সংস্থাটি কীভাবে প্রতিটি ক্রান্তিকালে মুসলিম উম্মাহ ও তুর্কি সেনাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, তা স্মরণ করেন এরদোগান। তিনি বলেন, ৯৩-এর যুদ্ধ থেকে শুরু করে সাইপ্রাস শান্তি অভিযান, চিলানাক্কালে বিজয়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে কিজিলায়ের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। কেবল স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ই এই সংস্থাটি ফ্রন্টে ৪০ হাজার বাক্স চিকিৎসা সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছিল।গাজা ও লেবাননে কিজিলায়ের ভূমিকাফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জায়নবাদী সলতানিয়তের গণহত্যা ও বর্বরতার বিরুদ্ধে কিজিলায়ের ভূমিকার প্রশংসা করে এরদোগান বলেন, "৭ অক্টোবরের পর থেকে এ পর্যন্ত গাজায় ২৬ হাজার টনেরও বেশি মানবিক সহায়তা সামগ্রী পাঠিয়েছে কিজিলায়। মজলুম গাজাবাসীর জন্য ১৫ মিলিয়ন বেলার গরম খাবার পরিবেশন করা হয়েছে এবং দৈনিক ৩০ হাজার মানুষকে লঙ্গরখানার মাধ্যমে খাবার দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া কোরবানি ক্যাম্পেইনের আওতায় ২২ হাজার ৭৫৭টি অংশ কোরবানি দিয়ে গাজায় বিতরণ করা হয়েছে। যুদ্ধবিরতির পর শিশুদের মানসিক ট্রমা কাটাতে 'গাজা, আনন্দিত শিশু প্রকল্প' চালু করা হয়েছে। ইসরায়েলি বর্বরতার শিকার লেবাননেও কিজিলায় আমাদের মুখ উজ্জ্বল করছে।"হিটলারের পথযাত্রীদের রেহাই নেইইসরায়েলের উগ্র জায়নবাদী সরকারের তীব্র সমালোচনা করে এরদোগান বলেন, "বর্তমান প্রশাসনের অধীনে ইসরায়েল এমন এক ফিতনা তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে, যার কাঁচামাল কেবল রক্ত, অশ্রু, অস্থিতিশীলতা এবং বিশৃঙ্খলা। রক্তের গন্ধ পাওয়া হাঙরের মতো যারা আমাদের ভূখণ্ডে আক্রমণ করছে, তারা একদিন তাদের প্রতিটি ফোঁটা রক্তের হিসাব দিতে বাধ্য হবে। মজলুমদের আরশ কাঁপানো দীর্ঘশ্বাস একদিন জালিমদের গ্রাস করবেই। আজ যারা হিটলারের পথ অনুসরণ করছে, তারা ভুলে না যাক যে— ইতিহাস তাদেরও পূর্ববর্তী জালিমদের মতোই আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবে।" তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তুরস্ক একদিকে যেমন মজলুমদের পাশে থাকবে, অন্যদিকে এই খুনি চক্রকে আন্তর্জাতিক আদালতের মুখোমুখি করতে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে।দুর্যোগ মোকাবিলা ও চিকিৎসা খাতে বিপ্লবপ্রেসিডেন্ট এরদোগান ঘোষণা করেন যে, কিজিলায় কেবল আন্তর্জাতিক সহায়তায় নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্যোগ ও চিকিৎসা খাতেও রেকর্ড তৈরি করেছে। গত বছরের ৬ ফেব্রুয়ারির ভূমিকম্পে কিজিলায় তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় উদ্ধার ও ত্রাণ অভিযান পরিচালনা করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ৪০০ মিলিয়নেরও বেশি গরম খাবার বিতরণ করা হয়েছে।পাশাপাশি, তুরস্ককে চিকিৎসা খাতে স্বাবলম্বী করতে আঙ্কারার চুবুক জেলায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে 'প্রোটুর্ক' প্লাজমা ও ওষুধ কারখানার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। এই কারখানার মাধ্যমে এখন থেকে রক্ত (প্লাজমা) থেকে ক্যানসার, ট্রমা, অগ্নিদগ্ধ, অনাক্রম্যতা (ইমিউন সিস্টেম) এবং হিমোফিলিয়ার মতো জটিল রোগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ দেশেই তৈরি করা হবে। এর ফলে চিকিৎসা খাতে তুরস্কের বৈদেশিক নির্ভরতা সম্পূর্ণ শেষ হবে। এছাড়াও সিলিব্রিতে বার্ষিক ৩ মিলিয়ন ব্লাড ব্যাগ তৈরির কারখানা স্থাপন করা হচ্ছে, যা তুরস্কের ১ বিলিয়ন লিরা আমদানি খরচ বাঁচাবে।ফিলিস্তিনি কন্যার আবেগঘন উপহারঅনুষ্ঠানের শেষভাগে কিজিলায়ের সভাপতি ফাতমা মেরিচ ইলমাজ প্রেসিডেন্ট এরদোগানকে একটি ঐতিহাসিক চিঠি ফ্রেমবন্দি করে উপহার দেন। এছাড়া গাজা থেকে আসা ১২ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি কন্যা রেনাদ আত্তাল্লাহ (যাকে কিজিলায় ফিলিস্তিন বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করেছে) তার নিজের ডিজাইন করা একটি টি-শার্ট এরদোগানকে উপহার দেয়, যার ওপরে লেখা ছিল Free Palestine।

মজলুমের কোনো ধর্ম বা জাতি হয় না, তাদের আরশ কাঁপানো দীর্ঘশ্বাস জালিমদের ধ্বংস করবেই: প্রেসিডেন্ট এরদোগান