ইউরোপের প্রথম পরিবেশবান্ধব মসজিদ: ক্যামব্রিজ সেন্ট্রাল মসজিদ
যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজে তুরস্কের সহায়তায় নির্মিত এবং ২০১৯ সালে উদ্বোধন হওয়া ইউরোপের প্রথম পরিবেশবান্ধব 'ক্যামব্রিজ সেন্ট্রাল মসজিদ' এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছে। সম্প্রতি ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস আনুষ্ঠানিকভাবে মসজিদটি সফর করেন এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাৎ করেন। প্রায় দুই দশকের মধ্যে কোনো ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রধানের এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক মসজিদ সফর। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশ সুরক্ষা, আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের ইতিবাচক ভূমিকার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে এই সফর ও মসজিদ প্রাঙ্গণকে দেখা হচ্ছে।পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য ও ইউরোপের প্রথম গ্রিন মসজিদ২০১৯ সালে উদ্বোধনের পর থেকেই ক্যামব্রিজ সেন্ট্রাল মসজিদটি তার চমৎকার স্থাপত্যশৈলী এবং পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্যের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়ে আসছে। ইউরোপের প্রথম শূন্য-কার্বন নির্গমনকারী (Zero Carbon Footprint) মসজিদ হিসেবে এটি পরিচিত। মসজিদটিতে সোলার প্যানেল, এয়ার-সোর্স হিট পাম্প, গ্রিন রুফ বা সেডাম ছাদ এবং প্রাকৃতিক বাতাস চলাচলের আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থা রয়েছে। টেকসই বনাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা কাঠ ও মার্বেলের মতো প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে এটি নির্মিত।মসজিদের ছাদে থাকা বৃষ্টির পানি ধরে রেখে তা প্রাঙ্গণের গাছপালায় সেচ এবং পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যবহৃত হয়। ভবনের প্রায় ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে নিজস্ব সৌরশক্তি থেকে। অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা এবং অক্সিজেনের মাত্রা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে বিশেষ সেন্সর প্রযুক্তি। এছাড়া দিনের বেলা কৃত্রিম আলোর ব্যবহার কমাতে গম্বুজের ওপর এমনভাবে কাঁচ বসানো হয়েছে, যাতে প্রাকৃতিক আলো সরাসরি ভেতরের ইবাদতকক্ষে প্রবেশ করতে পারে।ঐতিহাসিক সফরের পেছনের কথাব্রিটেনের ধর্মীয় বৈচিত্র্য ও আন্তর্জাতিক সম্প্রীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাজা তৃতীয় চার্লস এই সফরে অংশ নেন। তিনি মসজিদের ইমাম, ট্রাস্টি এবং স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যদের সাথে মতবিনিময় করেন। উল্লেখ্য, ২০০২ সালে তৎকালীন রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ একটি মসজিদ পরিদর্শন করেছিলেন। দীর্ঘ দুই দশক পর এবং ইতিহাস প্রথমবারের মতো কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্রিটিশ রাজা আনুষ্ঠানিকভাবে একটি মসজিদ সফরে এলেন, যা যুক্তরাজ্যের মুসলিম ইতিহাসের এক স্মরণীয় মাইলফলক।তৃণমূল থেকে বিশ্বমানের উদ্যোগে রূপান্তরক্যামব্রিজ সেন্ট্রাল মসজিদ নির্মাণের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালে। শহরে চার্চ বা আবাসিক বাড়ি রূপান্তর করে গড়ে তোলা চারটি ছোট উপাসনালয় যখন ক্রমবর্ধমান মুসলিম শিক্ষার্থীদের জায়গা দিতে পারছিল না, তখন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজের লেকচারার ড. টিমোথি উইন্টার (যিনি ১৭ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণের পর শেখ আব্দুল হাকিম মুরাদ নামে পরিচিত) এগিয়ে আসেন।আব্দুল হাকিম মুরাদ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী ইউসুফ ইসলামকে সাথে নিয়ে তৎকালীন তুর্কি প্রধানমন্ত্রী (বর্তমান প্রেসিডেন্ট) রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানের কাছে এই প্রকল্পের সহযোগিতা চান। ২০০৯ সালে জমি কেনা হয়। তুরস্কের বিখ্যাত 'ডিভানেট ফাউন্ডেশন' (TDV) প্রধান অর্থায়নকারী হিসেবে এগিয়ে আসে এবং কাতার ন্যাশনাল ফান্ডসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের ১০ হাজারের বেশি ব্যক্তি ও সংস্থা এতে অনুদান দেন। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের উপস্থিতিতে জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ১,০০০ মুসল্লি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই পবিত্র পরিবেশবান্ধব মসজিদটি চালু হয়।ঐতিহ্য, নান্দনিকতা ও সামাজিক সেবামসজিদের নকশায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রকৃতিপ্রেম ও পরিবেশ সুরক্ষার সুন্নাহকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। পাশাবোশি ক্যামব্রিজের বিখ্যাত 'কিংস কলেজ চ্যাপেল'-এর ভল্ট গম্বুজ এবং ভিক্টোরিয়ান যুগের ইটশিল্পের সংমিশ্রণে এটি গড়ে তোলা হয়েছে। স্থাপত্য নান্দনিকতার জন্য এটি একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছে।শুধু ইবাদতগাহ হিসেবে নয়, এটি মানবিক কাজের কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করছে। অভাবগ্রস্ত পরিবারগুলোতে খাদ্য সহায়তা পৌঁছানো, স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরি এবং তরুণদের মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবী পরিবেশ অভিযান চালনায় মসজিদটি নেতৃত্ব দিচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারীর সময় এটি টিকাদান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে সর্বস্তরের মানুষের আস্থা অর্জন করেছিল।