ইউক্রেনকে ক্ষেপণাস্ত্র বানানোর গোপন প্রযুক্তি দিচ্ছে ব্রিটেন: কিয়েভের প্রতিরক্ষা আত্মনির্ভরতায় নতুন মোড়
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও ভূ-রাজনীতির মোড় পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে কিয়েভকে নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদনে আত্মনির্ভরশীল করতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাজ্য। ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডেই আধুনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও সংযোজনের উদ্দেশ্যে ব্রিটেন সম্প্রতি তাদের 'স্কাল্প' (Storm Shadow/SCALP) ক্ষেপণাস্ত্রের সংবেদনশীল ও গোপন প্রযুক্তির ব্লুপ্রিন্ট প্রকাশ করে কিয়েভকে হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছে। পশ্চিমা মিত্রদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতা ও অস্ত্র মজুতের ঘাটতির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কিয়েভকে স্বাবলম্বী করার এই উদ্যোগ কৌশলগত আন্তর্জাতিক সামরিক ভারসাম্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।রাশিয়ার বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধক্ষেত্রে পশ্চিমা মিত্রদের অস্ত্রের ওপর ইউক্রেনের দীর্ঘদিনের একক নির্ভরতায় কৌশলগত রূপান্তর ঘটতে যাচ্ছে। ব্রিটিশ সরকারের সহায়তায় কিয়েভ এখন নিজস্ব ভূমিতেই অত্যাধুনিক দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির উৎপাদন ও সংযোজন বাড়াতে সক্ষম হবে।দ্য গার্ডিয়ানের বরাতে জানা যায়, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের যৌথ প্রযুক্তিতে তৈরি দূরপাল্লার ‘স্কাল্প’ (SCALP/Storm Shadow) ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের জরুরি উপাদানসংক্রান্ত অত্যন্ত গোপনীয় সামরিক তথ্য ইউক্রেনের কাছে উন্মুক্ত করেছে লন্ডন। এই ব্লুপ্রিন্ট ও কারিগরি তথ্যের ভিত্তিতে ইউক্রেনীয় সামরিক কারখানাগুলোতেই সরাসরি এ ধরনের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও সংযোজন সম্ভব হবে।[TECHTARANGA-POST:7874]দীর্ঘ প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে চলা যুদ্ধে ইউক্রেনকে মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় মিত্রদের সামরিক চালানের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটনসহ বিভিন্ন পশ্চিমা রাজধানীতে রাজনৈতিক মেরুকরণ, নির্বাচনী রেষারেষি, অস্ত্র মজুতের সংকট এবং সরবরাহে আমলাতান্ত্রিক বিলম্বের কারণে কিয়েভ বারবার রণক্ষেত্রে সংকটজনক পরিস্থিতিতে পড়েছে। কওমি টাইমস সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা দেশগুলোতে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বদলে গেলেও ইউক্রেন যেন নিজের ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সামরিকভাবে পঙ্গু না হয়ে পড়ে, সেই উদ্দেশ্যেই এই প্রযুক্তি স্থানান্তরের পথ বেছে নিয়েছে যুক্তরাজ্য।সামরিক শক্তির বিচারে রাশিয়ার বিপুল সেনাসংখ্যা এবং গোলাবারুদের বিপরীতে ইউক্রেনের পদাতিক সক্ষমতা সীমিত। ফলে সেনায় সেনায় মুখোমুখি লড়াই করার চেয়ে দূরপাল্লার নিখুঁত আঘাত হানা ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করে রাশিয়ার ভেতরের সামরিক অবকাঠামো, বিমানঘাঁটি এবং সরবরাহ লাইন অচল করে দেওয়াকে প্রধান কৌশল বানিয়েছে কিয়েভ। নিজস্ব প্রযুক্তিতে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু হলে শত্রুশিবিরে গভীর আঘাত হানার ক্ষেত্রে কোনো বিদেশি দেশের আগাম অনুমতির জটিলতাতেও কিয়েভকে আর আটকে থাকতে হবে না।শুধু আক্রমণাত্মক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রই নয়, কিয়েভ নিজেদের মাটিতে অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজও জোরদার করেছে। বর্তমানে ইউক্রেন মার্কিন প্যাট্রিওট (Patriot) ব্যবস্থার ওপর অতি-নির্ভরশীল। তবে বিশ্বজুড়ে প্রতিরোধী প্রজেক্টাইলের তীব্র ঘাটতি ইউক্রেনের আকাশসীমাকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছিল।ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে যুক্তরাজ্যের এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে বলা হয়েছে, এটি আগুনে ঘি ঢালার শামিল এবং এতে সরাসরি ইউরোপীয় নিরাপত্তা আরও হুমকির মুখে পড়বে। তবে মস্কোর কোনো ধরনের তোয়াক্কা না করে যুক্তরাজ্য স্পষ্ট করেছে—ইউক্রেনকে স্বাবলম্বী করাই সার্বভৌম দেশটির দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার একমাত্র সঠিক পথ।