গাম্বিয়ার 'ঘানা টাউন': নিজ দেশে পরবাসী কয়েকশ মানুষের রাষ্ট্রহীন ভবিষ্যৎ
গাম্বিয়ার আটলান্টিক উপকূলের এক শান্ত গ্রাম ‘ঘানা টাউন’। ১৯৫০-এর দশকে তৎকালীন গোল্ড কোস্ট (বর্তমান ঘানা) থেকে আসা ১০ জন জেলের হাত ধরে গড়ে উঠেছিল এই জনপদ। আজ সেখানে কয়েক প্রজন্মের বাস। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এখানকার ৯০০ বাসিন্দার মধ্যে প্রায় ৮৫০ জনই আজ ‘রাষ্ট্রহীন’। যে দেশে তাদের জন্ম, যে দেশের আলো-বাতাসে তারা বেড়ে উঠেছেন, সেখানে আজও তারা বিদেশি হিসেবেই গণ্য হচ্ছেন।ম্যারি মেনসাহ্র চার সন্তানের মধ্যে তিনজনের ঠাঁই হয়েছে ব্যয়বহুল বেসরকারি স্কুলে। কারণ, গাম্বিয়ার সরকারি স্কুলে ভর্তির জন্য যে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রয়োজন, তা ম্যারির সন্তানদের নেই। শুধু ম্যারি নন, এই গ্রামের শত শত মানুষের গল্প একই। গাম্বিয়ার ১৯৯৭ সালের সংবিধান অনুযায়ী, কেবল দেশটিতে জন্মগ্রহণ করলেই কেউ নাগরিক হতে পারেন না; যদি না তার বাবা-মায়ের অন্তত একজন গাম্বিয়ান হন।এই আইনি মারপ্যাঁচে আটকা পড়েছেন আমিনাহ ইশাকের মতো প্রবীণরাও। ৬৪ বছর বয়সী আমিনাহর জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই গ্রামেই। অথচ আজ তার সন্তান ও নাতি-নাতনিসহ পরিবারের সবাই রাষ্ট্রহীন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন:"আমরা সবাই রাষ্ট্রহীন। যদি গাম্বিয়ার নাগরিকত্ব না পাই, তবে আমরা যাব কোথায়? এটিই তো আমাদের একমাত্র চেনা জগত।"পরিচয়পত্র না থাকায় আমিনাহর ছোট দোকানটি তিনি নিবন্ধন করতে পারছেন না, এমনকি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলাও তাদের জন্য বিলাসিতা।২০১৪ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জামেহ্ এক নির্দেশের মাধ্যমে কিছু বাসিন্দাকে আইডি কার্ড দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৭ সালে তার পতনের পর সেই নথিপত্র আর নবায়ন করা হয়নি। ফলে যারা সাময়িকভাবে নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন, তারাও এখন আবার রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছেন।মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ মাদি জোবার্তে বলেন, "এই মানুষগুলো কয়েক দশক ধরে এখানকার সমাজের সাথে মিশে আছেন, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। তাদের নাগরিকত্ব না দেওয়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।" তিনি মনে করেন, আইনি সংস্কার ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।পরিচয়পত্রের অভাব কেবল দৈনন্দিন জীবনেই বাধা নয়, তা কেড়ে নিচ্ছে মেধাবী তরুণদের স্বপ্নও। জোসেফ ওডোহ নামে এই গ্রামেরই এক তরুণ ২০১৭ সালে বৃত্তিসহ বিদেশে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাভেল ডকুমেন্ট বা পাসপোর্ট না থাকায় তার সেই স্বপ্ন আজ সমুদ্রের নোনা জলে মিশে গেছে। ২৮ বছর বয়সী সেই মেধাবী তরুণ এখন গ্রামেই মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন।আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বাসিন্দারা জাতীয় পরিচয়পত্র না পেলেও জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। স্থানীয় প্রশাসনের প্রত্যয়নপত্র নিয়ে তারা ভোট দেন। বাসিন্দাদের প্রশ্ন— "যদি আমরা ভোট দিতে পারি, তবে আমাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধা কোথায়?"গাম্বিয়া সরকার এবং জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) এই সংকট নিরসনে কাজ করার আশ্বাস দিলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা থমকে আছে। ঘানা টাউনের মানুষের কাছে নাগরিকত্ব কেবল একটি প্লাস্টিকের কার্ড নয়; এটি তাদের অস্তিত্ব, শিক্ষা এবং সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার অধিকার।