চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও আধুনিকায়নে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রখ্যাত বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর, ২০২৬) ঢাকায় আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে এই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রথম ১০ বছরে টার্মিনালটির প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত আধুনিকায়নে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে, যা দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মক্ষমতা বাড়াতে এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ পরিচালনা করা নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এখন থেকে বৈশ্বিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবে।আজ ঢাকায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ মিলনায়তনে আয়োজিত চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ইসা কাজিম নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, বাংলাদেশে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলী আল হামুদি এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ ও প্রশাসনিক কাঠামোচুক্তি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রাথমিকভাবে ১৫ বছরের জন্য এনসিটি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা করবে। তবে টার্মিনালের জমি, মূল অবকাঠামো ও সম্পদের পূর্ণ মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ তথা বাংলাদেশ সরকারের হাতেই থাকবে। জাতীয় নিরাপত্তা, শুল্ক, অভিবাসন এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো কৌশলগত বিষয়গুলো সম্পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণেই পরিচালিত হবে।চুক্তির আর্থিক কাঠামোর আওতায়:এককালীন ফি: ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এককালীন প্রায় ৬০০ কোটি টাকা দিতে হবে, যার ২৫ শতাংশ চুক্তি সইয়ের সময় এবং বাকি ৭৫ শতাংশ পরিচালন কার্যক্রম শুরুর পূর্বে পরিশোধযোগ্য।বার্ষিক ফি ও রয়্যালটি: প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি টাকা নির্দিষ্ট ফি প্রদান ছাড়াও বন্দরের গড় টার্মিনাল আয়ের ওপর নির্ভর করে প্রতি কনটেইনারে প্রায় ৪০ শতাংশ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত রয়্যালটি পাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।আধুনিকায়ন বিনিয়োগ: নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন, ডিজিটাল ব্যবস্থা সংযোজন ও পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রথম ১০ বছরে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে প্রতিষ্ঠানটি।সর্বনিম্ন হ্যান্ডলিং নিশ্চয়তা: চুক্তিতে বছরে ন্যূনতম ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউ (TEU) কনটেইনার পরিচালনার নিশ্চয়তা রাখা হয়েছে।জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাবের প্রত্যাশাবর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি কনটেইনারের গড় অবস্থানের সময় নয় দিনের বেশি এবং জাহাজের অবস্থানকাল আড়াই দিনের বেশি, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক বেশি। পোর্ট পারফরম্যান্স সূচকে বন্দরের এই পিছিয়ে থাকার কারণে জাতীয় অর্থনীতিতে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে।অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় এবং আধুনিক প্রযুক্তির সংযোগ এনসিটিকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ইসা কাজিম জানান, এই অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের বাণিজ্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের (৪০টির বেশি দেশে ৮০টিরও বেশি টার্মিনাল) সাথে সরাসরি যুক্ত হবে, যা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জানান, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (PPP) মাধ্যমে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির ফলে দেশীয় শৃঙ্খল শক্তিশালী হবে এবং স্থানীয় কর্মীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ অব্যাহত থাকবে।
সহজ ও দ্রুত খবরের আপডেট পেতে আমাদের অ্যাপটি ইন্সটল করুন।